বাঙালির টোল সংস্কৃতি

From enIKSwiki
Revision as of 12:28, 27 September 2024 by Sriram (talk | contribs)
(diff) ← Older revision | Latest revision (diff) | Newer revision → (diff)
Jump to navigation Jump to search

সারসংক্ষেপ:

বাংলার দেশজ শিক্ষাধারার সূত্রে টোল-চতুষ্পাঠীকে দেখা যেতে পারে। ‘গুরুগৃহ বা তপোবন আশ্রম থেকে টোল-চতুষ্পাঠীর প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের পথে বৌদ্ধ মঠের শিক্ষাধারা একটা ধাপ’ বলে মনে করেছেন ঐতিহাসিকেরা। পঞ্চবিদ্যার বিষয়গুলি টোলে পড়ানো হত, সেইসঙ্গে কাব্য-ব্যাকরণেরও প্রাধান্য ছিল। কিন্তু গুরুগৃহে বেদপাঠের বিষয়টি বাংলার টোলশিক্ষায় দেখা যায়নি। ফলে একেবারে নিজস্বভাবেই গড়ে উঠেছিল এই শিক্ষাব্যবস্থা। দেশজ মানুষদের নিয়ে, দেশজ মানুষদের জন্য ও দেশীয় পদ্ধতি অনুসরণ করে।

         ইংরেজ অধিকারের পরেও এই ব্যবস্থা সচল থেকেছে। কিন্তু উপনিবেশের প্রভুদের আধিপত্য ধীরে ধীরে কোণঠাসা করে ফেলে এই প্রতিষ্ঠানগুলিকে। বাংলার নবজাগরণ হোক কিংবা সারস্বত ইতিহাস, টোল-চতুষ্পাঠীকে আমাদের স্মরণ করতেই হবে। ভারতীয় জ্ঞান পরম্পরা যেভাবে অতীত থেকে খুঁজে আনতে চায় বিস্মৃতপ্রায় গৌরবকে, সেই সূত্রেই আমরা বাঙালির টোল সংস্কৃতিকে ফিরে পড়তে চাইছি। বর্তমানের সঙ্গে অতীতের মিলনের মধ্য দিয়ে যদি গড়ে তোলা যায় ভবিষ্যৎ প্রতিবেদন, তবেই এই আলোচনা সার্থক।

বিভাগ:

টোলের সূচনা, শিক্ষাব্যবস্থা, সারস্বত চর্চা, নবদ্বীপের টোল, ভাটপাড়ার টোল, গুপ্তিপাড়ার চতুষ্পাঠী, বহির্বঙ্গে টোল, দেশজ শিক্ষাধারার অবলুপ্তি, প্রবহমান ঐতিহ্য   

ভূমিকা:

ইংরেজ আগমনের পূর্বে আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিজস্ব ছন্দেই চলছিল। এখনকার বিচারে প্রাথমিক ও উচ্চশিক্ষা এরকম ভাগ ছিল। পাঠশালায় প্রাথমিক শিক্ষাদান করা হত। প্রধানত ছেলেরাই এখানে পড়তে আসত। পুজো-পার্বণে পাঠশালা ছুটি থাকত। সাপ্তাহিক ও বার্ষিক ছুটির চল ছিল না। সাধারণভাবে গুরুমশাই তাঁর সময়মতো পাঠদান করতেন। গ্রামে সম্পন্ন গৃহস্থের বাড়ি কিংবা চণ্ডীমণ্ডপে পাঠশালা বসত। তেমন কোনো জায়গা না পাওয়া গেলে গাছতলাতেও পড়াশোনা চলত। অনাথনাথ বসু পাঠশালার পাঠ্য সম্পর্কে জানিয়েছেন— “পাঠশালার পাঠ্য ছিল সংকীর্ণ ; সামান্য লেখাপড়া ও জমাখরচের হিসাব, পাঠ্য বলিতে এটুকুই ছিল। তাহাতে না ছিল ইতিহাস ভূগোল, না ছিল ধর্মশিক্ষা স্বাস্থ্যতত্ত্ব, হাতের কাজ বা ব্যায়াম। ছেলে চার পাঁচ বছর পাঠশালায় কাটাইয়া কোনোমতে রামায়ণ মহাভারত পড়িতে, চিঠিটা পত্রটা লিখিতে, দলিল দস্তাবেজ তৈয়ারি করিতে ও জমিদারী মহাজনী হিসাবটা রাখিতে শিখিলেই তাহার পাঠশালার শিক্ষা শেষ হইত। তখনও ছাপা পুস্তকের চল হয় নাই ; সুতরাং পাঠশালায় সেগুলির ব্যবহার ছিল না।”১ আধুনিক যুগের প্রেক্ষিতে এই পাঠ্যসূচি পর্যাপ্ত মনে না হলেও সেকালের নিরিখে এটি যথাযথ ছিল বলে মনে হয়।

         টোলগুলি ছিল উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্র। পাঠশালায় বেতন দিতে হলেও ‘উচ্চশিক্ষা অবৈতনিক ছিল।’ টোলগুলি ধনাঢ্যদের দানে চলত। সংস্কৃত শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে ও ভারতীয় ভাবধারার বিকাশে টোলগুলির ভূমিকার কথা অবশ্যস্মর্তব্য।

ঐতিহাসিক পটভূমি:

“ভারতবর্ষে এ পর্য্যন্ত যত প্রকার শিক্ষার প্রথা প্রবর্ত্তিত হইয়াছে তন্মধ্যে টোল অথবা চতুষ্পাঠীতে যে সংস্কৃত শিক্ষা হয়, তাহার প্রতি অনেক লোকের শ্রদ্ধা অধিক। সমাজের কোন্‌ অবস্থা হইতে এইরূপ শিক্ষাপ্রণালী প্রবর্ত্তিত হইয়াছে, তাহা কেহই বলিতে পারেন না, তবে বৈদিক যুগের সেই শিক্ষা পদ্ধতি যে দেশ কাল পাত্র ভেদে পরিবর্ত্তিত হইয়া বর্ত্তমান অবস্থায় পরিণত হইয়াছে তদ্বিষয়ে সন্দেহ করিবার কারণ দেখা যায় না।”২

