রবীন্দ্রসঙ্গীত: একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়

From enIKSwiki
Revision as of 11:11, 30 September 2024 by Sriram (talk | contribs)
(diff) ← Older revision | Latest revision (diff) | Newer revision → (diff)
Jump to navigation Jump to search

ভূমিকা

   প্রতিটি জাতির এমন কিছু সাংস্কৃতিক সম্পদ থাকে যার জন্য তারা গর্ববোধ করতে পারে এবং অবশ্যই সেটি তাদের একটি পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়। বাঙালির ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে এমন একটি সাংস্কৃতিক সম্পদ রবীন্দ্রসঙ্গীত, বুৎপত্তিগতভাবে যার অর্থ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃক রচিত এবং সুরারোপিত গান।

রবীন্দ্রনাথের জীবনকালে "রবীন্দ্রসঙ্গীত" শব্দবন্ধটি প্রথম দিকে প্রচলিত না থাকলেও তাঁর সৃষ্টি পরিচিত ছিল "রবি বাবুর গান" বা "রবি ঠাকুরের গান" বলে, রবীন্দ্রনাথের এই স্বকীয় ও মৌলিক সৃষ্টি আজ সর্বত্রগামী। কবি স্বয়ং মৈত্রেয়ী দেবীকে বলেছিলেন, ".. দেখো রবিঠাকুর গান মন্দ লেখে না। একরকম চলনসই তো বলতে হবে। 'চিনিতে পাবে রজনীগন্ধার গন্ধ মিশেছে সমীরে, ধীরে ধীরে', কম গান লিখেছি? হাজার হাজার গান, গানের সমুদ্র, সে দিকটা বিশেষ কেউ লক্ষ্য করে না গো, বাংলাদেশকে গানে ভাসিয়ে দিয়েছি। আমাকে ভুলতে পার, আমার গান ভুলবে কি করে?..." (মংপুতে রবীন্দ্রনাথ। পৃ. ৫০)।

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীত রচনার সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার, বিপুল এই সৃষ্টি সম্ভার যেমন বৈচিত্র্যের তেমনি স্বতন্ত্র! মানবচরিত্রের এমন কোনো মানবিক অনুভূতি নেই যা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের কোনো গান পাওয়া যায় না। তাঁর সম্পর্কে কবি দীনেশ দাশ বলেছেন, "তোমার পায়ের পাতা সবখানে পাতা"। রবীন্দ্রনাথের গান তাই সীমার মাঝে অসীম, কবির শ্রেষ্ঠ দান। গানকে কবি মনে করতেন, তাঁর পরম পাওয়া। মৃত্যুর মাস কয়েক আগে বলেছিলেন-"...আমি তো এত কবিতা লিখলুম, গল্প লিখলুম, ছবিও কম আঁকলুম না; কিন্তু গান গেয়ে যে আনন্দ পেয়েছি সে আর কিছুতে পাইনি। গান সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। গানের সুরে যেন অসীমের সঙ্গে একমুহূর্তে একটা যোগাযোগ ঘটে যায়। এমনটি আর কিছুতে হয় না।” (গুরুদেব-রাণী চন্দ। পৃ. ৭৬)।

পরম্পরা (ঐতিহ্য)

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীত রচনার হাতে খড়ি হয়েছিল জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির সাংস্কৃতিক পরিবেশে। ঘরোয়া মজলিশ, নাটকাভিনয় থেকে শুরু করে ১১ই মাঘের গান প্রভৃতি অনুষঙ্গে রবীন্দ্রনাথ সম্পৃক্ত হয়ে উঠলেন সঙ্গীতের সঙ্গে। তখন শহর কলকাতায় ছিলেন নামজাদা সম ওস্তাদেরা। তাদের ডাক পড়ত ঠাকুর বাড়ির গানের মজলিসে "...রাধিকা গোস্বামী বাঁধা গাইয়ে ছিলেন ধ্রুপদ গাইবার জন্য। ড্রয়িংরুমে ছিল একটা গ্রান্ড পিয়ানো। নতুন জ্যাঠামহাশয় জ্যোতিরিন্দ্রনাথ সেটা রাতদিন বাজাতেন-কখনো পিয়ানো ছেড়ে বেহালা ধরতেন। টুংটাং করে পিয়ানো বাজিয়ে গানের সুর বসানো তাঁর অভ্যাস ছিল। দিদিদের মধ্যে প্রায় সকলেই গান গাইতে পারতেন। ঘরে-বাইরে সঙ্গীতের আবহাওয়া বইত বললে যথেষ্ট বলা হয় না, বাড়ির সকলেই গান বাজনায় পাগল ছিলেন। সবসময়েই বাড়ির আনাচে কানাচে গান বাজনার মধুর আওয়াজ শোনা যেত।” (পিতৃস্মৃতি-রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পৃ. ১৫)। রথীন্দ্রনাথের বিবরণে জানা যায় ছাদের মজলিসে অন্যতম গায়ক ছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। - ঘণ্টার পর ঘণ্টা গেয়ে যেতেন।

"আমাদের সংগীত" নিবন্ধে (জুলাই ১৯২১) রবীন্দ্রনাথ বলছেন- "বাল্যকালে স্বভাবদোষে আমি যথারীতি গান শিখিনি বটে, কিন্তু ভাগ্যক্রমে গানের রসে আমার মন রসিয়ে উঠেছিল। তখন আমাদের বাড়িতে গানের চর্চার বিরাম ছিল না। বিষ্ণু চক্রবর্তী ছিলেন সংগীতের আচার্য, হিন্দুস্থানী সংগীতকলায় তিনি ওস্তাদ ছিলেন। অতএব ছেলেবেলায় যে সব গান সর্বদা আমার শোনা অভ্যাস ছিল, সে শখের দলের গান নয়; তাই আমার মনে কালোয়াতি গানের একটি ঠাট আপনা-আপনি জমে উঠেছিল। রাগরাগিণীর বিশুদ্ধতা সম্বন্ধে অত্যন্ত যাঁরা শুচিবায়ুগ্রস্ত, তাঁদের সঙ্গে আমার তুলনাই হয় না, অর্থাৎ সুরের সূক্ষ্ম খুঁটিনাটি সম্বন্ধে কিছু কিছু ধারণা থাকা সত্বেও আমার মন তার অভ্যাসে বাঁধা পড়েনি-কিন্তু কালোয়াতি সংগীতের রূপ এবং রস সম্বন্ধে একটা সাধারণ সংস্কার ভিতরে ভিতরে আমার মনের মধ্যে পাকা হয়ে উঠেছিল।” (সংগীত চিন্তা। পৃ. ৬৭)।

