দেশভাষা-বিজ্ঞান: বাংলার ভাষা গবেষণা: Difference between revisions

From enIKSwiki
Jump to navigation Jump to search
(Created page with " '''ভূমিকা:''' ভাষাবিজ্ঞান (Linguistics) হল ভাষা সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আলোচনা। অর্থাৎ বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখায় যেভাবে সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ (data collection), তথ্য নথিভুক্ত...")
 
No edit summary
 
Line 121: Line 121:
Authored by '''কৌশিক কর্মকার''', সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, মহারাজা নন্দকুমার মহাবিদ্যালয়, নন্দকুমার, পূর্ব মেদিনীপুর  
Authored by '''কৌশিক কর্মকার''', সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, মহারাজা নন্দকুমার মহাবিদ্যালয়, নন্দকুমার, পূর্ব মেদিনীপুর  


Published by,
Published by,[[Category:Social Sciences]]

Latest revision as of 16:15, 30 September 2024

ভূমিকা:

ভাষাবিজ্ঞান (Linguistics) হল ভাষা সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আলোচনা। অর্থাৎ বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখায় যেভাবে সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ (data collection), তথ্য নথিভুক্তকরণ (data recording), তথ্যের বস্তুনিষ্ঠ বর্ণনা (objective description), তথ্য বিশ্লেষণ (analysis) ও তথ্যের সাধারণীকরণ (generalisation) করা হয় ঠিক সেভাবে সম্পূর্ণ নৈর্ব্যক্তিক পদ্ধতিতে ভাষার আলোচনা করে থাকে ভাষাবিজ্ঞান।১ এহেন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ভাষা গবেষণার সূত্রপাত আধুনিক সময়ে হলেও প্রাচীন ভারত ভাষা চর্চার ক্ষেত্রে বহু পূর্ব থেকেই চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় রেখেছিল। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে পাণিনি তাঁর ‘অষ্টাধ্যায়ী’তে শব্দের ব্যুৎপত্তিজনিত যে ‘root theory’র তত্ত্ব উপস্থাপন করেন, তা আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানীদের কাছেও বিস্ময়ের উদ্রেক করে। আসলে প্রাচীন ভারতীয় ভাষা গবেষণা মূলত ব্যাকরণের আধারে চর্চিত হয়েছিল। ব্যুৎপত্তি বিচারে ‘ব্যাকরণ’ শব্দটি ‘ভাষার গঠনের বিভিন্ন উপাদানগুলিকে বিশ্লেষণ করা’২ বোঝালেও ‘ব্যাকরণ’ পরিভাষাটির সঙ্গে জড়িয়ে গেছে এক প্রকার নির্দেশমূলক (narrative) বা বিধিনিষেধমূলক (prescriptive) অনুষঙ্গ। অর্থাৎ ভাষার ‘অশুদ্ধ’ রূপ ‘শুদ্ধ’ করার অবলম্বন হল ব্যাকরণ। এখানেই আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের সঙ্গে ব্যাকরণের মূল সংঘাতের ক্ষেত্রটি গড়ে ওঠে। কারণ ভাষাবিজ্ঞান অনুযায়ী ভাষার ‘অশুদ্ধ’ রূপ বলে কিছু হতে পারে না। ভাষাবিজ্ঞানের উদ্দেশ্যই হল ভাষার প্রচলিত রূপকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করা ও তার গঠনরীতি সম্পর্কে সাধারণ সূত্র রচনা করা।

বাংলার ভাষা গবেষণা বিষয়ে আলোচনাকালে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞান ও তার বিভিন্ন ফলিত ক্ষেত্রগুলি নিয়ে যেমন আলোকপাত করা প্রয়োজন তেমনই ব্যাকরণ চর্চা বিষয়েও আলোচনা করা জরুরি কারণ তথাকথিত বিধিনিষেধমূলক ব্যাকরণের মধ্যেও সেই সময়ে আলোচিত হয়েছে আধুনিক ভাষা চর্চার বহুবিধ উপাদান।

বিভাগ/উপশিরোনাম:

সামগ্রিকভাবে ভাষা গবেষণা তথা ভাষাশাস্ত্রের তিনটি প্রধান প্রকারভেদ হল:

ক। নির্দেশমূলক ব্যাকরণ (Normative Grammar)