         দীনেশচন্দ্র সেনের মতে, ‘বৌদ্ধ সঙ্ঘারামগুলি নষ্ট হওয়ার পরে বাঙ্গলা দেশ ছাইয়া টোল বসিয়া গেল, যাহা এক ছিল তাহা বহু হইল।’ আমরা জানি, প্রাচীন ভারতে নালন্দা ছিল ‘সবচেয়ে বড় আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়’। এখানে ৮৫০০ জন ছাত্র ও ১৫০০ জন অধ্যাপক থাকতেন। সর্বার্থেই এটি হয়ে উঠেছিল আন্তর্জাতিক শিক্ষাকেন্দ্র। বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আমরা তক্ষশীলাকে চিহ্নিত করতে পারি। প্রায় ৬০টিরও বেশি বিষয় এখানে পড়ানো হত। বহিরাগত আগ্রাসনে এই প্রতিষ্ঠানগুলি যখন ধ্বংসপ্রাপ্ত হল, ওদন্তপুর, বিক্রমশিলা প্রভৃতি সংকটের মুখে পড়ল, অনুমান করা যায় তখনই বিকল্প সারস্বত কেন্দ্র হিসেবে ‘বিহারের সঙ্ঘারামগুলির পরে মিথিলা ও নবদ্বীপ’ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল। অবশ্য, ‘তখন বাঙ্গালী স্বাধীনতা হারাইয়া বসিয়াছে।’  

নবদ্বীপের টোল

শিক্ষাব্যবস্থা:

বৃন্দাবনদাস ‘চৈতন্যভাগবত’-এ লিখেছেন—‘নানাদেশ হৈতে লোক নবদ্বীপ যায়/ নবদ্বীপ পড়িলে সে বিদ্যারস পায়/ অতএব পড়ুয়ার নাহি সমুচ্চয়/ লক্ষ কোটি অধ্যাপক নাহিক নির্ণয়।” পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে নবদ্বীপে আমরা তিন শ্রেষ্ঠ পুরুষকে— রঘুনাথ শিরোমণি, স্মার্ত্ত রঘুনন্দন ও শ্রীচৈতন্যদেব। গঙ্গাদাস পণ্ডিতের টোলে অধ্যয়ন করেছিলেন নিমাই। শিক্ষান্তে নিজেই টোল স্থাপন করলেন। দিগ্বিজয়ী পণ্ডিত কেশবকাশ্মীরীকে তর্কযুদ্ধে পরাস্ত করেন। তারপর চৈতন্যের জীবন চলল ভিন্ন পথে। সে অবশ্য আলাদা প্রসঙ্গ।  

দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর ‘বৃহৎ বঙ্গ’ গ্রন্থে ১৭৯১ খ্রিস্টাব্দে ‘কলিকাতা মাসিক’ (Calcutta Monthly) নামে ‘একখানি ইংরেজ-সম্পাদিত’ পত্রিকার প্রতিবেদনের বেশ কিছু অংশ উদ্ধৃত করেছেন। সেখান থেকে জানতে পারি, নবদ্বীপের মধ্যে বিখ্যাত ছিল নবদ্বীপ, শান্তিপুর ও গোপালপাড়ার টোল। এদের ব্যয়নির্বাহের জন্য ছিল সম্পত্তির বন্দোবস্ত। নিজস্ব সম্পত্তিতে ব্যয় সংকুলান না হলে কৃষ্ণনগরের মহারাজ মুক্তহস্তে সাহায্য করতেন। ষোড়শ শতকে নবদ্বীপে টোলগুলির সমৃদ্ধিশালী অবস্থা ছিল। ভারতীয়দের তর্কপ্রিয়তার রীতি মেনে দুজন অধ্যাপকের মধ্যে তর্ক হত। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি রাজন্যবর্গও সেই তর্কসভায় উপস্থিত থাকতেন। টোলের শিক্ষার্থীরা পাঠ্য বিষয় যেমন মুখস্থ করতেন, তেমনি মৌলিক গ্রন্থ ও টীকা রচনাতে বিশেষ উৎসাহ দেওয়া হত এবং সেই উদ্দেশ্যে বৃত্তি ও পুরস্কারের প্রচলন ছিল। দীনেশচন্দ্র সেন কাউএল সাহেবের রিপোর্টের সারাংশ উদ্ধৃত করেছেন, যেখান থেকে আমরা টোলের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে পারি—“নবদ্বীপে প্রধানতঃ স্মৃতি ও ন্যায় পড়ানো হইয়া থাকে। এই বিষয়ে নবদ্বীপের খ্যাতি ভারতব্যাপী। বিশেষতঃ ন্যায় পড়িবার জন্য এখানে ভারতবর্ষের সর্ব্বস্থান হইতে ছাত্র আসিয়া থাকে। আমি আমার অবস্থিতিকালে প্রৌঢ়বয়স্ক, এমন কি যাহাদের চুল প্রচুর পরিমাণে পাকিয়া গিয়াছে, এমন সকল পড়ুয়াকে লাহোর, পুনা, তামিল দেশ, এমন কি মিথিলা ও নেপাল প্রভৃতি স্থান হইতেও আসিতে দেখিয়াছি। স্মৃতির টোলে সাধারণতঃ ৮ বৎসর পড়িতে হয়। ন্যায়ের টোলে ১০ বৎসরের নীচে কিছুতেই হয় না। টোলগুলি মাসে ১০ দিন করিয়া বন্ধ থাকে। এইভাবে প্রতিপদ, অষ্টমী, ত্রয়োদশী, চতুর্দ্দশী, পৌর্ণমাসী, শুক্ল ও কৃষ্ণপক্ষের দুই তিথিতেই টোল বন্ধ থাকে। ইহা ছাড়া সরস্বতী পূজার দুই সপ্তাহ এবং অন্যান্য পর্ব্ব উপলক্ষেও ছাত্রগণ ছুটি পায়। ন্যায়ের টোলে ছেলেরা আষাঢ় হইতে কার্ত্তিক পর্য্যন্ত ছুটী ভোগ করে। স্মৃতির টোলে ভাদ্র হইতে কার্ত্তিক পর্য্যন্ত। লাহোর হইতে ত্রিবাঙ্কুর পর্য্যন্ত বহুদেশ হইতে ছাত্রগণ নবদ্বীপে আসিয়া থাকে। নবদ্বীপের উপাধি পাইলে ভারতীয় সমস্ত বিদ্যাকেন্দ্রে সেই পণ্ডিত সম্মানিত হন। যদিও বৎসরের কয়েকমাস টোলগুলি বন্ধ থাকে, বাকী কয়েক মাস ছাত্রগণ প্রাণান্ত পরিশ্রম করিয়া এই ক্ষতি পূরণ করিয়া থাকেন।”৩