দেবেন্দ্রনাথের কনিষ্ঠ পুত্রটিকে প্রতিভাময় জ্যোতিষ্কে পরিণত করার অন্তরালে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের অবদান ছিল সবথেকে বেশি। বারবার, জীবনের নানাপর্বে, নানাপ্রসঙ্গে সেকথা স্বীকার করে গেছেন রবীন্দ্রনাথ, বিশেষ করে 'জীবনস্মৃতি'-তে। "সাহিত্যের শিক্ষায়, - ভাবের চর্চায়, বাল্যকাল হইতে জ্যোতিদাদা আমার প্রধান সহায় ছিলেন। ... একসময়ে পিয়ানো বাজাইয়া জ্যোতিদাদা নূতন নূতন সুর তৈরি করায় মাতিয়াছিলেন। প্রত্যহই তাঁহার অঙ্গুলিনৃত্যের সঙ্গে সঙ্গে সুরবর্ষণ হইতে থাকিত। আমি এবং অক্ষয়বাবু তাঁহার সেই সদ্যোজাত সুরগুলিকে কথা দিয়া বাঁধিয়া রাখিবার চেষ্টায় নিযুক্ত ছিলাম। গান বাঁধিবার শিক্ষানবিসি এইরূপে আমার আরম্ভ হইয়াছিল।"

রবীন্দ্র সঙ্গীতের ক্রমবিকাশের তিনটি যুগ সম্পর্কে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য বিশ্লেষণ করেছেন শ্রী শুভ গুহ ঠাকুরতা "রবীন্দ্র সঙ্গীতের ধারা" গ্রন্থে। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী রবীন্দ্রনাথের ৬১ বছরের সমগ্র সঙ্গীত সৃষ্টি পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই যে গঠন বৈচিত্র্যের বিবেচনায় রবীন্দ্র-সঙ্গীতে তিনটি সুস্পষ্ট স্তর বা যুগ প্রবহমান। যদিও রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীত রচনা ১৮৭৭-৭৮ সাল থেকেই আরম্ভ হয়েছে-আমরা ১৮৮১ সাল থেকে তার রচনা আরম্ভ হয়েছে ধরে নেব, কেননা এই সময় থেকেই রবীন্দ্র-সঙ্গীতের একটি ক্রমপর্যায় করা সম্ভব, এর পূর্বেকার রচনা বিক্ষিপ্ত এবং সংখ্যায়ও খুব অল্প।

১৮৮১ থেকে ১৯০০ পর্যন্ত কুড়ি বছর সময়কালকে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীত রচনার প্রথম যুগ বা শিক্ষানবীশ যুগ বলা যায়। এই সময় ঠাকুর পরিবারে হিন্দুস্থানী সঙ্গীতের চর্চা ছিল খুব বেশী। রবীন্দ্রনাথ বাল্যজীবনে বিষ্ণু চক্রবর্তী, শ্রীকণ্ঠ সিংহ, যদু ভট্ট, শ্যামসুন্দর মিশ্র প্রমুখ সে যুগের প্রখ্যাত উচ্চাঙ্গ-সঙ্গীত শিল্পীদের সংস্পর্শে এসেছিলেন তাই সেই পরিবেশের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ বাল্যজীবনে যে সব গান রচনা করেছেন তার অধিকাংশই বিশিষ্ট হিন্দুস্থানী গান, পাশ্চাত্য সঙ্গীত ও অন্যান্য প্রাদেশিক সঙ্গীতের সুর অবলম্বন করে সৃষ্ট হয়েছিল। স্বতন্ত্র ও স্বাধীন রচনা ছিলনা একথা বলা যায়না-সে যুগের গায়ন পদ্ধতির বৈশিষ্ট্যসম্মত যথেষ্ট গানই পাওয়া যায়, তা হলেও তাদের অধিকাংশই বিভিন্ন সংগৃহীত সুর-প্রভাবিত। তাই রবীন্দ্রনাথের এই প্রথম যুগের সঙ্গীত রচনার মধ্যে সুরবিন্যাসের আদর্শই রক্ষিত হয়েছে, এ কথা বললে বোধ হয় ভুল করা হবে না। 'বাল্মীকি-প্রতিভা', 'কালমৃগয়া' ও 'মায়ার খেলা' এই তিনটি গীতিনাট্য এ যুগের বিশেষ উল্লেখযোগ্য রচনা।

১৯০০-১৯২০, এই পরবর্তী কুড়ি বছর হল রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীত রচনার মধ্য যুগ বা পরীক্ষার যুগ। এই সময়কালের রচনার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ রাগরাগিণীর উপাদানগুলি গ্রহণ করলেন মাত্র অর্থাৎ হিন্দুস্থানী সঙ্গীতের কেবল কাঠামোটি বজায় রেখে বাহুল্যকে বর্জন করলেন এই মধ্য যুগের রচনায়, কাব্য যেখানে সুরকে প্রভাবিত করতে শুরু করেছে। হিন্দুস্থানী গান ভেঙ্গে গান রচনার বদলে এই সময় অধিক সংখ্যায় পাওয়া গেল রাগরাগিণীর ভিত্তিতে নিজস্ব রচনাগুলি।

সুরযোজনার ক্ষেত্রে একটা আমূল পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় এই মধ্যযুগের রচনাগুলির মধ্যে। নানা পরীক্ষা চলেছিল এই যুগে এবং রবীন্দ্র সঙ্গীতের যে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য পরবর্তীকালের রচনায় আত্মপ্রকাশ করেছে তার গোড়াপত্তন হয়েছিল এই মধ্যযুগেই। 'গীতাঞ্জলি', 'গীতিমাল্য' ও 'গীতালি'র রাগসম্মত অথচ কাব্যমণ্ডিত বিশিষ্ট ধর্মসঙ্গীত রচনাগুলি পাওয়া গেল এই সময় কালে। রবীন্দ্রনাথের দেশাত্মবোধক অধিকাংশ রচনাগুলি পাওয়া গেল এই মধ্যযুগে যার মধ্যে লোকসঙ্গীতের সুরগুলির ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। ঝম্পক, ষষ্ঠী, রূপকড়া, নবতাল, একাদশী ও নবপঞ্চ এই ছয়টি নূতন তাল সৃষ্টি হয়েছে এই সময়কালে। কবিতায় যে ছন্দ থাকে গানে তার প্রয়োগ সম্ভব কিনা এবং কবিতার পংক্তি অনুযায়ী গানের তাল বিন্যাস করা যায় কিনা তার পরীক্ষা রবীন্দ্রনাথ করলেন এই যুগে, 'দুয়ার মোর পথ পাশে', 'ও দেখা দিয়ে যে চলে গেল', 'ব্যাকুল বকুলের ফুলে', 'কাঁপিছে দেহলতা থরথর', 'যে কাঁদনে হিয়া কাঁদিছে' ইত্যাদি গানুগলির মধ্য দিয়ে। হিন্দুস্থানী গান ভেঙ্গে রবীন্দ্রনাথ যেসব গান রচনা করেছেন তার সময় কাল যদিও ১৯২৫ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত তবু মধ্যযুগেরও পরবর্তীকালের এই ধরণের ভাঙ্গা রচনা সংখ্যায় অল্প ও কালানুযায়ী বিক্ষিপ্ত এবং এই যুগের অন্যান্য ধারার রচনার উপর হিন্দুস্থানী গানের প্রভাব নেই বললেই চলে।

