মহাভারতের যুদ্ধনীতি: Difference between revisions
(Created page with " '''ভূমিকা''' ভারতের সনাতন সংস্কৃতি এবং ধর্মের এক অমূল্য আকরগ্রন্থ – মহাভারত, তবে ঐতিহাসিক উপাদানের উৎস হিসাবে এই গ্রন্থের মূল্য আরও ব্যাপক। সেক্ষেত্রে মহাভারত শুধুমাত্র ভারতেরই ন...") |
No edit summary |
||
| Line 402: | Line 402: | ||
Authored by '''নিত্যানন্দ খাঁ''' | Authored by '''নিত্যানন্দ খাঁ''' | ||
Published by. | Published by.[[Category:Social Sciences]] | ||
Revision as of 15:33, 30 September 2024
ভূমিকা
ভারতের সনাতন সংস্কৃতি এবং ধর্মের এক অমূল্য আকরগ্রন্থ – মহাভারত, তবে ঐতিহাসিক উপাদানের উৎস হিসাবে এই গ্রন্থের মূল্য আরও ব্যাপক। সেক্ষেত্রে মহাভারত শুধুমাত্র ভারতেরই নয় বিশ্ব ইতিহাসেরও একটি দুর্লভ গ্রন্থ। সমকালীন ভারতবর্ষের সমাজ, সংস্কৃতি, সভ্যতা, সাহিত্য, ধর্মনীতি, রাজনীতি এবং প্রথাগত আচার-আচরণের যাবতীয় তথ্য এবং তত্ত্ব মহাভারতে খুঁজে পাওয়া যায়। তাই মহাভারতকে বিশ্বকোষ বললেও অত্যুক্তি হবে না। এই গ্রন্থকে মানবসভ্যতার আচার-সংহিতাও বলা যেতে পারে। আদর্শ সমাজের পরিকাঠামো, সুশাসন, বিচারব্যবস্থা তথা সুরক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে মহাভারতের একাধিক পর্বে আলোচনা করা হয়েছে। এই আলোচ্য বিষয়বস্তুর মধ্যে যুদ্ধনীতি অন্যতম।
ক. মহাভারতে যুদ্ধনীতির উৎস
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মহাভারত-চর্চার ধারা আবহমান কাল থেকে হয়ে আসছে। বলা বাহুল্য, মহাভারতের মধ্যেও কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ-প্রসঙ্গে একাধিক কথোপকথন রয়েছে। সর্বোপরি এই যুদ্ধকে কেন্দ্র করেই মানবসভ্যতা ‘শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা’-র মতো এমন একটি অমূল্য সম্পদ লাভ করেছে। তাই সমগ্র মহাভারতের মধ্যে যুদ্ধের অংশটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই অংশে তৎকালীন ভারতবর্ষের যুদ্ধনীতি এবং পদ্ধতির ইতিহাসসম্মত বিবরণ রয়েছে। মহাভারতের যুদ্ধে শুধুমাত্র শত্রু নিধনই মুখ্য নয় তার সঙ্গে এমন কিছু নীতিগত বিষয়ও রয়েছে যা গবেষণা এবং ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে। ভারতের তৎকালীন রাজন্যবর্গ এবং তাঁদের শাসনব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসাবে যুদ্ধ, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই যুদ্ধের বিবরণ থেকেই আমারা তৎকালীন ভারতবর্ষের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, সমরনীতি, সমরবিদ্যা, অস্ত্রশস্ত্র প্রভৃতি সম্পর্কে পূর্ণাবয়ব জ্ঞান লাভ করতে পারি। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার প্রথম অধ্যায়ের প্রথম শ্লোকেই কুরুক্ষেত্রকে ধর্মক্ষেত্র বলা হয়েছে।১ ধর্ম কখনোই নীতিশূন্য হতে পারে না, তাই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধেরও নীতি থাকাটাই স্বাভাবিক। বর্তমান প্রবন্ধে মহাভারতের সেই যুদ্ধনীতি সম্পর্কেই আলোচনা করা হয়েছে।
খ. গুণত্রয়বিভাগ এবং ধর্মযুদ্ধ