         কাউএল সাহেব পণ্ডিত ও ছাত্রদের জীবনযাত্রার সারল্য ও কষ্টসহিষ্ণুতার কথা বলেছেন। প্রসঙ্গত বুনো রামনাথের কথায় আসা যেতে পারে। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল রামনাথ তর্কসিদ্ধান্ত। রাজনারায়ণ বসুর ‘সেকাল ও একাল’ বইতে বলেছেন, যেহেতু এই ন্যায়শাস্ত্রের অসামান্য পণ্ডিত ‘রাজসভাবিচরণকারী চাটুকার ভট্টাচার্য্যদিগের ন্যায় সভ্যতার নিয়ম পরিজ্ঞাত ছিলেন না’, তাই তাঁকে এই নামে অভিহিত করা হত। “তৎকালে নিয়ম ছিল যে, কোন ছাত্রের পাঠ শেষ হইলে তিনি নবদ্বীপের ( কৃষ্ণনগরের ) রাজ-সমীপে উপস্থিত হইয়া বিদ্যার পরিচয় দিতেন ও রাজার নিকট টোল করিবার সাহায্য ও অনেক ভূমি প্রাপ্ত হইতেন। রামনাথের অবস্থা ভাল ছিল না বটে, কিন্তু রাজসমীপে উপস্থিত হইলেন না। তিনি নবদ্বীপের প্রত্যন্ত প্রদেশে ( যেখানে পুরাতন পাকা-টোল ছিল, এবং এখন যেখানে সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যাপীঠ স্থাপিত হইয়াছে ) বনের মধ্যে কুটীর নির্মাণ করিয়া, তথায় শাস্ত্রালোচনায় প্রবৃত্ত রহিলেন।”৪ রামনাথের পাণ্ডিত্যে রাজা নবকৃষ্ণ বিশেষ সন্তুষ্ট হয়ে প্রচুর ধন দিতে চাইলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি। এই নিস্পৃহতা তুলনাহীন।

সারস্বত চর্চা: ‘

নবদ্বীপ-মহিমা’ বই থেকে জানা যায় যে, ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দে পর্যটক ভোলানাথ চন্দ্র যখন নবদ্বীপে আসেন, তখন শ্রীরাম শিরোমণির টোলে চল্লিশজন ছাত্র ছিল। আসাম, কালীঘাট থেকে একজন করে ছাত্র এসেছিল। বিভিন্ন স্থান থেকে ছাত্রেরা যেমন নবদ্বীপে আসত, তেমনি বিখ্যাত পণ্ডিতেরাও থিতু হতেন নবদ্বীপে। যেমন মাধবচন্দ্র তর্কসিদ্ধান্তের পূর্বপুরুষ নবদ্বীপে এসেছিলেন যশোহর থেকে। বিখ্যাত পণ্ডিত রামনারায়ণ তর্কপঞ্চাননের ছাত্র কৃষ্ণকান্ত বিদ্যাবাগীশ জীমূতবাহন-কৃত দায়ভাগের ‘টীকা’, কাব্যপ্রকাশিকার ‘টীকা’ রচনা করেন। তাঁর লেখা তিনটি কাব্যগ্রন্থ হল—‘গোপাললীলামৃত’, ‘চৈতন্যচিন্তামৃত’, ও ‘কামিনীকামকৌতুক’। এছাড়া তিনি ‘ন্যায়রত্নাবলী’ ও ‘তন্ত্ররত্নাবলী’ নামে ন্যায় ও তন্ত্রশাস্ত্রের সার সংকলন করেছিলেন। বাঙালির সারস্বতচর্চার ক্ষেত্রে টোল-চতুষ্পাঠীর পণ্ডিতদের ভূমিকা অবিস্মরণীয়। রঘুনাথ শিরোমণির ‘তত্ত্বদীধিতি’, মথুরানাথ শিরোমণির ‘তত্ত্বালোক রহস্য’, কণাদ তর্কবাগীশের ‘তত্ত্বটীকা’, মধুসূদন ঠাকুরের ‘তত্ত্বালোক-কণ্টকোদ্ধার’, রুদ্র ন্যায়বাচস্পতির ‘তত্ত্বদীঘিতিব্যাখ্যা’, মহাদেব পণ্ডিতের ‘তত্ত্বভবানন্দী ব্যাখ্যা’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। শুধু ন্যায়শাস্ত্র নয়, স্মৃতিশাস্ত্রেও নবদ্বীপের পণ্ডিতদের ব্যুৎপত্তি ছিল। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভাসদ্‌ রামানন্দ বাচস্পতি লেখেন ‘আহ্নিকাচার রাজ’ নামক স্মৃতিগ্রন্থ। মহামহোপাধ্যায় মধুসূদন স্মৃতিরত্ন মুদ্রিত করেন রঘুনন্দনের স্মৃতিতত্ত্ব।


ছাত্র-শিক্ষক সংক্রান্ত:

‘নবদ্বীপ-মহিমা’-য় ‘বর্ত্তমান নবদ্বীপের চতুষ্পাঠী’ অংশে ১৯৩৭ সালে নবদ্বীপের চতুষ্পাঠী, অধ্যাপক ও অধ্যাপনার বিষয় সম্পর্কিত যে তথ্য পাই, তা দীর্ঘ হলেও সম্পূর্ণ উদ্ধৃত করছি—