১৯২১ থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত পরবর্তী একুশ বছর হল রবীন্দ্র-সঙ্গীতের শেষ যুগ অর্থাৎ সৃষ্টির যুগ। এই যুগের রচনার মধ্যে আমরা পেলাম রবীন্দ্র- সঙ্গীতের স্বরূপকে, যে সব সঙ্গীত নিজ বৈশিষ্ট্যের দাবীতে নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য সুপ্রিতিষ্ঠিত করেছে, এই স্তরের রচনায় রবীন্দ্রনাথ মাটির প্রতিমার মধ্যে প্রাণ-স্পন্দন করলেন-যে রচনায় ওস্তাদীর চেয়ে অনুভূতিই হলো প্রধান-যে সঙ্গীতে রাগরাগিণী ও কাব্যরসের হলো গঙ্গা-যমুনা সঙ্গম। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন- 

"পরিণত বয়সের গান ভাব বাৎলাবার জন্য নয়, রূপ দেবার জন্য, তৎসংশ্লিষ্ট কাব্যগুলিও অধিকাংশ রূপের বাহন।... সরস্বতীকে শিকল পরানো চলবেনা, সে শিকল তাঁরই নিজের বাণীর তারে তৈরী হলেও নয়।... বাংলাদেশে সঙ্গীতের প্রকৃতিগত বিশেষত্ব হচ্ছে গান, অর্থাৎ বাণী ও সুরে অর্ধনারীশ্বর রূপ।... গায়কেরা সঙ্গীতের যে আসন দেন, আমি সঙ্গীতকে তদপেক্ষা উচ্চ আসন দিই; তাঁহারা সঙ্গীতকে কতগুলি চেতনাহীন জড় সুরের উপর স্থাপন করেন আমি তাহাকে জীবন্ত অমর ভাবের উপর স্থাপন করি, তাঁহারা গানের কথার উপর সুরকে দাঁড় করাইতে চান, আমি গানের কথাগুলিকে সুরের উপর দাঁড় করাইতে চাই। তাঁহারা কথা বসাইয়া যান সুর বাহির করিবার জন্য, আমি সুর বসাইয়া যাই কথা বাহির করিবার জন্য।.....”

রবীন্দ্র-সঙ্গীতের এই শেষ যুগের গানগুলি পরীক্ষা করলে দেখা যাবে যে সেগুলি অন্যান্য সঙ্গীত-পদ্ধতির প্রভাবমুক্ত। এই সময় আমরা পেলাম খুব সহজ সুর আর সিধে তালের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন রাগ মিশ্রণের প্রয়াস। পরিণত বয়সে, নানা পরীক্ষা ও অভিজ্ঞতার শেষে, যে সব সঙ্গীত রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টি করলেন এই শেষ যুগে, তাই হল প্রকৃত বৈশিষ্ট্যসম্মত রবীন্দ্র-সঙ্গীত। নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে ও বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ এই সব গানই ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথে দান। এই সময়কালে রবীন্দ্রনাথের আর একটি বিশেষ কৃতিত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা পাওয়া গেল যার পরিচয় বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে ইতিপূর্ব্বে আর পাওয়া যায়নি। তা হোলো বিভিন্ন নৃত্যনাট্যের মধ্য দিয়ে নৃত্য ও সঙ্গীতের সমন্বয় সাধন, গীতিনাট্য রবীন্দ্রনাথ বাল্যকাল থেকেই রচনা করে এসেছেন এবং রবীন্দ্রনাথের পূর্ব্বেও গীতিনাট্য রচিত হয়েছে। কিন্তু সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে একটি গল্পাংশকে পরিবেশন করে নৃত্যের মাধ্যমে তার যে ব্যঞ্জনা প্রস্ফুটিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের 'চিত্রাঙ্গদা', 'চণ্ডালিকা' ও 'শ্যামা' নৃত্যনাট্যের মধ্যে, বাংলা সঙ্গীতে এরূপ প্রচেষ্টা অভূতপূর্ব্ব ও অভিনব।

দৃষ্টি (দৃষ্টিভঙ্গি)

এবার রবীন্দ্রনাথের গানের পর্যায়বিন্যাসে আসা যাক। রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় প্রকাশিত গীতবিতানের দ্বিতীয় সংস্করণের বিজ্ঞাপনে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন,

"গীত-বিতান যখন প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল তখন সংকলন কর্তারা সত্বরতার তাড়নায় গানগুলির মধ্যে বিষয়ানুক্রমিক শৃঙ্খলা বিধান করতে পারেননি। তাতে কেবল যে ব্যবহারের পক্ষে বিঘ্ন হয়েছিল তা নয়, সাহিত্যের দিক থেকে রসবোধেরও ক্ষতি করেছিল। সেই জন্যে এই সংস্করণে ভাবের অনুষঙ্গ রক্ষা করে গানগুলি সাজানো হয়েছে। এই উপায়ে, সুরের সহযোগিতা না পেলেও, পাঠকেরা গীতিকাব্যরূপে এই গানগুলির অনুসরণ করতে পারবেন।"

রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক সম্পাদিত গীতবিতানের বিষয় বিন্যাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় রবীন্দ্রনাথ তার গানগুলিকে কতগুলি পর্যায়ে বিভক্ত করেছেন সেগুলি হল যথাক্রমে ভূমিকা, পূজা, স্বদেশ, প্রেম, প্রকৃতি, বিচিত্র, আনুষ্ঠানিক ও পরিশিষ্ট।

জীবদ্দশায় ১৩৪৫ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাসে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক সম্পাদিত গীতবিতান প্রথম খন্ডের দ্বিতীয় সংস্করণে শুধুমাত্র ভূমিকা, পূজা এবং স্বদেশ পর্যায়ের গানগুলি অন্তর্ভুক্ত ছিল।

এর মধ্যে ভূমিকার অন্তর্গত গান একটি- "প্রথম যুগের উদয়দিগঙ্গনে"।

পূজা পর্যায়ের গানের সংখ্যা সর্বাধিক ৬১৭টি। পূজা পর্যায়ের গানগুলিকে রবীন্দ্রনাথ পুনরায় ২১টি উপবিভাগে ভাগ করেছেন, সেগুলি হল যথাক্রমে (প্রথম বন্ধনীতে গানের সংখ্যা নির্দেশিত)

গান (৩২), বন্ধু (৫৯), প্রার্থনা (৩৬), বিরহ (৪৭), সাধনা ও সংকল্প (১৭), দুঃখ (৪৯), আশ্বাস (১২), অন্তর্মুখে (৬), আত্মবোধন (৫), জাগরণ (২৬), নিঃসংশয় (১০), সাধক (২), উৎসব (৭), আনন্দ (২৫), বিশ্ব (৩৯) বিবিধ (১৪৩), সুন্দর (৩০), বাউল (১৩), পথ (২৫), শেষ (৩৪), পরিণয় (৯)