খ। বাঙ্‌মীমাংসা বা সাংস্কৃতিক ভাষাতত্ত্ব (Philology) ও

গ। বিশুদ্ধ ভাষাতত্ত্ব বা ভাষাবিজ্ঞান (Linguistics)৩

এর মধ্যে নির্দেশমূলক ব্যাকরণ চর্চার একটি প্রাচীন ঐতিহ্য বাংলার ভাষা গবেষণায় লক্ষ করা যায়। বিশুদ্ধ ভাষাতত্ত্ব বা ভাষাবিজ্ঞান অংশটিকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়: ১। দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে ও ২। ভাষার উপাদান অনুসারে। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণি অর্থাৎ দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে ভাষাবিজ্ঞানকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়: ক। এককালীন বা বর্ণনামূলক (Synchronic or Descriptive), খ। কালক্রমিক বা ঐতিহাসিক (Diachronic or Historical)। উপাদান অনুসারে শ্রেণিবিভাগের মধ্যে ভাষাবিজ্ঞানের যে অংশগুলি অন্তর্ভুক্ত সেগুলি হল: ধ্বনিতত্ত্ব (Phonology), রূপতত্ত্ব (Morphology), বাক্যতত্ত্ব (Syntax) ও শব্দার্থতত্ত্ব (Semantics)। এছাড়াও রয়েছে ফলিত ভাষাবিজ্ঞানের বেশ কিছু শাখা যেগুলি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলায় অত্যন্ত সমৃদ্ধ গবেষণা কর্ম সংঘটিত হয়েছে। শাখাগুলি হল: শৈলীবিজ্ঞান (Stylistics), সমাজভাষাবিজ্ঞান (Sociolinguistics), উপভাষাবিজ্ঞান (Dialectology), মনোভাষাবিজ্ঞান (Psycholinguistics), অভিধানবিজ্ঞান (Lexicography) ইত্যাদি।  

সংক্ষিপ্ত বিবরণ:

ব্যাকরণ: ব্যুৎপত্তিগত অর্থে ব্যাকরণ শব্দটি ‘ভাষার বিশ্লেষণ’ বোঝালেও বা প্রাচীন ভারতে সেই অর্থ অনুযায়ী ভাষার চর্চা সংঘটিত হলেও বাংলায় উনিশ শতক থেকেই ব্যাকরণের মধ্য দিয়ে একপ্রকার কর্তৃত্বমূলক ধারণা পোষিত হয়ে আসছে। ব্যাকরণ হয়ে উঠেছে পুরোপুরি নির্দেশমূলক; বলা বাহুল্য এই প্রবণতাটি ব্যাকরণের বিশ্লেষণধর্মী ধর্মের সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। একশ্রেণির সংস্কৃত পণ্ডিতগণের কাছে বাংলা ভাষা ছিল চূড়ান্ত অবজ্ঞার বিষয়বস্তু। তবে একশ্রেণির ব্যাকরণবিদ আবার বাংলা ভাষা তথা বাংলা ব্যাকরণের গতিপ্রকৃতি সম্বন্ধে চিন্তিত ছিলেন, তাঁদের কাছে ব্যাকরণ হয়ে উঠেছিল ‘শৃঙ্খল’ বা ‘নিয়মের নিগড়’।৪ যদিও কোনভাবেই ব্যাকরণ ‘শৃঙ্খল’রূপে পরিগণিত হতে পারে না, কারণ তা ভাষার গঠন কৌশল উদ্‌ঘাটনের একটি উপায় ছাড়া অন্য কিছু নয়।

ভাষাবিজ্ঞান: ভাষাবিজ্ঞানে কোন নির্দেশ বা বিধিনিষেধের স্থান নেই; তা কেবল নৈর্ব্যক্তিক বস্তুনিষ্ঠ বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে ভাষার বিশ্লেষণ করে। ভাষাবিজ্ঞানের তিনটি প্রধান বিভাগ হল: ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব ও বাক্যতত্ত্ব। ভাষাবিজ্ঞানের যে অংশে ধ্বনি সম্পর্কে আলোচনা হয়, তা হল ধ্বনিতত্ত্ব। মূলরূপ থেকে শব্দগঠন পদ্ধতি, বিভক্তি ও প্রত্যয় যোগে শব্দরূপ ও ক্রিয়ারূপ নির্মাণ পদ্ধতি রূপতত্ত্বের আলোচ্য বিষয়। এক বা একাধিক মূলরূপ যুক্ত হয়ে কীভাবে বাক্য গঠন করে, তা বাক্যতত্ত্বের আলোচ্য বিষয়। এছাড়াও রয়েছে শব্দার্থতত্ত্ব যা ভাষার অর্থের দিক নিয়ে আলোচনা করে।

শৈলীবিজ্ঞান: শৈলীবিজ্ঞান শৈলী সম্পর্কে বিধিবদ্ধ আলোচনা করে। শৈলীবিজ্ঞান সাধারণভাবে সাহিত্যসৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত। সাহিত্যিক তাঁর স্বতন্ত্রতা প্রকাশ করেন ভাষার কিছু বিশেষ প্রকরণের সাহায্যে। যে বিশেষ প্রকরণ কৌশলগুলি সাহিত্যিকের নিজস্ব প্রকাশভঙ্গিকে ব্যক্ত করতে সাহায্য করে, তাই হল শৈলী। শৈলীবিজ্ঞান সেই ‘বিশেষ’গুলিকে বিশ্লেষণ করে একটি সাধারণ সত্য রচনার চেষ্টা করে। অর্থাৎ সেই বিশেষ আবেদন সৃষ্টির উপকরণগুলিকে শনাক্ত করতে শৈলীবিজ্ঞান সাহায্য করে থাকে।৫