ন্যায়ের টোল।–

গবর্ণমেন্টের দুইটি ন্যায়-চতুষ্পাঠীতে মঃ মঃ শ্রীচণ্ডীদাস ন্যায়তর্কতীর্থ ও শ্রীপ্রাণগোপাল তর্কতর্কতীর্থ (অস্থায়ী) অধ্যাপনা করিতেছেন। রায় ভগবানদাস বগলা বাহাদুরের প্রতিষ্ঠিত কাঁচাটোলে জগদীশ-বংশীয় শ্রীযতীন্দ্রনাথ তর্কতীর্থ অধ্যাপনা করিতেছেন। ইনি ‘বুধবাগ্‌বিবেক’ নামক একখানি গ্রন্থ প্রণয়ন করিতেছেন। এই টোলে ছাত্রদের বাসস্থান ও অশনের ব্যবস্থা আছে। পাকাটোলের অধ্যাপক শ্রীনিশিকান্ত তর্কতীর্থ ও শ্রীঅমরচন্দ্র তর্কতীর্থ। শ্রীশিবনাথ তর্কতীর্থ, রামকণ্ঠ তর্কতীর্থ এবং গদাধর-বংশীয় শ্রীরামগোপাল তর্কতীর্থ  নিজ নিজ টোলে অধ্যাপনা করেন।

স্মৃতির টোল।–

গভর্ণমেন্টের স্মৃতির টোলের অধ্যাপক শ্রীত্রিপথনাথ স্মৃতিতীর্থ।

         এতদ্ব্যতীত নিম্নলিখিত টোলগুলিতে ন্যায়, স্মৃতি, কাব্য, ব্যাকরণ প্রভৃতি বিবিধ বিষয় পড়ান হইয়া থাকে।

চৈতন্য চতুষ্পাঠী।--

১৮৯৫ খৃষ্টাব্দে, তারাসের বিদ্যোৎসাহী জমীদার রাজর্ষি রায় বনমালী রায় বাহাদুরের অর্থ সাহায্যে, পণ্ডিত ব্রজরাজ গোস্বামী মহাশয় কর্ত্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়। এই চতুষ্পাঠী বর্ত্তমানে গবর্ণমেন্ট ও তারাসের জমীদারগণ হইতে সাহায্য পায়। শ্রীঅতুলকৃষ্ণ পঞ্চতীর্থ ইহার বর্ত্তমান অধ্যাপক।

মিউনিসিপাল টোল।–

এই টোলে মনোরঞ্জন কাব্যব্যাকরণস্মৃতিতীর্থ অধ্যাপনা করেন। ইহাতে মিউনিসিপালিটী কাব্য ও ব্যাকরণ পাঠের জন্য মাসিক ২০্‌ টাকা সাহায্য করেন।

শ্রীবাসাঙ্গন টোলের অধ্যাপক  শ্রীআশুতোষ সিদ্ধান্ত, ‘সার্ব্বজনীন গৌরাঙ্গ চতুষ্পাঠীর’ অধ্যাপক ভবানন্দ কাব্যরত্ন, মণিপুর মহারাজার প্রতিষ্ঠিত ‘চূড়াচাঁদ চতুষ্পাঠী’র শ্রীশিবদত্ত শর্ম্মা তর্কতর্কতীর্থ, ‘লীলাবতী ভক্তিশাস্ত্রপীঠে’র অধ্যাপক শ্রীনলিনীকান্ত তর্কতীর্থ, শিতিকণ্ঠ স্মৃতিতীর্থ ও কমলাকান্ত স্মৃতিরত্নের টোল, এবং ‘বিষ্ণুপ্রিয়া দর্শন টোলে’র অধ্যাপক শ্রীগৌরকিশোর বেদান্ততীর্থ বর্ত্তমান রহিয়াছেন।

…

ব র্ত্তমানে নবদ্বীপে ছয়খানি টোলে ন্যায়, পাঁচখানি টোলে স্মৃতি ও আটখানি টোলে কাব্য, ব্যাকরণ, পুরাণ, দর্শন ও অন্যান্য শাস্ত্রের অধ্যাপনা হয়। সার্ব্বজনীন গৌরাঙ্গ চতুষ্পাঠীতে জাতিবর্ণনির্ব্বিশেষে সকল ছাত্রকেই পাঠ দেওয়া হয়।

উক্ত টোল-সমূহে প্রায় ২৫০ ছাত্র অধ্যয়ন করে। তন্মধ্যে ৬০ জন ন্যায়, ৫০ জন স্মৃতি এবং অবশিষ্ট অন্যান্য শাস্ত্র অধ্যয়ন করে। এই সকল ছাত্রের মধ্যে প্রায় ১২৫ জন গবর্ণমেন্টের বৃত্তি প্রাপ্ত হন।৫

এই সূত্রে আবার দীনেশচন্দ্র সেনের লেখায় আসা যেতে পারে। রাজা রুদ্রের সময়ে আনুমানিক ১৬৮০ খ্রিস্টাব্দে ৪০০০ জন ছাত্র ও ৬০০ জন অধ্যাপক ছিলেন। ১৭৯১ খ্রিস্টাব্দে সেই সংখ্যা কমে হয় যথাক্রমে ১১০০ ও ৪০০। ১৮২৯-এ টোলের সংখ্যা হ্রাস পেয়ে হয় ৫০০-৬০০। ১৮৬৭-তে ছাত্রসংখ্যা এসে দাঁড়ায় ১৫০-য়। অধ্যাপকসংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই কম ছিল।  