ইতিহাসের প্রত্যেকটি কালখণ্ডেই নানাভাবে যুদ্ধ-বিগ্রহের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কখনো সাম্রাজ্যবাদের লালসায় আবার কখনো শত্রুদমনের অভীপ্সায় মানুষ মানুষের ওপর প্রাণনাশের উদ্দেশ্যে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। যুদ্ধের ঘটনাটি বাহ্যিক হলেও এর নেপথ্যে-থাকা প্রবৃত্তিটি মানুষের আন্তরিক। কারণ সনাতন শাস্ত্র অনুযায়ী গুণাবলী অনুসারে মানুষের প্রকৃতি ভিন্ন হয়ে থাকে। এই গুণাবলীকেই বলা হয় – বর্ণ।২ বর্ণ মানুষের স্বভাব এবং মানসিকতাকে নিয়ন্ত্রণ করে তাই বর্ণভেদে মানুষের প্রবৃত্তির মধ্যেও পার্থক্য দেখা যায়। এই শাস্ত্রসম্মত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে যদি মানুষের যুযুৎসাকে ব্যাখ্যা করা হয় তাহলে দেখা যাবে যে, শুধুমাত্র ব্যক্তিস্বার্থ বা জিঘাংসা চরিতার্থ করার জন্য মানুষ যুদ্ধ করে না। তার গুণানুসারী প্রবৃত্তিও যুদ্ধের প্রতি তার আকর্ষণের জন্য দায়ী। এই গুণ এবং স্বভাবের ওপর নির্ভর করে প্রাচীন ভারতীয় বর্ণব্যবস্থায় ক্ষত্রিয় বর্ণকে সমাজে শাসক রূপে মেনে নেওয়া হয়েছে। তিনি শুধুমাত্র শাসনকার্য পরিচালনাই করবেন না, একই সঙ্গে বাহ্যিক এবং আভ্যন্তরীণ শত্রুর হাত থেকে দেশকে রক্ষাও করবেন। এখানে বলা বাহুল্য, তৎকালীন ভারতবর্ষে শাসক ব্যতীত স্বধর্মনিষ্ঠ ক্ষত্রিয়রাও অন্যায়ের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করতে বিন্দুমাত্র সংকোচ বোধ করতেন না। ক্ষত্রিয়রা ধর্মযুদ্ধকেই শ্রেয় বলে মনে করতেন।৩ অন্যায়ের প্রতিবাদ করার জন্য যে যুদ্ধ করা হয়, তাকেই বলে ধর্মযুদ্ধ। এই ধর্মযুদ্ধের জন্য মহাভারতে অনেক জায়গায় ক্ষত্রিয়দের উৎসাহিত করা হয়েছে। বিদুলোপাখ্যানে বীরাঙ্গনা ক্ষত্রিয় নারী তাঁর কাপুরুষ পুত্রদের ধিক্কার জানিয়ে যুদ্ধের জন্য উৎসাহিত করেছেন। শান্তিপর্বে বলা হয়েছে ‘জরা-ব্যাধিতে শয্যাশায়ী হয়ে মৃত্যু হওয়া ক্ষত্রিয়ের কাছে অধর্ম। তার বীরোচিত পদ্ধতিতেই যুদ্ধে প্রাণত্যাগ করা উচিত।’৪ যে ধর্মের পথে যুদ্ধ করে সে-ই জয়ী হয়।৫ অন্যদিকে ধর্মযুদ্ধের রীতিনীতি অমান্য করলে তার বিনাশ নিশ্চিত।৬
গ. মহাভারতে যুদ্ধনীতির প্রাথমিক পরিচয়
মহাভারতের যুদ্ধ শুধুমাত্র প্রবৃত্তিগত তাড়নায় হয়নি। এর নেপথ্যে সাম্রাজ্যলিপ্সা, কর্তৃত্বের অহংকার, স্বাজত্যবোধের অভাব, ঈর্ষা এবং আরও নানা ধরণের স্থূল-সূক্ষ্ম মনোবৃত্তি সক্রিয় ছিল। মহাভারতে দেখা যায় যে, উভয়পক্ষেরই কোনো-না-কোনো মুখপাত্র এই যুদ্ধকে স্থগিত করার প্রচেষ্টা করেছেন। তথাপি পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে যুদ্ধ যখন অবশ্যম্ভাবী হয়ে দেখা দিয়েছে তখন যোদ্ধারাও তাঁদের ক্ষাত্রধর্মের অবহেলা করেননি। তবে এই মহাযুদ্ধের সূচনালগ্নে বেশকিছু নিয়মনীতি এবং যুদ্ধের আনুষঙ্গিক বিষয়ের বর্ণনা করা হয়েছে। এই বর্ণনা থেকেই জানা যায় যে সেই সময় কীভাবে যুদ্ধের প্রস্তুতি চলত। সর্বপ্রথম দুই পক্ষ মিলিত হয়ে যুদ্ধের স্থান নির্বাচন করতেন। নির্বাচিত স্থানে উভয়পক্ষের সেনাবাহিনী যুদ্ধ-সামগ্রী নিয়ে উপস্থ হত। সেনাবাহিনীর শিবির স্থাপন করা হত এবং প্রচুর পরিমাণে খাদ্য ও পানীয় সংগ্রহ করা হত। যুদ্ধ চলাকালীন শিল্পী, বৈদ্য, সূত, মাগধ, পুরোহিত প্রমুখের বসবাসের জন্য নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করা হত। উভয়পক্ষের প্রধান প্রধান যোদ্ধাগণ যুদ্ধের নীতি নির্ধারণ করতেন।
মহাভারতে যুদ্ধনীতি এবং ধর্মযুদ্ধের নিয়মাবলী সম্পর্কে একাধিক অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখান থেকেই জানা যায় যে, যুদ্ধের সময়, ন্যূনতম শিষ্টাচার পালন করা হত। যুদ্ধের সময়কাল ছিল সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। প্রতিদিন যুদ্ধের শেষে পারস্পরিক মেলামেশায় কোনো বাধা ছিল না। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গেই যুদ্ধ হত। উভয়পক্ষের যোদ্ধার বাহন একইরকম হওয়ার নিয়ম ছিল। বাগযুদ্ধে ইচ্ছুক যোদ্ধার সঙ্গে বাগযুদ্ধই করা হত। শস্ত্র ছাড়া কেবলমাত্র মল্লযুদ্ধে আগ্রহী প্রতিপক্ষের সঙ্গে মল্লযুদ্ধই করা হত। প্রহার করার আগে প্রতিপক্ষকে সাবধান করে দেওয়া ছিল বাধ্যতামূলক। যুদ্ধের ক্ষেত্রে বেশকিছু নিষেধাজ্ঞা ছিল, যেমন - শরণাগত, যুদ্ধবিমুখ, নিরস্ত্র যোদ্ধা, বাহন (হাতি, ঘোড়া ইত্যাদি), সূত, শস্ত্রবাহক, রণবাদক এবং স্তুতিগায়ক, কবচহীন যোদ্ধা, স্ত্রী, বালক, দীনজন প্রমুখের সঙ্গে যুদ্ধ করা হত না। বিপক্ষ নিরস্ত্র হয়ে পড়লে তাকে তার ইচ্ছা অনুযায়ী উপযুক্ত অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধের জন্য আহ্বান করাই ছিল ক্ষাত্রধর্ম।৭ ক্ষাত্রধর্ম অনুযায়ী শরণাগত যোদ্ধাকে নিজের সন্তানের মতো রক্ষা করার কথা বলা হয়েছে।৮ মহাভারতের যুদ্ধে অনেক সময় উল্লিখিত নিয়মগুলি লঙ্ঘন করা হয়েছে, তবু ঐতিহাসিক উপাদান হিসাবে এই যুদ্ধনীতিগুলি থেকে তৎকালীন ভারতবর্ষের রাজন্যবর্গের মানসিকতা ও শাসনপ্রণালী সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা লাভ করা যেতে পারে।
ঘ. মহাভারতীয় যুদ্ধনীতি
কৌরব, পাণ্ডব তথা সোমকগণ সম্মিলিত হয়ে আসন্ন যুদ্ধের কিছু নিয়মনীতি নির্ধারণ করেন। তাঁরা নির্বিবাদে যুদ্ধের কিছু নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ পালনে সম্মত হন এবং সেগুলি পালন করার জন্য একে অপরকে প্রাণিত করেন।৯ মহাভারতে যদিও যুদ্ধনীতির পালন এবং লঙ্ঘন – উভয়েরই উদাহরণ রয়েছে। বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত সেই যুদ্ধনীতিগুলিকে মহাভারতের উদাহরণ-সহ আলোচনা করা হল।
ঘ. ১. সূর্যাস্তের পর যুদ্ধবিরতি
দুই পক্ষের যুদ্ধনীতি নির্ধারকগণ সম্মত হয়ে ঠিক করেন যে, সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত যুদ্ধ চলবে এবং উভয় পক্ষের রথী, মহারথী এবং অতিরথীগণ এই নিয়ম পালন করবেন। উভয় পক্ষের সেনাপতিগণ সূর্যাস্তের পর শঙ্খধ্বনি করে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করবেন। সূর্যাস্তের পর প্রতিপক্ষের ওপর আক্রমণ করা যাবে না এমনকী যোদ্ধা প্রহার করার জন্য যে তরবারি উদ্যত করেছে, তাকে পুনরায় কোষের মধ্যে রেখে দেবেন।
m মহাভারতে এই নীতি লঙ্ঘনের উদাহরণ
যুদ্ধের শেষে রাত্রিবেলা পাণ্ডব শিবিরে ঢুকে ঘুমন্ত ধৃষ্টদ্যুম্নকে অশ্বত্থামা হত্যা করেন১০; যুদ্ধামন্যু এবং উত্তমৌজা নামে দুই রাজকুমারকে হত্যা করেন১১; দ্রৌপদীর পাঁচ সন্তানকে হত্যা করেন১২; অভিমন্যুর স্ত্রী উত্তরার গর্ভজাত সন্তানকে হত্যা করার জন্য ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ করেন।১৩ অশ্বত্থামার সঙ্গে এই কাজে সহায়ক রূপে ছিলেন কৃপাচার্য এবং কৃতবর্মা। তাঁরা পলায়নরত সৈনিকদের হত্যা করেন এবং পাণ্ডব-শিবিরে আগুন লাগিয়ে দেন।১৪ যুদ্ধের নিয়ম লঙ্ঘন করে উল্লেখিত সমস্ত ঘটনা রাতের অন্ধকারে ঘটেছিল।
ঘ. ২. যুদ্ধবিরতির পর শত্রুতাপূর্ণ আচরণ নিষিদ্ধ
যুদ্ধ চলাকালীন উদয়াস্ত উভয়পক্ষ একে অপরের শত্রু হলেও সূর্যাস্তের পর উভয়কেই সারাদিনের বৈরিতা ভুলে গিয়ে পারস্পরের প্রতি প্রীতি এবং সৌহার্দপূর্ণ আচরণ করতে হবে।১৫ উভয় পক্ষের যে কেউ এই সময় একে অপরের শিবিরে প্রয়োজনে যাতায়াত করতে পারবে অথবা খাদ্যসামগ্রী আদানপ্রদান করতে পারবে। সর্বোপরি শত্রুভাবাপন্ন কোনো ধরণের পরিস্থিতি সূর্যাস্তের পর আর থাকবে না।
ঘ. ৩. সজাতীয় যুদ্ধ
সজাতীয় যুদ্ধের অর্থ হল যোদ্ধা সবসময় নিজের বর্গ বা সমপ্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গেই যুদ্ধ করবে। অবর্গীয় বা অসমজাতীয় কারোর সঙ্গে যুদ্ধ করতে নিষেধ করা হয়েছে। অসমজাতীয় প্রতিপক্ষের মধ্যে উল্লেখযোগ্য –