সমাজভাষাবিজ্ঞান: সমাজ সংগঠনের সঙ্গে সামাজিক মানুষের ভাষা ব্যবহারের সম্পর্ক বিষয়ে যাবতীয় দিক সমাজ ভাষাবিজ্ঞানের আলোচ্য। তারই সঙ্গে আলোচ্য বিভিন্ন ভাষা ও ভাষা গোষ্ঠী সম্বন্ধে সামাজিক মানুষের মনোভাব ও আচরণ।৬

উপভাষাবিজ্ঞান: উপভাষাকেন্দ্রিক চর্চা উপভাষাবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়। উপভাষা হল একটি ভাষার অন্তর্গত এমন বিশেষ বিশেষ রূপ যা এক একটি বিশেষ অঞ্চলে প্রচলিত, যার সঙ্গে আদর্শ ভাষা (standard language) বা সাহিত্যিক ভাষার (literary language) ধ্বনিগত, রূপগত ও বিশিষ্ট বাগ্‌ধারাগত পার্থক্য আছে। অঞ্চল বিশেষের ভাষার বিশেষত্ব নিয়ে কাজ করে উপভাষাবিজ্ঞান।৭

অভিধানবিজ্ঞান: ভাষা বিজ্ঞানের একটি সংযোগমূলক বিভাগ হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে অভিধানবিজ্ঞানকে। অভিধান ভাষার প্রকাশগত দিক এবং বিষয়গত দিকের মধ্যে অর্থাৎ ভাষার ধ্বনি ও অর্থের মধ্যে সংযোগ ব্যাখ্যা করে।

মনোভাষাবিজ্ঞান: ফলিত ভাষাবিজ্ঞানের সাম্প্রতিকতম শাখা এগুলি। মনোবিজ্ঞান ও ভাষাবিজ্ঞানের সংযোগে নির্মিত হয়েছে মনোভাষাবিজ্ঞান।

পরম্পরা:

ক। ব্যাকরণ চর্চা:

বাংলা ব্যাকরণ রচনায় প্রথম যার নাম পাওয়া যায়, তিনি হলেন পর্তুগিজ পাদ্রি মনোয়েল-দা-আসুম্পসাউ। তাঁর লেখা ব্যাকরণ গ্রন্থটির প্রকৃত নাম ছিল ‘Vocabulario emi idioma Bengalla e portuguez dividido em duas partes’। রোমান ভাষায় লিখিত দু’ভাগে বিভক্ত গ্রন্থটির প্রথম ভাগে ব্যাকরণ ও দ্বিতীয় ভাগে বাংলা ও পর্তুগিজ ভাষার অভিধান রচনার একটি প্রয়াস লক্ষ করা যায় এক্ষেত্রে।

নাথানিয়াল ব্রাসি হ্যালহেদের ‘A Grammar of the Bengal Language’ (১৭৭৮) ইংরেজিতে লিখিত বাংলা সাধুভাষার ব্যাকরণ। সর্বপ্রথম কিছু বাংলা হরফ এখানে ব্যবহৃত হয়। বাংলা পদ, বচন, লিঙ্গ, কারক-বিভক্তির আলোচনা করেছেন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলা রামায়ণ, মহাভারত থেকে দৃষ্টান্ত দিয়ে বিষয়গুলি ব্যাখ্যা করেছেন। 

শ্রীরামপুর মিশন থেকে প্রকাশিত উইলিয়াম কেরির ‘A grammar of the Bengalee Language’ (১৮০১) এগারোটি অধ্যায়ে বিভক্ত। স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ, বচন, লিঙ্গ, কারক ও কারক-বিভক্তি, পুরুষ, বাচ্য, ক্রিয়ার শ্রেণিবিভাগ নিয়ে আলোচনা করেছেন। ১৮০৫, ১৮১৫ ও ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে বইটির তিনটি সংস্করণ হয়, যেখানে বেশ কিছু বিষয় তিনি সংযোজন করেছিলেন।

১৮০১ খ্রিস্টাব্দেই প্রকাশিত হয় গেরাসিম লেবেডফের ‘A Grammar of the Pure and Mixed East-Indian Dialects’। ১৯টি অধ্যায়ে বিভক্ত বইটিতে পদ, লিঙ্গ, বাক্যগঠন সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।

১৮১১ সালের মধ্যে প্রকাশিত হয় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিত মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের গ্রন্থ ‘বাঙ্গালা ভাষার ব্যাকরণ’। কেরির ব্যাকরণের আদর্শে লিখিত এই গ্রন্থটি ছিল বাংলা ভাষায় লেখা প্রথম বাংলা ব্যাকরণ।

১৮২১ খ্রিস্টাব্দে লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয় জি সি হটনের ‘Rudiments of Bengali Grammar’। ১৬টি অধ্যায়ে বিভক্ত গ্রন্থটিতে বাংলা বর্ণ, যুক্তাক্ষর, উচ্চারণ ও ক্রিয়ার কাল আলোচিত হয়েছে।