ভাটপাড়ার টোল

বিদ্যাক্ষেত্রে নবদ্বীপের একাধিপত্যকে একসময় চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল ভাটপাড়া। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের আয়োজিত বিচারসভায় শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি পেয়েছিলেন বীরেশ্বর ন্যায়ালঙ্কার। বর্ধমান মহারাজার সভায় দয়ানন্দ সরস্বতীকে তর্কে পরাস্ত করেছিলেন তারাচাঁদ তর্করত্ন। অর্জুনদেব সেনশর্মা ‘ভাটপাড়া তখন’ লেখায় বলেছেন—“ভাটপাড়া মানে বাংলার শিক্ষা-ঐতিহ্য। উনিশ শতকের মাঝামাঝিও সেই ‘ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড়’-এ ৪৮টি চতুষ্পাঠী, দেড়শোরও বেশি অধ্যাপক। ব্রিটিশ সরকার সেরা পণ্ডিতদের ‘মহামহোপাধ্যায়’ উপাধিতে ভূষিত করতেন। তখনকার সংস্কৃতজ্ঞদের মধ্যে আজকের ‘ভারতরত্ন’র মতোই ছিল সেই সম্মান। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী থেকে গোপীনাথ কবিরাজ, তামিলনাড়ুর স্বামীনাথ আয়ার ভূষিত হয়েছেন এই সম্মানে। উনিশ শতকের শেষ ভাগে সারা ভারতে জীবিত ‘মহামহোপাধ্যায়’ ১৯ জন, পাঁচ জনই ভাটপাড়ার।”৬ এই লেখায় প্রাবন্ধিক দেখাতে চেয়েছেন ভাটপাড়া নিজেকে বদলেছে বারবার। যেখানে প্রধানত সাংখ্য, স্মৃতি, জ্যোতিষ ও ন্যায়ের চর্চা হত, সেখান থেকেই পরবর্তীকালে উঠে আসবেন প্রমথনাথ তর্কভূষণ ‘মায়াবাদ’ নিয়ে। বিনয় ঘোষ লক্ষ করেছিলেন সংস্কৃত শিক্ষার কেন্দ্র হয়েও এই অঞ্চলের পণ্ডিতরা ‘আধুনিক শিক্ষাকে অন্ধ গোঁড়ামির জন্য বর্জন করেননি।’ পঞ্চানন তর্করত্ন নিজের জমির টোলগুলিকে একত্র করে ১৯০০ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘সংস্কৃত কলেজ’।

         ভাটপাড়া থেকে প্রকাশিত বাশিষ্টশ্রীকমলকৃষ্ণস্মৃতিতীর্থ সংকলিত ‘ভট্টপল্লীবাশিষ্টবংশপরিচয়’ বই থেকে এই অঞ্চলের বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের সম্বন্ধে জানা যায়। যাইহোক, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভাটপাড়ার গৌরব ম্লান হয়েছে। অধ্যাপক সেনশর্মা লেখার শেষাংশ উদ্ধৃত করছি, যা থেকে বাঙালির টোল সংস্কৃতির পালাবদলকে চিহ্নিত করা সম্ভব—“যেখানে উত্থান, সেখানেই লুকিয়ে ছিল অবনতির বীজ। বাংলার অন্যান্য ‘ভাটপাড়া’কে ছাপিয়ে নৈহাটি শ্যামনগর কাঁকিনাড়া অঞ্চলের ভাটপাড়া যে প্রধান হয়ে উঠল, তার অন্যতম কারণ, সে রাজধানী কলকাতার কাছে। মুদ্রণযন্ত্র, রেলগাড়ি এবং আধুনিকতার হরেক সুবিধা। আধুনিকতার বয়ানেই এই এলাকায় ঢুকে এল চটকল, বিভিন্ন কারখানা। ব্রাহ্মণসমাজ আর যজনযাজন অধ্যাপনা নিয়ে আলাদা থাকতে পারলেন না। নতুন গঞ্জ, শ্রমিক মহল্লা, ভাটিখানা, সবই ছড়িয়ে পড়ল দুর্বার গতিতে। সেই নতুন বাংলায় আর ন্যায়শাস্ত্র নেই, ফণিভূষণ তর্কবাগীশ থেকে শ্রীজীব ন্যায়তীর্থ সক্কলে বিস্মৃত। এই ভাটপাড়া-নৈহাটি-জগদ্দল উঠে এল সমরেশ বসুর ‘বিটিরোডের ধারে’ বা ‘শ্রীমতী কাফে’র মতো উপন্যাসে।

শুধু ন্যায়শাস্ত্রের টোলগুলি হারিয়ে গেল। এ শুধু ভাটপাড়া নয়, গোটা বাংলার ট্র্যাজেডি।”৭

 গুপ্তিপাড়ার চতুষ্পাঠী

         সপ্তদশ শতাব্দীর শুরু থেকে ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত সারস্বতচর্চার ক্ষেত্রে গুপ্তিপাড়ার পণ্ডিতসমাজের বিশেষ স্থান ছিল। বিনয় ঘোষ তাঁর ‘পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি’ বইতে গুপ্তিপাড়ানিবাসী শতাবধান ভট্টাচার্য ও তাঁর পুত্র চিরঞ্জীব ভট্টাচার্যের কথা বলেছেন, যাঁরা সপ্তদশ শতাব্দীতে বারাণসী ও গোয়ালিয়রে প্রায় সত্তর বৎসর রাজসভা অলঙ্কৃত করেছিলেন।