q যে যোদ্ধা বাক্যুদ্ধ করতে চাইবে তার সঙ্গে প্রতিপক্ষকে বাক্যুদ্ধই করতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো ধরণের অস্ত্র-শস্ত্রের প্রয়োগ নিষিদ্ধ ছিল।১৬
q সেনাবাহিনী থেকে বহিষ্কৃত যোদ্ধার ওপর আক্রমণ করা নিষিদ্ধ ছিল। তাদের বধ করাও ছিল যুদ্ধনীতির বিরুদ্ধে।১৭
q একজন রথী তার বিপক্ষের রথীর সঙ্গেই যুদ্ধ করবে। একইভাবে মহারথী, মহারথীর সঙ্গে এবং অতিরথী অতিরথীর সঙ্গে যুদ্ধ করবে।১৮
q গজারোহী কোনো যোদ্ধা কেবলমাত্র প্রতিপক্ষের গজারোহীর সঙ্গেই যুদ্ধ করবে। অশ্বারোহী, পদাতিক বা রথারূঢ় যোদ্ধার সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারবে না।১৯
q অশ্বারোহী যোদ্ধা কেবলমাত্র তার অশ্বারোহী প্রতিপক্ষের সঙ্গেই যুদ্ধ করবে। অন্য কোনো যোদ্ধার সঙ্গে যুদ্ধ করা যুদ্ধনীতির বিরুদ্ধে।২০
q পদাতিক যোদ্ধা তার পদাতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গেই কেবলমাত্র যুদ্ধ করবে। অন্য কোনো যোদ্ধার সঙ্গে যুদ্ধ করবে না।২১
m মহাভারতে এই নীতি পালনের উদাহরণ
ভীষ্ম-অর্জুনের যুদ্ধ২২, সাত্যকি-কৃতবর্মার যুদ্ধ২৩, ভীম-দুর্যোধনের যুদ্ধ২৪, শল্য-যুধিষ্ঠিরের যুদ্ধ২৫, ঘটোৎকচ-অলম্বুষের যুদ্ধ২৬, ধৃষ্টকেতু-বাহ্লীকের যুদ্ধ২৭, শিখণ্ডী-অশ্বত্থামার যুদ্ধ২৮, বিরাট-ভগদত্তের যুদ্ধ২৯ ইত্যাদি।
m মহাভারতে এই নীতি লঙ্ঘনের উদাহরণ
যুদ্ধের তৃতীয় দিন থেকেই যুদ্ধনীতি লঙ্ঘনের দৃশ্য চোখে পড়ে। উভয় সেনার পদাতিক যোদ্ধারা রথীদের এবং রথীরা পদাতিক যোদ্ধাদের সশস্ত্র আক্রমণ করে।৩০ গজারূঢ় সৈনিকরা পদাতিকদের এবং পদাতিক সৈনিকরা গজারূঢ় সৈনিকদের ওপর আক্রমণ করে তাদের ভূলুণ্ঠিত করে।৩১ যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং এই দৃশ্য দেখে ব্যাকুল হয়ে ওঠেন এবং ভীষ্মকে বধ করার জন্য নিজের প্রতিজ্ঞাভঙ্গ করে সুদর্শন চক্র ধারণ করেন। এছাড়া অভিমন্যু বধ, মহাভারতীয় যুদ্ধনীতি লঙ্ঘনের সবচেয়ে বড়ো উদাহরণ।৩২ আচার্য দ্রোণ স্বয়ং নিয়ম লঙ্ঘন করে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে মৎস্যদেশের পঞ্চাশ জন যোদ্ধা, সৃঞ্জয় বংশের ছ-হাজার সৈনিক এবং দশ হাজার হাতি ধ্বংস করেন।৩৩
ঘ. ৪. যথাযোগ্য প্রহার এবং তার পূর্বে বিপক্ষকে সাবধান করার নিয়ম
মহাভারতের যুদ্ধনীতি অনুসারে অতর্কিতে কারোর ওপর প্রহার করতে নিষেধ করা হয়েছে। নিয়মানুযায়ী প্রথমে প্রতিপক্ষকে সাবধান করতে হবে তারপর আক্রমণ করতে হবে যাতে সে আত্মরক্ষার সুযোগ পায়। প্রতিপক্ষের যোগ্যতা, ইচ্ছা তথা যুদ্ধের প্রতি তার আগ্রহ এবং তার শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী তার উপযোগী অস্ত্র-শস্ত্রের প্রহার করতে হবে।৩৪
m মহাভারতে এই নীতি লঙ্ঘনের উদাহরণ
যুদ্ধনীতি লঙ্ঘন করে অর্জুন শিখণ্ডীকে সম্মুখে রেখে তাঁর আড়াল থেকে ভীষ্মের ওপর বাণ নিক্ষেপ করেন। অর্জুনের বাণে জর্জরিত হয়ে ভীষ্ম ধনুর্বাণ ত্যাগ করলেও অর্জুন সমানে তাঁর ওপর প্রহার করতেই থাকেন। অবশেষে ভীষ্মকে শরশয্যায় শায়িত করে অর্জুন নিরস্ত হন।৩৫
ঘ. ৫. নিরাশ-হতাশের ওপর প্রহার নিষিদ্ধ
যুদ্ধের বিভীষিকা, আহতদের চীৎকার, নির্মম হত্যা, হাতি-ঘোড়ার ছিন্ন-ভিন্ন অঙ্গ ইত্যাদি দেখে যে যোদ্ধার মনে যুদ্ধের প্রতি বিতৃষ্ণা জন্মেছে অথবা নিজের নির্মম পরিণতির কথা মনে করে যে যোদ্ধা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে নিজে যে কোনো উপায়ে বাঁচার চেষ্টা করছে, তার ওপর প্রহার করা নিষিদ্ধ ছিল।৩৬
m মহাভারতে এই নীতি পালনের উদাহরণ
দ্রোণপর্বে দেখা যায়, ভীমের প্রবল আক্রমণে কর্ণ যখন রথের পিছনে গিয়ে লুকিয়ে পড়ে, তখন তার মধ্যে যোদ্ধাসুলভ আত্মবিশ্বাসের অভাব দেখে ভীমসেন তাকে পুনরায় নিজেকে সামলে নেওয়ার সুযোগ দেন।৩৭