১৮২৬ সালে Unitarian Press থেকে প্রকাশিত হয় রামমোহন রায়ের লেখা ১২টি অধ্যায় সমন্বিত ইংরেজি ভাষায় বাংলা ব্যাকরণ ‘Bengalee Grammar in the English Language’। ১৮৩৩ সালে Calcutta School Book Society বইটি প্রকাশ করে। ওই একই বছরে প্রকাশিত হয় বাংলা সংস্করণ ‘গৌড়ীয় ব্যাকরণ’। সংস্কৃত ব্যাকরণ অনুযায়ী এই গ্রন্থে ১৬টি স্বরবর্ণ ও ৩৪টি ব্যঞ্জনবর্ণ নির্দেশিত হয়েছে। শিষ্ট বাংলার পাশাপাশি পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গীয় কথ্য ভাষার দৃষ্টান্তও রামমোহন দিয়েছে। ১৮১৫ সালে প্রকাশিত ‘বেদান্ত গ্রন্থে’ও তিনি বাক্য গঠন বিষয়ে আলোচনা করেছেন। 

১৮৪০ সালে প্রকাশিত হয় ভগবতচন্দ্র বিশারদের ‘সাধুভাষার ব্যাকরণ সারসংগ্রহ’। কেরির ছাত্র ইয়েটস-এর ‘Introduction to the Bengali Language’ প্রকাশিত হয় ১৮৪৭ সালে। ১৮৫০ সালে সংস্কৃতানুযায়ী বাংলা ব্যাকরণ লেখেন শ্যামাচরণ শর্মা। ১৮৫০ সালেই প্রকাশিত হয় শ্যামাচরণ সরকারের ‘Introduction to the Bengalee Language’। পদ্যরীতিতে লেখা নন্দকুমার রায়ের ‘ব্যাকরণ দর্পণ’ প্রকাশ পায় ১৮৫২ সালে। ১৮৫৩ সালে প্রকাশিত হয় ক্ষেত্রমোহন দত্তের ‘গৌড়ীয় ব্যাকরণ’ ও ব্রজকিশোর গুপ্তের ‘বঙ্গভাষা ব্যাকরণ’। ১৮৫৮ সালে প্রকাশিত হয় প্যারীমোহন বোনার্জিয়ার ‘সরল ব্যাকরণ’, শ্রীপতি ভট্টাচার্যের ‘সুলভবোধ ব্যাকরণ’, কৃষ্ণচরণ তর্কালঙ্কারের ‘শব্দকিরণাবলী’। ডানকান ফোর্বস এর লেখা ‘Grammar of the Bengali Language’ প্রকাশিত হয় ১৮৬২ সালে। ১৮৭১ সালে রাজেন্দ্রলাল মিত্র লেখেন ‘ব্যাকরণ প্রবেশ’। সংস্কৃত ব্যাকরণ অনুযায়ী কৃষ্ণকিশোর বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশ করেন ‘বাঙ্গালা ব্যাকরণ’। ১৮৮২ সালে পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ পত্রিকায় বাংলা ব্যাকরণ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ লেখেন ও ব্যাকরণের কিছু মূলগত সমস্যা নিয়ে আলোকপাত করেন। ১৮৮৫ সালে প্রকাশিত হয় নিত্যানন্দ গোস্বামীর ‘বঙ্গ ভাষার ব্যাকরণ’। ওই একই বছরে প্রকাশিত হয় জি এফ নিচোলের ‘Manual of the Bengali Language’। ১৮৮৬ সালে লোহারাম শিরোরত্নের লেখা ‘Grammar of the Bengali Language’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। ‘ভাষাবোধ বাঙ্গালা ব্যাকরণ’ প্রকাশ করেন নকুলেশ্বর বিদ্যাভূষণ ১৮৯৮ সালে। ১৯০০ সালে আটটি অধ্যায় সমন্বিত ঋষিকেশ শাস্ত্রীর বাংলা ব্যাকরণ প্রকাশিত হয়। ১৯১২ সালে প্রকাশিত হয় মধুসূদন তর্কালঙ্কারের লেখা ‘আশুবোধ ব্যাকরণ’, অটল বিহারী গোস্বামীর লেখা ‘বাঙ্গালা ব্যাকরণ’। কেদারেশ্বর গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা ‘বাঙ্গালা ব্যাকরণ ও রচনা’ ১৯১৭ সালে প্রকাশিত হয়। আধুনিক বাংলা ব্যাকরণ ১৯৩৩ সালে লেখেন জগদীশচন্দ্র ঘোষ।

ভাষাবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ও বেশ কিছু ব্যাকরণ বই রচনা করেছিলেন। ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় তাঁর বিখ্যাত ব্যাকরণ গ্রন্থ ‘ভাষা-প্রকাশ বাঙ্গালা ব্যাকরণ’। এই গ্রন্থটির ভূমিকায় লেখক জানিয়েছেন ‘পুস্তকখানি স্কুল তথা কলেজের বাঙালি ছাত্রদের পাঠের জন্য রচিত হইয়াছে’। এটি ছাড়াও আরও অনেকগুলি বিদ্যালয় পাঠ্য বাংলা ব্যাকরণ গ্রন্থ তিনি সুকুমার সেনের সঙ্গে যৌথভাবে রচনা করেছিলেন। যেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: ‘ছাত্রবোধ ব্যাকরণ’, ‘বাঙ্গালা রচনাপ্রবেশ’, ‘মধ্য বাঙ্গালা ব্যাকরণ’, ‘প্রথম বাঙ্গালা ব্যাকরণ’, ‘আশুবোধ ব্যাকরণ’ ও ‘সংক্ষিপ্ত ভাষা প্রকাশ বাঙ্গালা ব্যাকরণ’।