         বাণেশ্বর বিদ্যালঙ্কার, হরিনারায়ণ সার্বভৌম, রামগোপাল বিদ্যাবাগীশ প্রমুখ পণ্ডিতের স্মৃতিধন্য গুপ্তিপাড়ায় বংশপরম্পরায় টোলচতুষ্পাঠী স্থাপন ও অধ্যাপনা সম্ভবপর হয়েছিল রায়পুরের রাজা বিশ্বেশ্বর রায়, বাঁশবেড়িয়া, বর্ধমান, নদীয়ার রাজবংশ, কুমারহট্টের সাবর্ণ চৌধুরী সহ বিভিন্ন ভূস্বামীদের সহায়তায়। টোলসংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকদের কথা তাই উল্লেখ করতেই হয়। ঐতিহাসিক বিনয় ঘোষ ১৩২২ বঙ্গাব্দের ‘সম্মিলনী’ পত্রিকায় প্রকাশিত শ্রীপতি কবিরত্নের লেখার অংশবিশেষ উদ্ধৃত করেছেন। যার থেকে এই অঞ্চলের চতুষ্পাঠী সম্পর্কে জানা যায়— “দীর্ঘ চতুষ্পাঠীর দুই পার্শ্বে মৃত্তিকার বেদী, সেই বেদীর উপরে প্রাচীন ব্রহ্মচর্যের অনুকরণে হীনবেশ কষ্টসহিষ্ণু বিলাসবিমুখ ছাত্রগণ শাস্ত্রাধ্যয়নে রত থাকিতেন। বেদীদ্বয়ের মধ্যস্থিত ভূমিভাগে স্তূপীকৃত পার্থিব শিবলিঙ্গ শিক্ষার্থীগণের নিষ্ঠার সাক্ষীস্বরূপ বর্তমান থাকিত। ছাত্রের সমাবেশবশত দরিদ্র অধ্যাপকের গৃহ নিত্যনূতন উৎসবের আকার ধারণ করিত। অধ্যাপকগৃহিণী স্বহস্তে রন্ধন করিয়া ছাত্রদিগকে পুত্রবৎ স্নেহে ভোজ করাইতেন, নিশীথকালে চতুষ্পাঠীর গবাক্ষমুখে পরিদৃষ্ট আলোকরেখা বিদ্যার্থীগণের শাস্ত্রাভ্যাস শ্রমের নীরব সাক্ষ্য প্রদান করিত। অনধ্যায়ের দিন হাস্য ও পরিহাসের অবদান ঘটিত। কথোপকথন তর্কযুদ্ধে পরিণত হইত, শাস্ত্রালাপ বিতণ্ডার আকার ধারণ করিত।”৮

         গুপ্তিপাড়ার পণ্ডিতসমাজের কথা উঠলে এটাও বলতে হয় যে, এখানকার ব্রাহ্মণ-বৈদ্যদের উদ্যোগেই বাংলায় প্রথম বারোয়ারি পূজার প্রচলন হয়।

টোল : বঙ্গ ও বহির্বঙ্গে

         ‘কেবল নবদ্বীপ বলিয়া নয়, নবদ্বীপের দক্ষিণে ও উত্তরে বহুদূর যাবৎ ভাগীরথীর দুই ধারে, বিশেষত পশ্চিম তটে বহুতর টোল ছিল।’ জানিয়েছেন অক্ষয়চন্দ্র সরকার ‘সেকালের টোল’ প্রবন্ধে। বাঁশবেড়িয়া, ত্রিবেণী, কুমারহট্ট, ভাটপাড়া, জয়নগর, আন্দুল, বালি প্রভৃতি স্থানে টোলের সংখ্যা উল্লেখিত হয়েছে কালীকিঙ্কর দত্তের ‘STUDIES IN THE HISTORY OF THE BENGAL SUBAH’ গ্রন্থে। মুর্শিদাবাদ, বিক্রমপুর, ময়মনসিংহ, যশোহর, খুলনা প্রভৃতি অঞ্চলে অনেক চতুষ্পাঠী ছিল। কলকাতার টোল নিয়েও পৃথক আলোচনা হতে পারে।

         ত্রিবেণীর জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন সম্বন্ধে অনেক কাহিনি প্রচলিত আছে। ১৭১৮ সাল থেকে ১৮০৭ পর্যন্ত প্রায় নব্বই বৎসর তিনি তাঁর টোলে পড়িয়েছেন। বিনয় ঘোষ জানিয়েছেন, ‘ত্রিবেণীতে জগন্নাথের টোল ছিল তখন বাংলার অন্যতম সংস্কৃত মহাবিদ্যালয়।’ উইলিয়ম জোন্সের অনুরোধে জীবনের শেষভাগে তিনি লেখেন ‘বিবাদভঙ্গার্ণব’— হিন্দুর ব্যবহারশাস্ত্র।

         বঙ্গ ও বহির্বঙ্গে টোলের ইতিহাস ব্যাপক আলোচনার দাবি রাখে। বাঙালি পণ্ডিতদের অন্যতম গন্তব্য ছিল কাশী। দীনেশচন্দ্র ভট্টাচার্য্য ‘বাঙ্গালীর সারস্বত অবদান : বঙ্গে নব্যন্যায়চর্চ্চা’ বইতে জানিয়েছেন—‘বাঁশবেড়িয়া বিদ্যাসমাজের একজন বিখ্যাত নৈয়ায়িক রামপ্রসাদ তর্কপঞ্চানন কাশীবাসী হইয়াছিলেন।’ এবং ১৭৯১ খ্রিস্টাব্দে কাশীতে সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি প্রথম ন্যায়ের অধ্যাপক পদে ব্রতী হন। আমরা উল্লেখ করতে পারি, হটী বিদ্যালঙ্কারের প্রসঙ্গ, যিনি কাশীতে চতুষ্পাঠী স্থাপন করেছিলেন। রাঢ় অঞ্চলের একজন কুলীন বালবিধবা রূপমঞ্জরীর এই চমকপ্রদ যাত্রা আমাদের মুগ্ধ করে। তিনি চিকিৎসাশাস্ত্রেও পারদর্শী ছিলেন।

         কোচবিহারের মহারাজারা টোলশিক্ষায় উৎসাহ দিতেন। মহারানি বৃন্দেশ্বরী দেবী ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের আগে ‘রাজকুমার, রাজার জ্ঞাতি ও কুটম্বদের জন্য রাজদ্বারে একটি টোল স্থাপন করেন।’   