স্বদেশ পর্যায়ের গানের সংখ্যা ৪৬টি।

অতঃপর ১৩৪৬ বঙ্গাব্দে ভাদ্র মাসে দ্বিতীয় খন্ডের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় যেখানে রবীন্দ্রনাথের প্রেম, প্রকৃতি, বিচিত্র, ও আনুষ্ঠানিক এই পর্যায়ের গানগুলি প্রকাশিত হয়।

রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক সম্পাদিত এই দ্বিতীয় খন্ডে প্রেম পর্যায়ের গানের সংখ্যা ৩৯৫টি, যার মধ্যে দুটি উপ-বিভাগ রয়েছে, যথা গান (২৭) এবং প্রেমবৈচিত্র্য (৩৬৮)। প্রকৃতি পর্যায়ের সর্বমোট গানের সংখ্যা ২৮৩টি, এটি ৭টি উপ পর্যায়ে বিভক্ত, যথা, সাধারন (৯), গ্রীষ্ম (১৬), বর্ষা (১১৫), শরৎ (৩০), হেমন্ত (৫), শীত (১২), বসন্ত (৯৬)। বিচিত্র পর্যায়ের গানের সংখ্যা ১৩৮ টি।

রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণের পরে শ্রী কানাই সামন্তের সম্পাদনায় ১৩৫৭ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাসে বিষয়ানুক্রমিকভাবে বিন্যস্ত গীতবিতানের তৃতীয় খন্ড প্রকাশিত হয়, এই তৃতীয় খন্ডে রবীন্দ্রনাথের সমুদয় গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্যগুলি, সম্পূর্ণ সংকলন করা হয়েছে, সেগুলি হল যথাক্রমে "কালমৃগয়া", "বাল্মীকিপ্রতিভা", "মায়ার খেলা", "চিত্রাঙ্গদা" "চন্ডালিকা" ও "শ্যামা"। এছাড়াও ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী (২০), নাট্যগীতি (১৩২), জাতীয় সংগীত (১৬), পূজা ও প্রার্থনা (৮৩), আনুষ্ঠানিক সংগীত (১৭), প্রেম ও প্রকৃতি (১০১), পরিশিষ্ঠে নৃত্যনাট্য "মায়ার খেলা" এবং "পরিশোধ" গীতিনাট্যের (সুরারোপিত সংলাপ গুলি ব্যতীত) গানগুলি সহ আরো ১৫টি গান তৃতীয় খন্ডে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

তবে গীতবিতান গ্রন্থের এই বিন্যাস পুরোপুরি কাব্যকেন্দ্রিক, এইভাবে শ্রেণীবিন্যাস হলে রবীন্দ্র সংগীতের সাংগীতিক রূপ ও তার বিভিন্ন বৈচিত্র্য উৎঘাটিত হবে না। রবীন্দ্রনাথের এই বিপুল সংগীত ভান্ডারকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করতে  বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ও শিক্ষক শুভ গুহঠাকুরতা ১৭টি ধারার মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথের সমগ্র সংগীত রচনার শ্রেণীবিন্যাস করেছেন। তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীতকে প্রাথমিকভাবে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। যথা -

১) কতগুলি গান আছে যেগুলি হল গীতধর্মী

২) আর অন্যগুলি হল কাব্যধর্মী

শুভ গুহঠাকুরতা কৃত এই শ্রেণীবিন্যাসের ক্ষেত্রে যে আদর্শ গ্রহণ করা হয়েছে তা হলো এই যে-সংগৃহীত সুরকে কেন্দ্র করে রবীন্দ্রনাথের যে সব রচনা পাওয়া যায় তাদের গীতধর্মী পর্যায়ভুক্ত করা হয়েছে, আর রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব সঙ্গীত সৃষ্টি স্বভাবতই কাব্যকেন্দ্রিক তাই তাদের কাব্যধর্মী বলা হয়েছে। যে সতেরোটি ধারার মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথের সমগ্র সঙ্গীত রচনার শ্রেণীবিন্যাস করা হয়েছে তার মধ্যে,

ধ্রুপদ ও ধামার,

খেয়াল ও ঠুংরী,

টপ্পা,

ভাঙ্গা গান,

লোকসঙ্গীত

নতুন তালের গান

এই ছয়টি গীতধর্মী পর্যায় আছে। গীতধর্মী রচনায় সুরবিন্যাসের আদর্শেই কাব্যাংশকে ব্যবহার করা হয়েছে, এইসব রচনার উৎসস্থল হল হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, বিভিন্ন প্রাদেশিক সঙ্গীত, লোকসঙ্গীত ও পাশ্চাত্য সঙ্গীত থেকে সংগৃহীত সুরগুলি।

রবীন্দ্রনাথ ধ্রুপদ যুগেরই মানুষ ছিলেন তাই তাঁর সঙ্গীত রচনার মধ্যে ধ্রুপদ একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের সমগ্র সঙ্গীত রচনার মধ্যে প্রথম ও মধ্যযুগের গানে ধ্রুপদের প্রভাব খুবই বেশি এবং শেষ যুগের রচনা ধ্রুপদের প্রভাবমুক্ত হলেও, যে অলঙ্করণ নীতি রবীন্দ্র-সঙ্গীতের তন্ত্র্য সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে তা ধ্রুপদ ও টপ্পার সংমিশ্রণে সৃষ্ট। হিন্দিগানের সুর নিয়ে রবীন্দ্রনাথ সর্বসমেত ৭৭টি ধ্রুপদ রচনা করেছেন-তার কয়েকটি হলো

“অসীম আকাশে অগণ্য”

“আইল শান্ত সন্ধ্যা”

“আজি মম মন চাহে”

“আজি হেরি সংসার অমৃতময়”

ধামার যদিও চৌদ্দ মাত্রার একটি তালের নাম, কিন্তু এই তালের ধ্রুবপদ্ধতির সঙ্গীত পরিবেশনে আদর্শগত একটা পার্থক্য আছে, তালের নামানুসারে হলেও, ধামার একটি স্বতন্ত্র ধ্রুবপদ্ধতির সঙ্গীত-রীতি হিসাবে স্বীকৃত হয়েছে, রবীন্দ্রনাথের ধামার রচনার কয়েকটি হল

“অমৃতের সাগরে”

“আজি রাজ-আসনে”

“এত আনন্দধ্বনি উঠিল”

“কে রে ওই ডাকিছে”

“জাগে নাথ জোছনারাতে”

“ডাকিছ কে তুমি”