খ। ভাষাবিজ্ঞান চর্চা:

ভাষাবিজ্ঞান চর্চায় রবীন্দ্রনাথের যে গ্রন্থগুলি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সেগুলি হল: ‘শব্দতত্ত্ব’ (১৯০৯) ও ‘বাংলা ভাষা পরিচয়’ (১৯৩৮)। আলোচ্য গ্রন্থদ্বয়ে রবীন্দ্রনাথ ধ্বনিতত্ত্বের ক্ষেত্রে বাংলা ধ্বনির উচ্চারণ, উচ্চারণের বিবর্তন ও তার কারণ, উচ্চারণ পরিবর্তনে অর্থের পরিবর্তন ও ধ্বনি প্রতীকতা অর্থাৎ বাংলা ধ্বন্যাত্মক শব্দ ব্যবহার সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। রূপতত্ত্ব বিষয়ে ধাতু, শব্দমূল, বিভক্তি, প্রত্যয়, ক্রিয়ারূপ, নির্দেশক, বচন, লিঙ্গ প্রভৃতি বিষয়ে বিস্তৃতভাবে আলোচনা করেছেন। শব্দের অর্থ বিবর্তন ও অর্থ বিচারও তাঁর আলোচনার বিষয় ছিল। প্রয়োগমূলক ভাষাবিজ্ঞান অর্থাৎ ভাষার মানোন্নয়ন সংক্রান্ত আলোচনা, বানান নির্ধারণ, পরিভাষা নির্মাণের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও গ্রন্থদ্বয়ে আলোচিত হয়েছে।  

ভাষাবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের অবদান এই ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি বাংলা ভাষার উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ বিষয়ে যে গবেষণা করেন, তাঁর সেই গবেষণা অভিসন্দর্ভটি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিবর্তিত ও পরিমার্জিত হয়ে ‘The Origin and Development of Bengali Language’ নামে প্রকাশিত হয় ১৯২৬ সালে।  গ্রন্থটির প্রথম খণ্ডে রয়েছে ধ্বনিতত্ত্বের আলোচনা এবং আটটি অধ্যায় জুড়ে দেশি-বিদেশি উপাদানের তুলনামূলক প্রভাব আলোচিত হয়েছে। দ্বিতীয় খণ্ডে বাংলা ভাষার রূপতত্ত্ব অর্থাৎ প্রত্যয়, বিভক্তি, উপসর্গ, তাদের উৎস, বিশেষ্য, সর্বনাম, ক্রিয়ার রূপের বিবর্তন শ্বাসাঘাত, ছন্দ আলোচিত হয়েছে। এছাড়াও ভাষাবিজ্ঞান চর্চায় তিনি যে বইগুলি লিখেছিলেন, সেগুলি হল: ‘বাঙ্গালা ভাষাতত্ত্বের ভূমিকা’, ‘A Brief Sketch of Bengali Phonetics’, ‘Bengali Self-Taught’, ‘A Bengali Phonetic Reader’, ‘Indo-Aryan and Hindi’, ‘Dravidian’, ‘Balts and Aryans’ ইত্যাদি।

অপর বিখ্যাত ভাষাতাত্ত্বিক মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা ভাষার উৎস নির্ণয় সংক্রান্ত একটি মৌলিক গ্রন্থ রচনা করেন: ‘বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত’ (১৯৬৫); যেখানে তিনি দেখিয়েছেন, মাগধী প্রাকৃত থেকে নয়, গৌড়ী প্রাকৃত থেকে বাংলা ভাষার জন্ম। যদিও তিনি নিজেই গ্রন্থ মধ্যে জানিয়েছেন ‘আমরা গৌড়ী প্রাকৃতের কোন নিদর্শন পাই নাই। তবে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের সাহায্যে ইহার পুনর্গঠন সম্ভব।’৮

সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়ের সুযোগ্য ছাত্র ভাষাবিদ সুকুমার সেন মধ্য ও নব্য ভারতীয় আর্য ভাষা নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁর লেখা ‘ভাষার ইতিবৃত্ত’ (১৯৩৯) গ্রন্থটি ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানের মূল তত্ত্ব ভারতীয় ভাষা সমূহের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও বাংলা ভাষার ঐতিহাসিক ব্যাকরণ সম্পর্কে আলোচনা করেছে। ভাষাবিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে তাঁর লেখা অপর গ্রন্থগুলি হল: ‘The Use of Cases in the Vedic Prose’ (১৯২৯), ‘A Comparative Grammar of Middle Indo-Aryan’ (১৯৬০), ‘An Etymological Dictionary Bengali’ (১৯৭১)।