দেশজ শিক্ষাধারার অবলুপ্তি: ইংরেজ আগমনের পরও অনেকটা সময় দেশজ শিক্ষাধারার সংকট ঘনিয়ে আসেনি। আঠারো শতকের শেষে ইংরেজ তার নিজের স্বার্থে উপনিবেশের শিক্ষাব্যবস্থা ভাবতে থাকে। গ্রান্ট আর মেকলে চেয়েছিলেন ইংরেজি শিক্ষিত অনুগত প্রজা তৈরি করতে। এবং ইংরেজি শিক্ষার প্রচার ও প্রসার সম্ভব হয়েছিল বাংলার নবজাগরণের অগ্রপথিক রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রমুখের সাহায্যে। সে সময়ের নিরিখে তার যৌক্তিকতা ছিল। ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ স্থাপিত হল। সংস্কৃতের পরিবর্তে বাংলা ভাষা প্রাধান্য পেতে শুরু করল। এবং সেখানে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করলেন সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতেরাই। বাঙালির টোল গড়ে উঠেছিল যে আর্থ-সামাজিক কাঠামোর ওপর, তাই যখন আমূল বদলে গেল, খুব স্বাভাবিকভাবেই অবলুপ্তির পথে এগিয়ে চলল এই শিক্ষাব্যবস্থা। শিক্ষার সঙ্গে জীবিকার প্রশ্ন তো রয়েছেই।

         সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘পাদটীকা’ গল্পের পণ্ডিতমশাই চরিত্রটি মনে পড়ে যায় আমাদের। গল্পটির শুরুতেই রয়েছে পালাবদলের চিত্র— “গত শতকের শেষ আর এই শতকের গোড়ার দিকে আমাদের দেশের টোলগুলো মড়ক লেগে প্রায় সম্পূর্ণ উজাড় হয়ে যায়। পাঠান-মোগল আমলে যে দুর্দৈব ঘটেনি ইংরেজ রাজত্বে সেটা প্রায় আমাদেরই চোখের সামনে ঘটল। অর্থনৈতিক চাপে পড়ে দেশের কর্তাব্যক্তিরা ছেলেভাইপোকে টোলে না পাঠিয়ে ইংরেজি ইস্কুলে পাঠাতে আরম্ভ করলেন। চতুর্দিকে ইংরেজি শিক্ষার জয়-জয়কার পড়ে গেল—সেই ডামাডোলে বিস্তর টোল মরল, আর বিস্তর কাব্যতীর্থ-বেদান্তবাগীশ না খেয়ে মারা গেলেন।

         এবং তার চেয়েও হৃদয়বিদারক হল তাঁদের অবস্থা যাঁরা কোনোগতিকে সংস্কৃত বা বাঙলার শিক্ষক হয়ে হাই-স্কুলগুলোতে স্থান পেলেন। এঁদের আপন আপন বিষয়ে অর্থাৎ কাব্য, অলঙ্কার দর্শন ইত্যাদিতে এঁদের পাণ্ডিত্য ছিল অন্যান্য শিক্ষকদের তুলনায় অনেক বেশি কিন্তু সম্মান ও পারিশ্রমিক এঁরা পেতেন সবচেয়ে কম।”৯

         স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ‘চতুষ্পাঠী’ উপন্যাসের ‘স্বভূমিচ্যুত সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত অনঙ্গমোহন’ চরিত্রটি এককথায় অতুলনীয়। দেশভাগ-পরবর্তী সময়পর্বে একজন আদর্শবান মানুষের কী মর্মান্তিক জীবনসংগ্রাম। উপন্যাসের শেষে দেখি তাঁর নাতি বিলুকে বীজগণিত করতে বলছেন ঠাকুরদা, বস্তুবিদ্যা পড়তে বলছেন। আর নিজে বলছেন ‘আমিই বরং চায়ের দোকান করি।’ স্টোভে পাম্প দিতে দিতে অগ্নিতে সমর্পণ করতে চান এতদিনের অর্জিত জ্ঞান, অলংকার— অহংকারও! উপন্যাসের শেষাংশটুকু উদ্ধৃত করলে একইসঙ্গে স্পষ্ট হবে অনঙ্গমোহনের অসহায়তা, অনন্যতাও বইকি—“অনঙ্গমোহন কেটলিতে চাপানো ফুটন্ত জলের দিকে তাকিয়ে বলতেই থাকেন—ওঁ শন্ন আপো ধন্বন্যাঃ শমনঃ সন্তু নূপ্যাঃ হে জল, হে ফুটন্ত জল, হে চায়ের জল, আমাদের মঙ্গল কর। ওঁ আপো হি ষ্ঠা ময়োভূব স্তা ন ঊর্ধ্বে দধাতন… হে জল, চায়ের জল হে, আমাদের অন্নভোগের অধিকারী কর। রমণীয় ব্রহ্মের সঙ্গে সংযুক্ত কর। কারণ অন্নই ব্রহ্ম। আমারে বাঁচাও।”১০ অনঙ্গমোহনের আর্তির সূত্রে আমরা বুঝতে পারি দেশজ শিক্ষাধারার সংকটের স্বরূপ ও প্রভাব।

প্রবহমান ঐতিহ্য:

আজ চতুষ্পাঠীর সে গৌরব আর নেই। কিন্তু কতিপয় সংস্কৃতিমনস্ক মানুষের দৌলতে বহমান রয়েছে ঐতিহ্য।১১ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাতে বদল এসেছে কিছু। ১২ কিন্তু মূল ভাবনা অবিকৃত রয়েছে। এটাই আশার কথা।