শাস্ত্রীয় নীতির বিচারে খেয়াল পদ্ধতির গান তান, বিস্তার যোগে পরিবেশন করাই রীতি, কিন্তু একথাটা ঠিক যে রবীন্দ্রনাথের খেয়াল পদ্ধতির রচনায় তান, বিস্তারের কোন স্থান নেই-কবিগুরু নিজেও এরূপ পরিবেশন অনুমোদন করতেন না। এ ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের খেয়াল পদ্ধতির রচনাগুলিকে 'খেয়ালাঙ্গ' বলাই বোধহয় যুক্তিসম্মত! খেয়াল ও ঠুংরী পর্যায়ভুক্ত রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীত রচনার সংখ্যা শতাধিক। এর মধ্যে হিন্দিভাঙ্গা খেয়াল পাওয়া যায় ৭০টি আর ঠুংরী পর্যায়ের দুটি। খেয়াল পর্যায়ের গানে ত্রিতাল, একতাল, ঝাঁপতাল ইত্যাদি তালের এবং ঠুংরী পর্যায়ের গানে কার্ফা, যৎ ইত্যাদি তালের ব্যবহার সমধিক। ঠুংরী পর্যায়ের অলঙ্করণের নীতি রবীন্দ্র-সঙ্গীতের অলঙ্করণ রীতিবিরুদ্ধ তাই এই পর্যায়ের রচনা সংখ্যা খুব কম। খেয়াল পর্যায়ে রবীন্দ্রনাথের অনেক সঙ্গীত রচনা আছে। এই পর্যায়ের কয়েকটি গান হল-

“হিয়া-মাঝে গোপনে হেরিয়া”

“হৃদয়নন্দনবনে”

“হৃদয়মন্দিরে, প্রাণাধীশ”

“হে মন, তাঁরে দেখো”

হিন্দি-ভাঙ্গা ঠুংরী দুটি হল- “খেলার সাথি বিদায়দ্বার খোলো”, “তুমি কিছু দিয়ে যাও”

রবীন্দ্র-সঙ্গীতে টপ্পার একটি বিশেষ স্থান আছে। আজকের দিনে টপ্পার বিশেষ প্রচলন না থাকলেও রবীন্দ্রনাথ যে যুগের মানুষ সেই যুগে টপ্পার বহুল প্রচলন ছিল এবং সেই কারণেই রবীন্দ্রসঙ্গীতে সুর সংযোজনার ক্ষেত্রে টপ্পার প্রভাব খুব বেশি। এই প্রসঙ্গে এটুকু বলা যেতে পারে যে টপ্পা কেবলমাত্র রবীন্দ্র-সঙ্গীতের একটি স্বতন্ত্র ধারা নয়, রবীন্দ্র-সঙ্গীতে প্রবহমান অধিকাংশ ধারার সঙ্গীত পরিবেশনে টপ্পা পদ্ধতির ব্যবহার অনিবার্য্য। রবীন্দ্রনাথের টপ্পা মূল হিন্দিগান অনুযায়ী মধ্যমান, আড়াঠেকা ও তেওড়া তালে রচিত। রবীন্দ্রনাথের হিন্দিভাঙ্গা টপ্পা পদ্ধতির রচনা সংখ্যায় চোদ্দটি তবে তার কাব্যমণ্ডিত বহু গানেই আমরা টপ্পা পদ্ধতির অলঙ্করণের ব্যাপক ব্যবহার দেখতে পাই যাদের টপ্পাঙ্গের গান বলা হয়ে থাকে। নিম্নে হিন্দিভাঙ্গা ও টপ্পাঙ্গের রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব রচনার একটি তালিকা দেওয়া হলো-

হিন্দিভাঙ্গা

“আইল আজি প্রাণসখা”,

“এ কী করুণা, করুণাময়”,

“এ পরবাসে রবে কে হায়”,

“এ মোহ-আবরণ খুলে দাও”,

“কে বসিলে আজি”,

“দিন যায় রে দিন”,

“দুঃখ রাতে, হে নাথ”,

“বন্ধু, রহো রহো সাথে”,

“ব্যাকুল প্রাণ কোথা”,

টপ্পাঙ্গের রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব রচনা

“অনন্ত সাগর মাঝে”

“আজি যে রজনী যায়”

“আরো আঘাত সইবে আমার”

“কখন বসন্ত গেল”

“কিছুই তো হল না”

“পথ চেয়ে যে কেটে গেল”

“শুভদিনে এসেছে দোঁহে”

“সার্থক জনম আমার”

“কী ধ্বনি বাজে”

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীত সৃষ্টির একেবারে প্রথম দিকে লোক-সঙ্গীত রচনা পাওয়া যায় না-যতদূর জানা যায় ১২৯৬ সালের পৌষ মাসে রচিত "বিসর্জন” নাট্যকাব্যের অন্তর্গত বাউল সুরের "আমারে কে নিবি ভাই” এই গানটিই রবীন্দ্রনাথের প্রথম বাউল সুরের রচনা। রবীন্দ্রনাথের গানে লোক-সঙ্গীতের সুরের রচনা সংখ্যায় এত বেশি যে তার সম্পূর্ণ তালিকা এর মধ্যে প্রকাশ করা সম্ভব নয়; কয়েকটি বিশিষ্ট ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ রচনার উল্লেখ করা যেতে পারে-

বাউল সুরের রচনা-

“মেঘের কোলে কোলে”

“হৃদয়ের এ কূল ও কূল”,

“আমি যখন ছিলেম অন্ধ”,

“ডাকব না, ডাকব না”

কীর্তন সুরের রচনা-

“ওহে জীবনবল্লভ” (আঁখরযুক্ত),

“মাঝে মাঝে তব দেখা পাই” (আঁখরযুক্ত),

“প্রভু, আজি তোমার দক্ষিণ হাত”,

“সখী, বহে গেল বেলা”

রামপ্রসাদী সুরের রচনা-

“শ্যামা, এবার ছেড়ে চলেছি মা”

“আমরা মিলেছি আজ”

সারি সুরের রচনা-

“খর বায়ু বয় বেগে”

“এবার তোর মরা গাঙে”

ভাটিয়ালি সুরের রচনা-

“গ্রাম-ছাড়া ঐ রাঙা মাটির পথ”

“তোমার খোলা হাওয়া”

সংগৃহীত সুর থেকে রচিত অর্থাৎ ভাঙ্গা-গানে আমরা পাই হিন্দি ভাঙ্গা ধ্রুপদ, খেয়াল, টপ্পা, তেলেনা, ঠুংরী ও ভজনের সুরে রচিত রবীন্দ্রনাথের বহুসংখ্যক সঙ্গীত রচনা, আর পাওয়া যায় ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রদেশ থেকে সংগৃহীত সুরে রচিত গানগুলি, যন্ত্রসঙ্গীতের গৎ ভেঙ্গে তিনটি গান, পাশ্চাত্য সঙ্গীতের সুরযোজিত বারোটি গান, তিনটি লোকসঙ্গীত ভাঙ্গা গান এবং একটি বাংলা-গানভাঙ্গা রবীন্দ্রসঙ্গীত। এর পরে ভাঙ্গা-গানের একটি তালিকা দেওয়া হলো-এ পর্যন্ত যতদূর জানা যায়, হিন্দুস্থানী গান ভেঙ্গে রবীন্দ্রনাথ সর্বসমেত ১৭৯টি গান রচনা করেছেন- সংখ্যানুযায়ী সেগুলিকে নিম্নোক্তভাবে শ্রেণীবিন্যাস করা যায়-