প্রাচীন ও মধ্য ভারতীয় আর্যভাষা নিয়ে উল্লেখযোগ্য গবেষণাকর্ম করেছিলেন ড: বটকৃষ্ণ ঘোষ। তাঁর লেখা গ্রন্থ ‘Linguistic Introduction to Sanskrit’ (১৯৩৭) ঐতিহাসিক ভাষা চর্চার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড: কৃষ্ণপদ গোস্বামী ১৯৬৬ সালে লেখেন ‘বাংলা ভাষাতত্ত্বের ইতিহাস’। এছাড়াও ঐতিহাসিক ভাষা বিজ্ঞান চর্চায় যারা অবদান রেখেছেন তাঁরা হলেন: সুকুমার বিশ্বাস, পার্বতী চরণ ভট্টাচার্য, মুরারি মোহন সেন, অতীন্দ্র মজুমদার প্রমুখ। ড: বিজনবিহারী ভট্টাচার্য বাংলায় বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞান চর্চায় অগ্রগণ্য। এ বিষয়ে তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থটি হল ‘বাগর্থ’ (১৯৫০)। ড: দ্বিজেন্দ্রনাথ বসুর লেখা ‘বাংলা ভাষার আধুনিক তত্ত্ব ও ইতিকথা’ বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালে। এছাড়াও পরবর্তী সময়ে বাংলায় ভাষাবিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে যারা তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখেছেন তাঁদের মধ্যে কয়েকজন হলেন: মুহম্মদ আব্দুল হাই, ড: মুনির চৌধুরী, ড: মনিরুজ্জামান, ড: হুমায়ুন আজাদ, ড: আবুল কালাম মঞ্জুর মোর্শেদ, ড: মনসুর মুসা, ড: সুহাস চট্টোপাধ্যায়, ড: শিশির কুমার দাস, ড: পবিত্র সরকার প্রমুখ।

গ। শৈলীবিজ্ঞান চর্চা:

বাংলায় শৈলীবিজ্ঞান চর্চার সূত্রপাত ঘটে শিশিরকুমার দাশের হাত ধরে। ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত তাঁর লেখা ‘Early Bengali Prose : From Carey to Vidyasagar’ গ্রন্থে আধুনিক শৈলীবিজ্ঞানের ভিত্তিতে প্রথম বাংলা গদ্যের আলোচনা শুরু হয়। পরিসংখ্যানের সাহায্যে অর্থাৎ stylostatistics অবলম্বনে তিনি ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের লেখকবৃন্দ, রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগরের গদ্য বিশ্লেষণ করেন। এরপরে তাঁর ছাত্র নবেন্দু সেন তাঁরই সুযোগ্য তত্ত্বাবধানে লেখেন একটি গবেষণাগ্রন্থ: ‘গদ্যশিল্পী অক্ষয়কুমার দত্ত ও দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর’। পুরোপুরি আঙ্কিক পদ্ধতি অনুসরণ করে, গ্রাফের সাহায্যে পরিসংখ্যানের আশ্রয় গ্রহণ করে তিনি লেখকদ্বয়ের ভাষাশৈলী নিরূপণ করেছেন। তাঁর লেখা পরবর্তী বই ‘বাংলা গদ্য: স্টাইলিস্টক্‌স’ (১৯৮৮)-এ তিনি উক্ত দুই গদ্যকারের সঙ্গে সঙ্গে রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, প্রমথ চৌধুরী প্রমুখ সাহিত্যিকের ভাষাশৈলী বিশ্লেষণ করেছেন একই উপায়ে, সম্পূর্ণ নৈব্যর্ক্তিক (objective) সংখ্যানির্ভর পদ্ধতিতে। এর কিছুদিন আগে প্রকাশিত হয়েছিল আশিসকুমার দে’র ‘উপন্যাসের শৈলী: তারাশংকর ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়’ (১৯৮৩); ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর ‘সাহিত্যালোচনা ও শৈলীবিজ্ঞান’ নামক গবেষণাগ্রন্থটি। বাংলা শৈলীচর্চার শুরুর দিকেই ১৯৮১ সালে অরুণকুমার বসুর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘বাঙলা গদ্য শৈলীবিজ্ঞান’। পুরোপুরি পাশ্চাত্য পরিসরে গড়ে ওঠা শৈলীবিজ্ঞান নামক শৃঙ্খলাটিকে তৎকালীন বাংলা সমালোচনা জগতের সঙ্গে প্রাথমিক পরিচয় ঘটিয়ে দেওয়াই যে উক্ত বইটির মূল উদ্দেশ্য তা সম্পাদক এখানে ব্যক্ত করেছেন।

ঘ। সমাজভাষাবিজ্ঞান চর্চা:

           বিশ শতকের ছয়ের দশকে ‘সমাজভাষাবিজ্ঞান’ পরিভাষাটি পাশ্চাত্যে প্রথম উঠে আসে। তবে তার পূর্ববর্তী সময় থেকেও এই বিষয়ক চর্চা, আলোচনা ধারাবাহিকভাবে চলে আসছিল। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের ‘ভারতের ভাষা ও ভাষা সমস্যা’ ভারতের ভাষা সমস্যা সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা। সুনীতিকুমারের শিষ্য সুকুমার সেন আলোচনা করেছেন বাংলার নারীর ভাষা বিষয়ে। ১৯২৫ সালে লিখিত হয় তাঁর গবেষণা পুস্তিকা ‘Women’s Dialect in Bengali’। বর্ধমানের মুচি জনগোষ্ঠীর ভাষা নিয়েও তিনি একটি সংকলন প্রকাশ করেছিলেন ১৯৫৫ সালে। খুলনা জেলার মাঝির ভাষা নিয়ে নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী সংকলন গ্রন্থ লিখছেন ১৯২৪ সালে। ১৯২৩ সালে হেমন্তকুমার সরকার লেখেন ‘ছোটলোকের ভাষা’। সমাজের বিভিন্ন স্তরের জনগোষ্ঠীর ভাষা নিয়ে গবেষণা কর্ম ধারাবাহিকভাবে হয়ে এসেছে। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা ভাষার বিবিধ সমস্যা বিষয়ে মত প্রকাশ করেন তাঁর ‘আমাদের সমস্যা’ (১৯৪৯), ‘বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত’ (১৯৬৫) গ্রন্থে। ড: ভক্তিপ্রসাদ মল্লিক পশ্চিমবঙ্গের অপরাধ জগতের ভাষা নিয়ে লেখেন ‘অপরাধ জগতের ভাষা ও শব্দকোষ’। পুণ্যশ্লোক রায় ভাষার মূল্যায়ন ও সমতার ভাষা সম্পর্কে ‘ভাষার মূল্যায়ন’ শীর্ষক গ্রন্থ রচনা করেছেন। আধুনিক সময়ে পবিত্র সরকার লিখেছেন ‘ভাষাপ্রেম ভাষাবিরোধ’, ‘ভাষা দেশ কাল’ ইত্যাদি গ্রন্থসমূহ।

ঙ। উপভাষাবিজ্ঞান চর্চা:

উপভাষাকেন্দ্রিক চর্চা বাংলায় দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। ১৯১২ সালে যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি সংকলন করেন রাঢ়ের আঞ্চলিক ভাষা ‘রাঢ়ের কথিত ভাষা’। ১৯৪৩ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ পত্রিকায় দক্ষিণবঙ্গের কথ্যভাষা নিয়ে প্রবন্ধ লিখছেন অবিনাশ বন্দ্যোপাধ্যায়। মেদিনীপুরের উপভাষা নিয়ে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় লেখেন ‘সুহ্মক বাঙ্গলা’ (১৯৭৫)। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ লেখেন ‘নোয়াখালী এবং চট্টগ্রামের উপভাষা’ (১৯৬৪)। পশ্চিম ও পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলের উপভাষা নিয়ে যারা ক্ষেত্রসমীক্ষা ও গবেষণা করেছেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: অনিমেষ কান্তি পাল (পূর্ববাংলার একটি উপভাষা), শ্যামাপ্রসাদ দত্ত (উলুবেড়িয়ার উপভাষা), অরুণ কুমার মুখোপাধ্যায় (কামরূপী উপভাষা), নির্মলেন্দু ভৌমিক (প্রান্ত উত্তরবঙ্গের উপভাষা), শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী (সিলেটি উপভাষা), ধীরেন্দ্রনাথ সাহা (ঝাড়খণ্ডী উপভাষা), রেখা সিংহ (মানভূমের উপভাষা), নির্মল দাশ (উত্তরবঙ্গের ভাষা), অসীম কুমার বন্দোপাধ্যায় (নদীয়া জেলার উপভাষা), শ্যামাপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় (মুর্শিদাবাদ জেলার উপভাষা), সত্যনারায়ণ দাশ (বীরভূমের উপভাষা), ভব রায় (বাঁকুড়ার ভাষা), অমিতাভ চৌধুরী (শ্রীহট্টের উপভাষা), সুভাষচন্দ্র রায়চৌধুরী (পশ্চিম দিনাজপুরের ভাষা), রাজেন্দ্রকুমার মজুমদার (ময়মনসিংহের গ্রাম্যভাষা), চিন্তাহরণ চক্রবর্তী (নদীয়ার ভাষা) প্রভৃতি।

দৃষ্টি:

পাণিনির ‘অষ্টাধ্যায়ী’র চার হাজার সূত্র নির্মাণ করেছে সংস্কৃত ভাষার ব্যাকরণ। সংস্কৃত ভাষার ব্যাকরণ সর্বাপেক্ষা বিজ্ঞানসম্মত ব্যাকরণ। আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের ভিত্তিভূমি রচনা করেছে পাণিনির ব্যাকরণ। ধাতুর সঙ্গে বিভক্তি বা প্রত্যয় যোগে নতুন শব্দের সৃষ্টির যে ধারণা তিনি দিয়েছিলেন, তাই আধুনিক রূপতত্ত্বে ‘মুক্ত রূপিম’, ‘বদ্ধ রূপিম’-এর ধারণা তৈরি করেছে। পাণিনির গবেষণাকে পরবর্তী সময়ে সমৃদ্ধ করেছেন কাত্যায়ন ও পতঞ্জলি। এছাড়াও প্রাচীন ভারতের যে সকল বৈয়াকরণ সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল, সেগুলি হল: ঐন্দ্র সম্প্রদায়, চান্দ্র সম্প্রদায়, জৈনেন্দ্র সম্প্রদায়, শাকটায়ন সম্প্রদায়, হেমচন্দ্র সম্প্রদায়, কাতন্ত্র স্মপ্রদায়, সারস্বত সম্প্রদায়, মুগ্ধবোধ সম্প্রদায়, নব্যন্যায় সম্প্রদায় প্রভৃতি। এই বৈয়াকরণ সম্প্রদায়গুলি যে বিপুল ব্যাকরণ শাস্ত্র রচনা করেছে, তার প্রেক্ষিতেই বিচার্য হবে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞান সঞ্জাত ধারণাগুলি।