বর্তমান যুগে শিক্ষা যখন পণ্য হতে চলেছে, সেইসময় সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে এই ত্যাগের আদর্শ, বিদ্যানুরাগের দৃষ্টান্ত, সরল-পবিত্র-নির্লোভ জীবনাচরণের চিত্র তুলে ধরা জরুরি। আয়োজনে নয়, জ্ঞান অর্জন হয় আন্তরিক আগ্রহে, কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে। ধ্রুপদি মননই পারে ভোগসর্বস্ব জীবন থেকে আমাদের বিকল্প পথের সন্ধান দিতে। মানুষের সার্থক চরিত্র গড়ে ওঠে ধর্মবোধের মধ্য দিয়ে। আধ্যাত্মিকতার বিকাশই পারে সার্থক মানুষ তৈরি করতে। টোলের অনুশাসন ও শিক্ষাপদ্ধতির মধ্যে যে সহৃদয় ও বলিষ্ঠ মানুষ গড়ার যে উপাদান ছিল, আজকের লৌকিক জীবনে তা খুব বেশি করে প্রয়োজন। টোল সংস্কৃতির সঙ্গেই জড়িয়ে আছে পুথির বিষয়টি। সাম্প্রতিক সময়ে আরো বেশি করে পুথিচর্চা করা উচিত। পুথি সংরক্ষণ ও মুদ্রণের ক্ষেত্রে আমাদের এগিয়ে আসতেই হবে। মনে রাখতে হবে, টোল-চতুষ্পাঠী মানে শুধুমাত্র একটি শিক্ষাব্যবস্থা নয়— একটি সংস্কৃতি, স্বতন্ত্র জীবনদর্শন। অক্ষয়চন্দ্র সরকার যথার্থই বলেছিলেন— “টোল বাঙ্গালার অপূর্ব্ব অনুষ্ঠান, এমন গৌরবান্বিত অথচ আড়ম্বররহিত অনুষ্ঠান জগতে আর বুঝি নাই। টোলের সুশৃঙ্খলা, আড়ম্বরশূন্যতা, ও মিতব্যয়িতা, জগতের সকল অজহরকে ধিক্কার দেয় আর বাঙ্গালি ছাত্রগণকে বলে, তোমরা তৃণ পর্ণকুটীরের মর্য্যাদা বুঝ, প্রকাণ্ড প্রস্তর-প্রাসাদ দেখিয়া ঘূর্ণিতমস্তক হইও না।”১৩

পুনশ্চ:

ভারতীয় জ্ঞান পরম্পরার বিকাশের মধ্য দিয়ে আমরা চাই জন্মভূমির গৌরবময় অতীতের পুনরুদ্ধার করতে। অবশ্যই অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং বর্তমান প্রেক্ষিতে স্বীকরণের মধ্যেই রয়েছে  এর প্রায়োগিক সার্থকতা। আমাদের মতে, বাংলার টোলের ইতিহাস ব্যতিরেকে কখনোই বাঙালির সামাজিক ইতিহাস লেখা সম্ভব নয়। একইসঙ্গে টোলকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন আঞ্চলিক ইতিহাসও উঠে আসবে, যা সামগ্রিকভাবে আমাদের ইতিহাসচর্চার পরিধিকে প্রসারিত করবে। বাঙালি আত্মবিস্মৃত জাতি— কথাটি বহুব্যবহৃত হলেও সমান প্রাসঙ্গিক। দেশগঠনের কাজে চতুষ্পাঠীর অধ্যাপক ও শিক্ষার্থীদের মেধাবি সংযোগের বিষয়টি যত উঠে আসবে, তত আমরা ফিরে পাব হারানো আত্মবিশ্বাস। বাঙালির টোল সংস্কৃতি হয়ে উঠতে পারে এক সার্থক আয়না— যার মধ্য দিয়ে খুঁজে পাওয়া যাবে সামূহিক অস্তিত্বের স্বতন্ত্র স্বরগুলিকে।

তথ্যসূত্র

১. অনাথনাথ বসু, ‘আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা’, বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়, কলিকাতা, প্রথম প্রকাশ, আষাঢ় ১৩৫১, পৃ: ৬-৭)

২. শরচ্চন্দ্র শাস্ত্রী, ‘প্রাচীন ভারতের শিক্ষাকেন্দ্র’, ‘‘প্রবাসী’র নির্বাচিত প্রবন্ধ’, সনৎকুমার নস্কর (সংকলন ও ভূমিকা), অরুণা প্রকাশন, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ, জানুয়ারি ২০২১, পৃ: ১৮৭

৩. দীনেশচন্দ্র সেন, ‘বৃহৎ বঙ্গ’, প্রথম খণ্ড, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ষষ্ঠ সংস্করণ, মার্চ ২০২১, পৃ: ৩৪৮

৪. কান্তিচন্দ্র রাঢ়ী কর্ত্তৃক সঙ্কলিত, ‘নবদ্বীপ-মহিমা অর্থাৎ নবদ্বীপের প্রাচীন ও আধুনিক বিবরণ’, দ্বিতীয় সংস্করণ, জিতেন্দ্রিয় দত্ত ও ফণিভূষণ দত্ত (সম্পা.), নবদ্বীপ মহিমা কার্য্যালয় থেকে অমিয়গোপাল দত্ত কর্তৃক প্রকাশিত, ১৩৪৪ সন, পৃ: ৩১৩-৩১৪

৫. ওই, পৃ: ৩৬২-৩৬৩ 

৬. https://www.anandabazar.com/rabibashoriyo/people-then-felt-proud-about-bhatpara-for-it-s-rich-culture-1.1011224

৭. তদেব

৮. বিনয় ঘোষ, ‘পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি’, পুস্তক প্রকাশক, কলিকাতা ১২, প্রথম প্রকাশ, জানুয়ারি ১৯৫০, পৃ: ৪৭৬

৯. সৈয়দ মুজতবা আলী, ‘চাচা কাহিনী’, নিউ এজ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, বিশেষ শোভন সংস্করণ, আষাঢ় ১৪১০, পৃ: ৯৫

১০. স্বপ্নময় চক্রবর্তী, ‘চতুষ্পাঠী’, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, দ্বিতীয় সংস্করণ, এপ্রিল ২০১৭, পৃ: ১৬০

১১. https://eisamay.com/west-bengal-news/asansol-news/-  /articleshow/58220880.cms

১২. https://www.anandabazar.com/west-bengal/sanskrit-schools-are-revamping-the-infrastructure-to-get-into-the-main-flow-of-education-system/cid/1297762

১৩. অক্ষয়চন্দ্র সরকার, ‘সেকালের টোল’, ‘বঙ্গশ্রী’, ১ম বর্ষ ২য় সংখ্যা, ফাল্গুন ১৩৩৯, পৃ: ১২৫

Authored by দেবায়ন চৌধুরী, সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, শহিদ মাতঙ্গিনী হাজরা গভর্নমেন্ট জেনারেল ডিগ্রি কলেজ ফর উইমেন, পূর্ব মেদিনীপুর

Published by,