ঘ. ৬. যুদ্ধবিমুখ যোদ্ধার ওপর প্রহার নিষিদ্ধ
কোনো যোদ্ধার পিঠে প্রহার করা যাবে না। যদি কেউ প্রাণরক্ষার জন্য পালাতে চায়, তাহলে তাকে হত্যা করা যাবে না। কাপুরুষের ওপরও প্রহার যাবে না।৩৮
ঘ. ৭. তৃতীয় কোনো যোদ্ধার হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ
দুই যোদ্ধা যখন যুদ্ধ করবে, তখন তৃতীয় কোনো যোদ্ধা সেখানে হস্তক্ষেপ করবে না। যুযুধান যোদ্ধারা নিজেদের শক্তি এবং সামর্থ্য অনুযায়ী পরস্পরের ওপর আক্রমণ করবে।৩৯
m মহাভারতে এই নীতি পালনের উদাহরণ
অর্জুন-কর্ণের যুদ্ধে একসময় অশ্বসেন নামে একটি সর্প কর্ণকে বলে যে, তাকে যেন কর্ণ বাণের মতো অর্জুনের দিকে নিক্ষেপ করে। যাতে সেই সর্প, অর্জুনকে দংশন করে হত্যা করতে পারে। কারণ অর্জুন, কর্ণের যেমন শত্রু তেমনই সেই অশ্বসেন নামক সর্পেরও শত্রু। কিন্তু কর্ণ, সর্পের প্রস্তাবে রাজি হননি এবং অর্জুনের ওপর সর্পাঘাত করেননি।৪০
m মহাভারতে এই নীতি লঙ্ঘনের উদাহরণ
ভীষ্মপর্বে দেখা যায় যে, অভিমন্যু যখন দুর্যোধনের পুত্র লক্ষ্মণের সঙ্গে যুদ্ধ করতে উদ্যত হন তখন লক্ষ্মণকে রক্ষা করার জন্য দুর্যোধন ছুটে আসেন। বিপক্ষ থেকে অর্জুনও ছুটে আসেন অভিমন্যুকে রক্ষা করার জন্য। অর্জুনকে আসতে দেখে কৌরবপক্ষ থেকে ভীষ্ম, দ্রোণ আদি সকলেই অর্জুনকে আক্রমণ করার জন্য উদ্যত হন।৪১ পিতামহ ভীষ্মকে রক্ষা করার জন্য কৌরব-সেনার দশ জন মহারথী একা ভীমসেনকে যুদ্ধক্ষেত্রে ঘিরে ফেলেন এবং আক্রমণ করেন। এই দশজনের মধ্যে ছিলেন – ভগদত্ত, কৃপাচার্য, শল্য, কৃতবর্মা, বিন্দ, অনুবিন্দ, জয়দ্রথ, চিত্রসেন, বিকর্ণ এবং দুর্মর্ষণ।৪২
ঘ. ৮. শত্রুকে শেষ বারের মতো সাবধান করে দেওয়া
বিপক্ষের যোদ্ধার প্রাণনাশ করার আগে তাকে শেষ বারের মতো সাবধান করতে হবে, যাতে সে নিজের প্রাণরক্ষার শেষ চেষ্টা করতে পারে অথবা যুদ্ধক্ষেত্রে ছেড়ে পালিয়ে যেতে পারে।
m মহাভারতে এই নীতি পালনের উদাহরণ
চক্রব্যূহে প্রবেশ করার পর অভিমন্যুর সঙ্গে দুর্যোধনের পুত্র লক্ষ্মণের যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে অভিমন্যুর হাতে লক্ষ্মণ পরাজিত এবং নিহত হন। দুর্যোধনের পুত্র লক্ষ্মণকে বধ করার আগে অভিমন্যু তাকে সাবধান করেন।৪৩
ঘ. ৯. শরণাগতের প্রতি বাৎসল্য
যদি কোনো যোদ্ধা অস্ত্র-শস্ত্র ফেলে দিয়ে শরণাগত হয়, তাহলে তাকে সর্বতোভাবে রক্ষা করতে হবে।৪৪
ঘ. ১০. নিরস্ত্রের ওপর প্রহার নিষিদ্ধ
যে যোদ্ধার কাছে কোনো অস্ত্র থাকবে না অথবা যে যোদ্ধার রক্ষাকবচ ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে, তার ওপর প্রহার করা যাবে না। তার হাতে পুনরায় অস্ত্র তুলে দিয়ে তবে তার সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে।৪৫
m মহাভারতে এই নীতি পালনের উদাহরণ
কর্ণপর্বে দেখা যায়, যুধিষ্ঠিরের মহাশক্তির আঘাতে দুর্যোধনের কবচ ছিন্ন হয়ে গেলে দুর্যোধন জ্ঞান হারান। এই অবস্থায় যুধিষ্ঠির কিন্তু তাঁকে আঘাত করেননি। পরে কৃতবর্মা, দুর্যোধনকে সুরক্ষিত স্থানে নিয়ে যান। একইভাবে কুরুপক্ষের সেনাপতি হওয়ার পর কর্ণ একসময় যুধিষ্ঠিরের মুখোমুখি হন এবং যুধিষ্ঠিরকে নিরস্ত্র করেন। এই অবস্থায় যুধিষ্ঠির পরাজিত হন এবং যুদ্ধ পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তখন তাঁর সেই বিমর্ষভাব বুঝতে পেরে কর্ণ তাঁকে আর প্রহার করেননি।৪৬ সেনাপতি হওয়ার পর কর্ণের সঙ্গে ভীমসেনেরও যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে ভীমের নিক্ষিপ্ত বাণের আঘাতে কর্ণ রক্তবমি করতে করতে অচেতন হয়ে পড়েন। এই অবস্থায় শল্য ভীমকে অনেক বুঝিয়ে নিরস্ত করেন, ফলে ভীম আর কর্ণের ওপর প্রহার করেননি।৪৭ অর্জুনও অশ্বত্থামাকে অচেতন অবস্থায় প্রহার করেননি।