লৌকিক প্রয়োজন:

বিদ্যালয় পাঠ্য ব্যাকরণে সংস্কৃতানুগ প্রাচীনপন্থী গতানুগতিকতার বদলে ভাষাবিজ্ঞানসম্মত আধুনিকতার স্পর্শ থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন। তাই ভাষাবিজ্ঞানী, ব্যাকরণবিদ, সিলেবাস প্রণেতাসহ সাধারণ পাঠক সমাজকে মুক্ত চিত্তে কোনরকম সংস্কারের বশবর্তী না হয়ে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞান অনুযায়ী ব্যাকরণ সংস্কারের প্রকল্পকে স্বাগত জানাতে হবে।

ভারত বহু ভাষাবিশিষ্ট রাষ্ট্র। ভাষার ভিত্তিতেই রাজ্যের সীমানা পুনর্গঠন হয়েছিল। ভাষার গুরুত্ব প্রাপ্তি নিয়ে সংঘাতও এখানে নতুন নয়। ভাষাবিদরা বহু আগে থেকেই তা অনুমান করতে পেরেছিলেন। তাই তাঁরা এবিষয়ে রেখে গিয়েছেন তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ মতামত। সেগুলিকে ভিত্তি হিসেবে রেখেই ভাষাকেন্দ্রিক সমস্যার নিরসন প্রয়োজন। এর সঙ্গে সঙ্গে বিপন্ন ভাষাগুলির সংরক্ষণও অত্যন্ত জরুরি।

বাংলা ভাষায় রচিত ভাষাচর্চা সংক্রান্ত যাবতীয় প্রবন্ধসমূহের যথাযথ সংরক্ষণ অত্যন্ত প্রয়োজন। ভাষা যেহেতু সংযোগের মাধ্যম, তাই প্রতিটি ভাষার মধ্যে রয়েছে অপার সম্ভাবনা; প্রযুক্তির সাহায্যে ভাষাবিজ্ঞানের গবেষণা লব্ধ ফলাফল দিয়ে তৈরি হতে পারে কোন কৃত্রিম ভাষা সংবিধি যা কখনো রাষ্ট্রের পক্ষে প্রয়োজনীয় হয়ে উঠতে পারে। 

তথ্যসূত্র:

১। শ’ ডঃ রামেশ্বর, ১৯৯৬, সাধারণ ভাষাবিজ্ঞান ও বাংলা ভাষা, কলকাতা, পুস্তক বিপণি, পৃষ্ঠা ১৫-১৬

২। শ’ ডঃ রামেশ্বর, ১৯৯৬, পৃষ্ঠা ২১

৩। শ’ ডঃ রামেশ্বর, ১৯৯৬, পৃষ্ঠা ৩৭

৪। বন্দ্যোপাধ্যায় শ্রীললিতকুমার, ২০১০, ‘ব্যাকরণ-বিভীষিকা’, দীপঙ্কর ঘোষ (সং), প্রসঙ্গ: বাংলা ব্যাকরণ (খণ্ড ১), কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, পৃষ্ঠা ১০৪

৫। শ’ ডঃ রামেশ্বর, ১৯৯৬, পৃষ্ঠা ৫০

৬। সরকার পবিত্র, ১৯৮৫, ভাষা দেশ কাল, কলকাতা, জি এ ই পাবলিশার্স, পৃষ্ঠা ১৬৪

৭। শ’ ডঃ রামেশ্বর, ১৯৯৬, পৃষ্ঠা ৬৪৬

৮। শহীদুল্লাহ ডঃ মুহম্মদ, ১৯৯৮, বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত, ঢাকা, মাওলা ব্রাদার্স, পৃষ্ঠা ১৮

সহায়ক গ্রন্থ, পত্রপত্রিকা:

১। সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায় (সম্পা.), ২০২২, বাঙলায় সমাজভাষাচর্চা, কলকাতা, নির্ঝর

২। সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, ২০১৫, ভাষা ভাষা কথা, কলকাতা, কারিগর

৩। সৌরভ রঞ্জন ঘোষ (সম্পা.), সেপ্টেম্বর ২০২২, সংবর্তক, ভাষাতত্ত্ব বিশেষ সংখ্যা-১


Authored by কৌশিক কর্মকার, সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, মহারাজা নন্দকুমার মহাবিদ্যালয়, নন্দকুমার, পূর্ব মেদিনীপুর

Published by,