ধ্রুপদ   ৭৭

খেয়াল   ৭০

টপ্পা   ১৪

লঘুসঙ্গীত   ৮

তেলেনা   ৫

ঠুংরী   ২

ভজন   ২

নূতন তালের গান   ১

রবীন্দ্রনাথের হিন্দিভাঙ্গা ধ্রুপদ, খেয়াল ও ঠুংরী এবং টপ্পা পদ্ধতির হিন্দিভাঙ্গা রচনা সম্বন্ধে পূর্বে উদ্ধৃত করা হয়েছে। অবশিষ্ট গানগুলি নিম্নে উল্লেখ করা হলো-

তেলেনা ভাঙ্গা গান

“ওই পোহাইল তিমির রাতি”

“সুখহীন নিশিদিন পরাধীন”

লঘুসঙ্গীত রচনা

“আয়-লো সজনী, সবে”

“এখনো তারে চোখে দেখি নি”

ভজন

“কী করিলি মোহের ছলনে”

“তোমারি ইচ্ছা হউক পূর্ণ”

গৎভাঙ্গা

“এসো শ্যামল সুন্দর”

“মোর ভাবনারে কী হাওয়ায়”

“কোথা ছিলি সজনী লো”

লোক-সঙ্গীত ভাঙ্গা

“আমার সোনার বাংলা”

“এবার তোর মরা গাঙে”

“যদি তার ডাক শুনে কেউ”

প্রাদেশিক-সুরভাঙ্গা

মহীশূরী

“বিশ্ববীণারবে”

“চিরসখা, মোরে ছেড়ো না”

“এ কী লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ”

“আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে”

গুজরাটী

“নমি নমি, ভারতী”

“যাও রে অনন্তধামে”

কর্ণাটী

“বড়ো আশা করে”

“আজি শুভ দিনে পিতার”

“সকাতরে ওই কাঁদিছে”

পাঞ্জাবী


“বাজে বাজে রম্যবীণা বাজে”

“এ হরিসুন্দর”

“গগনের থালে রবি চন্দ্র”

মাদ্রাজী

“বাজে করুণ সুরে”

“বাসন্তী, হে ভুবনমোহিনী”

“নীলাঞ্জন ছায়া”

“বেদনা কী ভাষায় রে”

পাশ্চাত্য-সঙ্গীত ভাঙ্গা

“আহা, আজি এ বসন্তে”

“ওহে দয়াময়”

“কতবার ভেবেছিনু”

“কালী কালী বলো রে আজ”

“তবে আয় সবে আয়”

“তুই আয় রে কাছে আয়”

বাংলা-গান ভাঙ্গা

নিম্নোক্ত গানটি একটি বাংলা গান ভেঙ্গে রচিত হয়েছে-

“বেঁধেছ প্রেমের পাশে/চাঁচর চিকুর আধো”

এ ছাড়া

ধর্মসঙ্গীত,

প্রেমসঙ্গীত

ঋতুসঙ্গীত,

কাব্যসঙ্গীত,

উদ্দীপকসঙ্গীত,

হাস্যরসাত্মকসঙ্গীত,

দেশাত্মবোধকসঙ্গীত,

শিশুসঙ্গীত,

ভানুসিংহের পদাবলী,

আনুষ্ঠানিক সঙ্গীত

বেদগান

এই অবশিষ্ট এগারোটি হলো কাব্যধর্মী পর্যায়। পর্য্যায়গুলির নামকরণের মধ্যেই এর সাঙ্গীতিক ও কাব্যিক প্রাধান্য অনুধাবন করা যাবে।

রবীন্দ্রনাথের ধর্মসঙ্গীত রচনার সংখ্যা প্রায় সাড়ে ছয় শত এবং সংখ্যার বিচারে এই ধারার সঙ্গীত রচনা সর্বাধিক, অবশ্য এর মধ্যে গীতধর্মী উচ্চাঙ্গ ভাঙ্গা-গানও রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর সঙ্গীত রচনার সমগ্র একষট্টি বছর ধরেই ধর্মসঙ্গীত রচনা করেছেন, এমনকি এই একষট্টি বছরের পূর্বেও-অত্যন্ত বাল্যবয়সেও, ধর্মসঙ্গীত রচনা করেছে। বস্তুতঃ, রবীন্দ্র-সঙ্গীতের নানাবিধ বৈচিত্র্যও এই ধর্ম-সঙ্গীতের মধ্যেই পাওয়া যায়। ধ্রুপদ, খেয়াল, টপ্পা ইত্যাদি উচ্চাঙ্গ-সঙ্গীতের সুরের রচনা যেমন আছে ধর্মসঙ্গীতে, তেমনি পাওয়া যায় লোকসঙ্গীত ও পুরোপুরি রাবীন্দ্রিক ধরণের নানা লঘু-রচনা। রবীন্দ্রনাথ সৃষ্ট নতুন তালের অধিকাংশ সঙ্গীত রচনাই এই পর্যায়ভুক্ত।

মহর্ষির উষ্ণ সান্নিধ্যে এক আত্মিক পরিমন্ডলে রবীন্দ্রমানসের স্ফূর্তি ঘটেছে। তাই তাঁর সমগ্র কাব্যে তথা জীবন সাধনায় প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে পড়েছে সুস্পষ্ট আধ্যাত্মিক প্রভাব। কবির স্বীকৃতি-

"আবাল্য উপনিষদ আবৃত্তি করতে করতে আমার মন বিশ্বব্যাপী পরিপূর্ণতাকে অন্তর দৃষ্টিতে মানতে অভ্যাস করেছে।"

রবীন্দ্রনাথের এই আধ্যাত্মিক উপলব্ধির প্রতিফলন হয়েছে তাঁর সাহিত্যকর্মে, বিশেষ করে সংগীতে। কারণ সংগীতের সুরে, ছন্দে, ভাবে হয়তো তাঁর আধ্যাত্মিক চেতনার স্ফূর্তি ঘটত সমধিক।

"রবীন্দ্রনাথ গান রচনা করেছেন তার কাব্য-প্রতিভার আলোকে এবং সেই আলোকস্নিগ্ধজাত অধ্যাত্ম-অনুভূতির অমৃতধারায়।” (সংগীতে রবীন্দ্র প্রতিভার দান-স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ, পৃঃ ২১০)

গীতাঞ্জলি, গীতিমাল্য, গীতালিতে কবির এই আধ্যাত্মিক অনুভব প্রাধান্য পেয়েছে। মরমিয়া বাউল সাধকের মত রবীন্দ্রনাথের মধ্যেও দেখা যায় আধ্যাত্মিক অনুভূতির গভীরতা। ভারতীয় অধ্যাত্ম সাধানার শাশ্বত সত্য রবীন্দ্রনাথের অন্তরচেতনায় সমুদ্ভাসিত। অবিদ্যার আবরণ অপসারিত হয়ে কবির জ্ঞানচক্ষু উম্মিলিত হয়েছে-সত্যদ্রষ্টা ঋষি রবীন্দ্রনাথ ভারত-আত্মার চিরন্তন সত্যের তথা ভারতের ঋষির আধ্যাত্মিক ধ্যান ধারণার ধারক ও বাহক এবং তাঁর পরিণত আধ্যাত্মিক চিন্তা তথা নিবিড় অনুভূতির সাক্ষর রয়েছে তাঁর সমগ্র সাহিত্য কর্মে, বিশেষ করে সংগীত সৃষ্টিতে।