m মহাভারতে এই নীতি লঙ্ঘনের উদাহরণ
সাত্যকীর হাতে ভূরিশ্রবা বধ৪৮; ধৃষ্টদ্যুম্নের হাতে দ্রোণাচার্য বধ৪৯; অর্জুনের হাতে কর্ণবধ৫০; ভীমের হাতে দুর্যোধন বধ।৫১
ঘ. ১১. যুদ্ধের সহায়কগণের প্রতি প্রহার নিষিদ্ধ
যারা যোদ্ধাদের সাহায্য করবে, যেমন – ঘোড়ার দেখাশুনো করা, বোঝা বহন করা, অস্ত্রশস্ত্র পৌঁছে দেওয়া, যুদ্ধের বাদ্য বাজানো – এইসব যুধ-সহায়কদের ওপর প্রহার করা যাবে না। খাদ্য সরবরাহকারীরাও এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।৫২
এছাড়াও আরও কিছু নিয়ম নির্ধারণ করা হয়েছিল যেমন – সাধারণ সেনাবাহিনীর ওপর দিব্যাস্ত্র বা মন্ত্রাস্ত্রের প্রয়োগ করা যাবে না। যোদ্ধার রথ বা বাহন যদি নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে তার ওপর আক্রমণ করা যাবে না। এমন যোদ্ধাকে হয় প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে যেতে দিতে হবে অথবা তার সমকক্ষ হয়ে তার সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে। এইভাবেই উভয়পক্ষের সম্মতিক্রমে মহাভারতের যুদ্ধনীতি নির্ধারণ করা হয়। এই যুদ্ধনীতিগুলি সমকালীন পরিপ্রেক্ষিতে ভারতবর্ষের রাজতন্ত্র এবং রাজন্যবর্গের নৈতিকতাকে প্রতিফলিত করে। তাই বলা যেতে পারে, বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে মহাভারত-কালীন ভারতবর্ষের ইতিহাস বিশ্লেষণ করার ক্ষেত্রে ভারত-যুদ্ধের নীতিগুলি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্যসূত্র
১. ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে সমবেতা যুযুৎসবঃ।
মামকাঃ পাণ্ডবাশ্চৈব কিমকুর্বত সঞ্জয়।।১ (ভীষ্মপর্ব, অধ্যায় – ২৫)।
২. চাতুর্বণ্য ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ।
তস্য কর্তারমপি মাং বিদ্ধ্যকর্তারমব্যয়ম্।।১৩ (তদেব, অধ্যায় – ২৮)
৩. স্বধর্মমপি চাবেক্ষ্য ন বিকম্পিতুমর্হসি।
ধর্ম্যাদ্ধি যুদ্ধাচ্ছ্রেয়োঽন্যৎ ক্ষত্রিয়স্য ন বিদ্যতে।।৩১ (তদেব, অধ্যায় – ২৬)
৪. অধর্ম্মঃ ক্ষত্রিয়স্যৈষ যদ্ব্যাধিমরণং গৃহে।
যদয়োনিধনং যাতি সোঽস্য ধর্ম্মঃ সনাতনঃ।।১১ (তদেব, অধ্যায় – ১৭)
৫. ত্যক্ত্বা সর্ব্বমধর্ম্মঞ্চ লোভঞ্চোদ্যমমাস্থিতাঃ।
যুধ্যধ্বমনহঙ্কারা যতো ধর্ম্মস্ততো জয়ঃ।।১১ (তদেব, অধ্যায় – ২১)
৬. অধর্মেণৈধতে তাবত্ততো ভদ্রাণি পশ্যতি।
ততঃ সপত্নাঞ্জয়তি সমূলস্তু বিনশ্যতি।।১৭৪ (মনুসংহিতা, অধ্যায় – ৪)।
৭. আমুঞ্চ কবচং বীর মূর্ধজান্যময়স্ব চ।
যচ্চান্যদপি তে নাস্তি তদপ্যাদৎস্ব ভারত।।৬০ (শল্যপর্ব, অধ্যায় – ৩২)
৮. বলেন বিজিতো যশ্চ নতং যুধ্যত ভূমিপঃ।
সংবৎসরং বিপ্রণোয়েৎ তস্মাজ্জাতঃ পুনর্ভবেৎ।।৪ (শান্তিপর্ব, – ৯৩)।
৯. ততস্তে সময়ং চক্রুঃ কুরুপাণ্ডবসোমকাঃ।
ধর্ম্মান্ সংস্থাপয়ামাসুর্যুদ্ধানাং ভরতর্ষভ।।২৬ (ভীষ্মপর্ব, অধ্যায় – ১)
১০. তন্তু তেনাভ্যুপায়েন গময়িত্বা যমক্ষয়ম্।
অধ্যতিষ্ঠত তজস্বী রথং প্রাপ্য সুদর্শনম্।।২৪ (সৌপ্তিক পর্ব, অধ্যায় – ৯)
১১. তমপ্যাক্রম্য পাদেন কণ্ঠে চোরসি তেজসা।
তথৈব মারয়ামাস বিনর্দ্দন্তমরিন্দমম্।।৩৩ (তদেব)
এবং
তমভিদ্রুত জগ্রাহ ক্ষিতৌ চৈনমতাড়য়ৎ।
বিস্ফুরন্তঞ্চ পশুবত্তথৈবৈনমমারয়ৎ।।৩৫ (তদেব)
১২. দ্রৌপদীর পাঁচ সন্তান যথাক্রমে - প্রতিবিন্ধ্য (যুধিষ্ঠির-পুত্র), সুতসোম (ভীম-পুত্র), শ্রুতকর্মা (অর্জুন-পুত্র), শতানীক (নকুল-পুত্র) এবং শ্রুতসেন (সহদেব-পুত্র)। সৌপ্তিকপর্বের ৯ম অধ্যায়ের অন্তর্গত শ্লোকসংখ্যা ৫০ – ৫৮ পর্যন্ত, অশ্বত্থামার হাতে কীভাবে দ্রৌপদীর পঞ্চপুত্র নিহত হন, তার বর্ণনা করা হয়েছে। যথা –
ততঃ সো নরশার্দ্দুল ! প্রতিবিন্ধ্য মহাহবে।
কুক্ষিদেশেঽবধীদ্রাজন্ ! সো হতো ন্যপতদ্ভুবি।।৫০
প্রসেন বিদ্ধা দ্রৌণিন্তু সুতসোমঃ প্রতাপবান্।
পুনশ্চাসিং সমুদ্যম্য দ্রোণপুত্রমুপাদ্রবং।।৫১
সুতসোমস্য সাসিং তং বাহুং ছিত্ত্বা নরর্ষভ।
পুনরপ্যাহনৎ পার্শ্বে সো ভিন্নহৃদয়োঽপতৎ।।৫২
নাকুলিস্তু শতানীকো রথচক্রেণ বীর্য্যবান্।
দোর্ভ্যামুৎক্ষিপ্য বেগেন বক্ষস্যেনমতাড়য়ত।।৫৩
অতাড়য়চ্ছতানীকং মুক্তচক্রং দ্বিজস্তু সঃ।
স বিহ্বল যযৌ ভূমিং ততোঽস্যাপাহরচ্ছিরঃ।।৫৪
শ্রুতকর্ম্মা তু পরিঘং গৃহীত্বা সমতাড়য়ৎ।
অভিদ্রুত্য যযৌ দ্রৌণিং সব্যে সফলকে ভৃশম্।।৫৫
স তু তং শ্রুতকর্ম্মাণমাস্যে জঘ্নে বরাসিনা।
সো হতো ন্যপতদ্ভূমৌ বিমূঢ়ো বিকৃতাননঃ।।৫৬
তেন শব্দেন বীরস্তু শ্রুতকীর্ত্তির্মহারথঃ।
অশ্বত্থামানমাসাদ্য শরবর্ষৈরবাকিরত।।৫৭
তস্যাপি শরবর্ষাণি চর্ম্মণা প্রতিবার্য্য সঃ।
সকুণ্ডলং শিরঃকায়াদ্ভ্রাজমানমপাহরত।।৫৮
১৩. ততঃ পরমমস্ত্রন্তু দ্রৌণিরুদ্যতমাহবে।
দ্বৈপায়নবচঃ শ্রুত্বা গর্ভেষু প্রমুমোচ হ।।৩৪ (তদেব, অধ্যায় – ১৬)
১৪. নামুচ্যত তয়োঃ কশ্চিৎ নিষ্ক্রান্তঃ শিবিরাদ্বহিঃ।
কৃপস্য চ মহারাজ ! হার্দ্দিক্যস্য চ দুর্ম্মতেঃ।। ১০৩
ভূয়শ্চৈব চিকীর্ষন্তৌ দ্রোণপুত্রস্য তৌ প্রিয়ম্।
ত্রিষু দেশেষু দদতুঃ শিবিরস্য হুতাশনম্।। ১০৪ (তদেব, অধ্যায় – ৯)
১৫. নিবৃত্তে বিহিতে যুদ্ধে স্যাৎ প্রীতির্নঃ পরস্পরম্।
যথা পুরা যথাযোগং ন তৎ স্যাচ্ছলনং স্ম নঃ।। ২৭ (ভীষ্মপর্ব, অধ্যায় -১)
১৬. যুদ্ধে প্রবৃত্তে নো বাচৈব প্রতিযোধনম্।
নিষ্ক্রান্তাঃ পৃতনামধ্যান্ন হন্তব্যাঃ কদাচন।। ২৮ (তদেব)
১৭. তদেব।
১৮. রথী চ রথিনা যোধ্যা গজেন গজধূর্গতঃ।
অশ্বেনাশ্বী পদাতিশ্চ পাদাতেনৈব ভারত।।২৯ (তদেব)
১৯. তদেব।
২০. তদেব।
২১. তদেব।
২২. তাবুভৌ কুরুশার্দ্দূলৌ পরস্পরবধৈষিণৌ।
গাঙ্গেয়স্তু বণে পার্থং বিদ্ধা নাকম্পযদ্বলী।।১০ (তদেব, অধ্যায় – ৪৫)
২৩. তয়োঃ সমভবদ্যুদ্ধং তুমুলং রোমহর্ষণম্।
সাত্যকিঃ কৃতবর্ম্মাণং কৃতবর্ম্মা চ সাত্যকিম্।।১২ (তদেব)
২৪. ভীমসেনস্তব সুতং দুর্য্যোধনমযোধযৎ।
তাবুভৌ নবশার্দ্দূলৌ কুরুমুখ্যৌ মহাবলৌ।।১৯ (তদেব)
২৫.যুধিষ্ঠিরঃ স্বয়ং রাজা মদ্ররাজানমভ্যযাৎ।
তস্য মদ্রাধিপশ্চাপং দ্বিধা চিচ্ছেদ মারিষ।।২৮ (তদেব)
২৬. রাক্ষসং ক্রূরকর্ম্মাণং ক্রূরকর্ম্মা ঘটোৎকচঃ।
অলম্বুষং প্রত্যুদিযাদ্বলং শত্রু ইরাহবে।।৪২ (তদেব)
২৭. বাহ্লীকন্তু রণে ক্রুদ্ধং ক্রুদ্ধরূপো বিশাংপতে।
অভ্যদ্রবদমেযাত্মা ধৃষ্টকেতুর্মহারথঃ।।৩৮ (তদেব)
২৮. শিখণ্ডী সমরে রাজন্ দ্রৌণিমভ্যুদ্যযৌ বলী।
অশ্বত্থামা ততঃ ক্রুদ্ধঃ শিখণ্ডীনমুপস্থিতম্।।৪৬ (তদেব)
২৯. ভগদত্তং রণে শূরং বিরাটো বাহিনীপতিঃ।
অভ্যযাত্ত্ববিতো রাজংস্ততো যুদ্ধমবর্ত্তত।।৪৯ (তদেব)
৩০. পদাতী রথিনঞ্চৈব রথী চাপি পদাতিনম্।
ন্যপাতয়চ্ছিতৈঃ শস্ত্রৈঃ সেনয়োরুভয়োবপি।।২০ (তদেব)
৩১. গজারোহা হয়ারোহান্ পাতয়াঞ্চক্রিরে তদা।
হয়ারোহা গজস্থাংশ্চ তদদ্ভুতমিবাভবৎ।।২১
গজারোহবরৈশ্চাপি তত্র তত্র পদাতয়ঃ।
পাতিতাঃ সমদৃশ্যন্ত তৈশ্চাপি গজযোধিনঃ।।২২ (তদেব)
৩২. বিচেতা ন্যপতদ্ ভূমৌ সৌভদ্রঃ পরবীরহা।
এবং বিনিহতো রাজন্নেকো বহুভিরাহবে।।১৪ (দ্রোণপর্ব, অধ্যায় - ৫১)
৩৩. পাঞ্চালানাং ততো দ্রোণোঽপ্যকরোৎ কদনং মহৎ।
যথা ক্রুদ্ধো রণে শক্রো দানবানাং ক্ষয়ং পুরা।।১ (তদেব, অধ্যায় - ১৬৩)
৩৪. যথাযোগং যথাকায়ং যথোৎসাহং যথাবলম্।
সমাভাষ্য প্রহর্তব্যং ন বিশ্চস্তে ন বিহ্বলে।।৩০ (ভীষ্মপর্ব, অধ্যায় – ১)