প্রেমসঙ্গীত, ধর্মসঙ্গীতের মতোই এমন একটি ধারা, যার রচনাকাল একেবারে আদি যুগ থেকে শেষকাল পর্যন্ত বিস্তৃত, তাই এর হয়েও আমরা রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীত রচনায় প্রবহমান তিনটি যুগের বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করতে পারি। সংখ্যানুপাতে এই ধারার স্থান দ্বিতীয়, ধর্মসঙ্গীতের পরেই। রবীন্দ্রনাথ প্রায় সাড়ে চারশত কাব্যধর্মী প্রেমসঙ্গীত রচনা করেছেন, অবশ্য এর মধ্যে অল্পসংখ্যক উচ্চাঙ্গ ভাঙ্গা-গান আছে এবং ঋতুকালীন প্রেমসঙ্গীতও সংখ্যা শতাধিক। লক্ষ্য করা যায় যে রবীন্দ্রনাথের প্রথম যুগের 'মায়ার খেলা' এবং সর্বশেষ নাট্য রচনা 'শ্যামা' প্রেমবিষয়ক।

রবীন্দ্রনাথের ঋতু-সঙ্গীত স্বভাবতঃই কাব্যধর্মী, এই কারণে দেখা যায় যে, তাঁর ঋতু-সম্বন্ধীয় সঙ্গীত-রচনার অধিকাংশই শেষের দিককার। সুর সংযোজনার ক্ষেত্রে দেখা যায় যে রবীন্দ্রনাথের ঋতু-সঙ্গীত বিভিন্ন পদ্ধতির সুরে সমৃদ্ধ। উচ্চাঙ্গ পদ্ধতির খেয়াল, ধ্রুপদ ইত্যাদির সুরে রচিত গান অল্পসংখ্যক পাওয়া যায় ঋতু-সঙ্গীতে, কিন্তু মিশ্ররাগের লঘু-ছন্দের গানেরই প্রাধান্য। রবীন্দ্রনাথ প্রায় তিনশ' ঋতু-সঙ্গীত রচনা করেছেন, সংখ্যার বিচারে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীত রচনায় ঋতু-সঙ্গীতের স্থান তৃতীয়।

রবীন্দ্রনাথের দেশাত্মবোধক-সঙ্গীত রচনার সংখ্যা বাষট্টিটি। রবীন্দ্রনাথের সমগ্র দেশাত্মবোধক-সঙ্গীত রচনা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে সুর সংযোজনার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ এই ধারার গানে লোকসঙ্গীতের সুর, বিশেষ করে বাউলের সুর যথেষ্টভাবে ব্যবহার করেছেন, ১৩১২ সালের বঙ্গ-ভঙ্গ আন্দোলনের সময়ই রবীন্দ্রনাথ অধিক সংখ্যক স্বদেশী-সঙ্গীত রচনা করেন, বঙ্গ-ভঙ্গ আন্দোলনের সময় থেকে গান্ধীজি প্রবর্তিত অসহযোগ অন্দোলন পর্য্যন্ত অর্থাৎ ১৩২৮ সাল পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের যে সব স্বদেশী-সঙ্গীত পাওয়া যায় তার মধ্যে 'বাংলার মাটি বাংলার জল', 'এবার তোর মরা গাঙ্গে', 'যদি তোর ডাক শুনে কেউ', 'বিধির বাঁধন কাটবে তুমি' ইত্যাদি গানুগলি সমধিক প্রসিদ্ধ

শান্তিনিকেতনে আশ্রমিক জীবনের নানা অনুষ্ঠানে উপযোগী বহু সঙ্গীত রবীন্দ্রনাথ রচনা করেছেন। আনুষ্ঠানিক সঙ্গীত রবীন্দ্র-সঙ্গীতের একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ধারা- জন্ম, বিবাহ, মৃত্যু, বর্ষশেষ, নববর্ষ, বৃক্ষরোপণ, হলকর্ষণ, গৃহপ্রবেশ, শিল্পোৎসব ইত্যাদি নানা আশ্রমিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় সঙ্গীত রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীত রচনায় স্থান পেয়েছে। উপরোক্ত অনুষ্ঠান ছাড়াও শান্তিনিকেতন আশ্রমের কয়েকটি বার্ষিক অনুষ্ঠানের জন্য বিশেষভাবে রচিত কয়েকটি গান আমরা পাই-দোলযাত্রার দিনে শান্তিনিকেতন বসন্তোৎসবে নৃত্যগীত সহযোগে একটা শোভাযাত্রার জন্য রচিত হয়েছে- 'ওরে গৃহবাসী, খোল দ্বার খোল, লাগলো যে দোল' গানটি। শরৎ-ঋতু আহ্বানের জন্য ১লা আশ্বিন গীত হয়- 'আমার নয়ন ভুলানো এলে' গানটি। বসন্ত ঋতুর বন্দনার জন্য ১লা ফাল্গুন গাওয়া হয় 'আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে' অথবা 'আজি দখিন দুয়ার খোলা'

কবি ‘ভানুসিংহ’ এই ছদ্মনামে রবীন্দ্রনাথ বৈষ্ণব পদাবলীর অনুকরণে যে সব রচনা করেছিলেন, সেগুলি তাঁর প্রাচীনতম রচনার অন্তর্গত। মৈথিলী ও ব্রজবুলি ভাষায় রচিত এই সব পদের অধিকাংশই রচিত হয়েছে ১৮৭৭ থেকে ১৮৮৪ সালের মধ্যে অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের ষোলো থেকে পঁচিশ বছর বয়সকালের মধ্যে। অন্যান্য পদাবলী-সাহিত্যের ন্যায় এই সব রচনাও কৃষ্ণ-রাধা প্রেম বিষয়ক এবং আঙ্গিক ও সুরযোজনার স্বাতন্ত্র্যের বিচারে রবীন্দ্রনাথের এই সব পদ-রচনা তাঁর সঙ্গীত সৃষ্টির অন্যতম বিশিষ্ট সম্পদ। এই সব পদ-রচনা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ 'জীবন-স্মৃতি'তে লিখেছেন-

“গাছের বীজের মধ্যে যে-অঙ্কুর প্রচ্ছন্ন ও মাটির নীচে যে-রহস্য অনাবিষ্কৃত তাহার প্রতি যেমন একটি একান্ত কৌতূহল বোধ করিতাম, প্রাচীন পদকর্তাদের রচনা সম্বন্ধেও আমার ঠিক সেই ভাবটা ছিল।"