৩৫. শিখণ্ডী তু রণে বানান্ যান্ মুমোচ মহারথঃ।
ন চক্রুস্তে রুজং তস্য স্বর্ণপুঙ্খাঃ শিলাশিতা।।১২ …
ততঃ শান্তনবো ভীষ্মো বীভৎসুং নাত্যবর্ত্তত।
পঞ্চবিংশত্যা ক্ষুদ্রকাণাং সমার্পয়ৎ।।৫৪…
পতমানে রথাদ্ভীষ্মে বভূব সুমহাস্বনঃ।
সংপতন্তমভিপ্রেক্ষ্য মহাত্মানং পিতামহম্।।৯২ (তদেব, অধ্যায় - ১১৪)
৩৬. একেন সহ সংযুক্তঃ প্রপন্নো বিমুখস্তথা।
ক্ষীণশস্ত্রো বিবর্ম্মা চ ন হন্তব্যঃ কদাচন।।৩১ (তদেব, অধ্যায় -১)
৩৭. লয়মাস্থায় রাধেয়ো ভীমসেনমবঞ্চয়ৎ।
তং চ দৃষ্ট্বা রথোপস্থে নিলীনং ব্যথিতেন্দ্রিয়ম্।।৭৬
ধ্বজমস্য সমাসাদ্য সস্থৌ ভীমো মহীতলে।
দস্য কুরবঃ সর্বে চারণাশ্চাভ্যপূজয়ন্।।৭৭ (তদেব, অধ্যায় - ১৩৯)
৩৮. একেন সহ সংযুক্তঃ প্রপন্নো বিমুখস্তথা।
ক্ষীণশস্ত্রো বিবর্ম্মো চ ন হন্তব্যঃ কদাচন।।৩১ (তদেব, অধ্যায় - ১)
৩৯. তদেব।
৪০. ন নাম কর্ণোঽদ্য রণায় বান্য-বলং সমাস্থায় জয়ং বুভূষেৎ।
ন সন্দধ্যাং দ্বিঃ শরং চৈব নাগ ! যদ্যররজুনানাং শতমেব হন্যাম্।।৪৭
তমাহ কর্ণঃ পুনরেব নাগং তদাজিমধ্যে রবিসূনুসত্তমঃ।
ব্যালাস্ত্রসর্গোত্তমযত্নমন্যুভির্হন্তাস্মি পার্থং সুমুখো ব্রজ ত্বম্।।৪৮
(কর্ণপর্ব, অধ্যায় - ৬৬)
৪১. সৌভদ্রমথ সংযুক্ত দৃষ্ট্বা তত্র ধনঞ্জয়ঃ।
অভিদুদ্রাব সংক্রুদ্ধস্ত্রাতুকামঃ স্বমাত্মজম্।।১৭ (ভীষ্মপর্ব, অধ্যায় - ৫৫)
৪২. ত্বরমাণাস্ত্বরাকালে বিরথং ষণ্মহারথাঃ।
শরবর্ষৈরকরুণা বালমেকমবাকিরন্।।৫৭ (দ্রোণপর্ব, অধ্যায় - ৪২)
৪৩. সুদৃষ্টঃ ক্রিয়তাং লোকো হ্যমুং লোকং গমিষ্যসি।
পশ্যতাং বান্ধবানাং ত্বাং নয়ামি যমসাদনম্।।১৫ (তদেব, অধ্যায় – ৪১)
৪৪. সহ সংযুক্তঃ প্রপন্নো বিমুখস্তথা।
ক্ষীণশস্ত্রো বিবর্ম্মো চ ন হন্তব্যঃ কদাচন।।৩১ (তদেব, অধ্যায় - ১)
৪৫. তদেব।
৪৬. ন ভবান্ ক্ষত্রধর্ম্মেষু কুশলো হীতি মে মতিঃ।
ব্রাহ্মে বলে ভবান্ যুক্তঃ স্বাধ্যায়ে যজ্ঞকর্ম্মণি।।৫০
মাস্ম যুধ্যস্ব কৌন্তেয় ! মাস্ম বীরান্ সমাসদঃ।
মা চৈনানপ্রিয়ং ব্রুহি মা বৈ ব্রজ মহারণম্।।৫১ (কর্ণপর্ব, অধ্যায় – ৩৭)
৪৭. সো ভীমসেনাভিহতঃ সূতপুত্রঃ কুরূদ্বহ।
নিষসাদ রথোপস্থে বিসংজ্ঞঃ পৃতনাপতিঃ।।৪৭ (তদেব, অধ্যায় – ৩৮)
৪৮. প্রয়োপবিষ্টায় রণে পার্থেন ছিন্নবাহবে।
সাত্যকিঃ কৌরবেয়ায় খড়্গেনাপাহরচ্ছিরঃ।।৩৭ (দ্রোণপর্ব, অধ্যায় – ১২৪)
৪৯. তস্য মূর্দ্ধানমালম্ব্য গতসত্ত্বস্য দেহিনঃ।
কিঞ্চিদব্রুবতঃ কায়াদ্বিচকর্ত্তাসিনা শিরঃ।।৮৫ (তদেব, অধ্যায় – ১৬৪)
৫০. সৈন্যান্যনেকানি চ বিপ্রমোহ্য গাণ্ডীবমুক্তেন ততো মহাত্মা।
তেনার্জ্জুনস্তন্মহনীয়মস্য শিরোঽহরৎ সূতপুত্রস্য রাজন্।।১৫৯ (কর্ণপর্ব, অধ্যায় – ৬৬)
৫১. সা বজ্রনিষ্পেষসমা প্রহিতা ভীমকর্ম্মণা।
ঊরূ দুর্য্যোধনস্যাথ বভঞ্জ প্রিয়দর্শনৌ।।৪৭ (শল্যপর্ব, অধ্যায় – ৫৪)
৫২. ন সূতেষু ন ধুর্য্যেষু ন চ শস্ত্রোপনায়িষু।
ন ভেরীশঙ্খবাদেষু প্রহর্ত্তব্যং কথঞ্চন।।৩২ (ভীষ্মপর্ব, অধ্যায় – ১)
সহায়ক গ্রন্থ
১. ড. সুরেন্দ্রকুমার (সম্পা.), মনুস্মৃতি (হিন্দি), আর্ষ সাহিত্য প্রচার ট্রাষ্ট, দিল্লি, ২০০৫।
২. শ্রীমদ হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশ ভট্টাচার্য (অনু.), মহাভারতম্, বিশ্ববাণী প্রকাশনী, কলকাতা, ১৩৬৬ বঙ্গাব্দ।
৩. পণ্ডিত গঙ্গাপ্রসাদ শাস্ত্রী (অনু.), শুক্রনীতি (মূল সংস্কৃত এবং হিন্দি অনুবাদ), হিন্দু জগৎ কার্যালয়, মুজফ্ফর নগর, উত্তর প্রদেশ, ১৬৬৮ বিক্রমাব্দ।
৪. ড. রাধাগোবিন্দ বসাক (অনু.), কৌটিল্য অর্থশাস্ত্র (১, ২), জেনারেল প্রিন্টার্স অ্যান্ড পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ১৯৫০।
Authored by নিত্যানন্দ খাঁ
Published by.