ভানুসিংহের পদাবলীর প্রথম রচনার সময় কাল বাংলা ১২৮৪ সনের বর্ষাকালে, ইংরাজী ১৮৭৭ সালে। 'গহন কুসুম কুঞ্জ মাঝে' এইটিই এই পর্যায়ের প্রথম রচনা এবং এর পর ক্রমান্বয়ে একুশটি পদ রচিত হয়। আমরা দেখতে পাই যে রবীন্দ্রনাথের অনেক রচনাই প্রথমত কবিতা হিসাবেই রচিত হয়েছে-পরে সুর দিয়ে তাদের গানের দলে আনা হয়েছে। এই বাইশটি পদরচনার মধ্যে গান হিসাবে মাত্র নটি এখন পাওয়া যায়- অন্যগুলিতে যদি কোনোদিন সুর যোজনা হয়েও থাকে, তবে তা সেগুলি এখন হারিয়ে যাবারই মতন।

রবীন্দ্রনাথের সমগ্র সঙ্গীত-রচনা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে ভারতীয় সঙ্গীতে ব্যবহৃত প্রায় সব তালই রবীন্দ্রনাথের তাঁর গানে ব্যবহার করেছেন শাস্ত্রসম্মত ভাবেই, এমন কি অনেক কূট তালের প্রয়োগও পাওয়া যায় রবীন্দ্রসঙ্গীতে। তালে বাঁধা নয় এমন গান রবীন্দ্র-সঙ্গীতে খুব কমই আছে। দাদরা, তেওড়া, রূপক, কাহারবা, ঝাঁপতাল, সুরফাঁকতাল, একতাল, চতুর্মাত্রিক, আড়-খেমটা, চৌতাল, আড়া-চৌতাল, ধামার, যৎ, পঞ্চম সোয়ারি, ত্রিতাল, আড়াঠেকা, মধ্যমান প্রভৃতি প্রচলিত ভারতীয় তালগুলিতে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীত রচনা আছে। ভারতীয় সঙ্গীত ক্ষেত্রে ব্যবহৃত তাল ছাড়াও ছয়টি নূতন তাল রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টি করেছেন, তার প্রয়োজন হয়েছিল এই কাব্যাংশকে মর্য্যাদা দিতেই-নিছক নতুন সৃষ্টির নেশায় নয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে গানকে যথাসম্ভব শাস্ত্রসম্মত করতে গিয়ে, প্রচলিত তালে বাঁধতে গিয়ে, বাণীর অঙ্গহানি হয়েছে, উচ্চারণ-বিকৃতি ঘটেছে। নতুন ছয়টি তাল সৃষ্টি করে রবীন্দ্রনাথ এই সব অসুবিধা দূর করতেই চেষ্টা করেছেন একথা তিনি নিজেও বহুভাবে বহুবার বলেছেন। গানের কাব্যাংশকে মর্য্যাদা দিতে হলে, ছন্দের গতি এমন করতে হবে যাতে সুর সংযোজনার পরে কাব্যাংশ ক্ষুণ্ণ না হয়। সঙ্গীতের গতি সাবলীল রাখবার জন্য এবং কাব্যাংশকে মর্য্যাদা দেবার অনুপ্রেরণায় তিনি নিত্য নূতন পথের সন্ধান করেছেন, নতুন তাল কয়টির সৃষ্টির উৎসস্থল হলো সেই একই প্রেরণা। মধ্য যুগেই রবীন্দ্রনাথ-সৃষ্ট নূতন তালের অধিকাংশ গানগুলি রচিত হয়েছে। এইখানে এই ছয়টি নতুন তালে রচিত কয়েকটি গানের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা দেওয়া হলো-

ঝম্পক-৫ মাত্রা (মাত্রাবিভাগ-৩ + ২)

“আমারে যদি জাগালে আজি, নাথ”

ষষ্ঠী-৬ মাত্রা (মাত্রাবিভাগ-২ + ৪)

(এই তালের সহিত দক্ষিণ ভারতীয় 'পত্তি' ও 'রূপক' তালের সাদৃশ্য আছে)

“নিদ্রাহারা রাতের এ গান”

রূপকড়া-৮ মাত্রা (মাত্রাবিভাগ-৩+২+৩)

(এই তালের সহিত দক্ষিণ ভারতীয় 'সারি' তালের সাদৃশ্য আছে)

“গভীর রজনী নামিল হৃদয়ে”,

নবতাল-৯ মাত্রা (মাত্রাবিভাগ-৩+২+২+২)

“নিবিড় ঘন আঁধারে”,

একাদশী-১১ মাত্রা (মাত্রাবিভাগ-৩+২+২+২+৪)

“দুয়ারে দাও মোরে রাখিয়া”,

নবপঞ্চ-১৮ মাত্রা (মাত্রাবিভাগ-২+৪+৪+৪+৪)

“জননী, তোমার করুণ চরণখানি”

তালের ক্ষেত্রে যেমন লক্ষ্য করা গেছে ঠিক তেমনি রাগরাগিণীর ক্ষেত্রেও আমরা দেখি যে ভারতীয় উচ্চাঙ্গ-সঙ্গীতে প্রচলিত প্রায় সব রাগরাগিণীর গানই রবীন্দ্র সঙ্গীতে আছে, এমনকী বহু কূট রাগের সুর নিয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীত রচনাস সংখ্যাও বিরল নয়। লক্ষ্য করা যায় যে মধ্য যুগের মধ্যকাল অর্থাৎ ১৯০৯/১০ সাল পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ রাগসম্মত সঙ্গীত রচনা করেছেন, যদিও প্রথম যুগেই এই ধরণের সঙ্গীত-রচনার সংখ্যা বেশি এবং তার মধ্যে হিন্দি, ভাঙ্গারই সংখ্যাধিক্য। 'গীতাঞ্জলি', 'গীতিমাল্য' ও 'গীতালি'ও অন্তর্ভুক্ত অধিকাংশ গানই রাগরাগিণীর উপাদান নিয়ে রচিত কিন্তু তাঁদের বাঁধুনী ঠিক উচ্চাঙ্গ নয়। বস্তুতঃ রবীন্দ্রনাথ রাগরাগিণীর এমন একটি সহজ অথচ মধুর রূপ এনেছেন তাঁর গানে, যার জন্য সামান্য সাঙ্গীতিক জ্ঞান-সম্পন্ন মানুষও সেটা বুঝতে পারবে। ক্ষণে ক্ষণে রাগচ্যুত হয়তো তিনি হয়েছেন কিন্তু সেগুলি তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষারই দৃষ্টান্ত। ১৯০৯/১০ সাল পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের রাগসম্মত রচনার বিশ্লেষণ করলে নিম্নলিখিত রাগরাগিণী ব্যবহারের মোটামুটি একটি পরিচয় পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ 'বেহাগ-সিদ্ধ' ও 'ভৈরবী-সিদ্ধ' বলে অভিহিত হয়ে থাকেন- নিম্নোক্ত তালিকা থেকে সংখ্যার বিচারে রবীন্দ্রনাথের প্রিয় রাগরাগিণীর একটা অনুমান করা সম্ভব। দশটির কম গান রচিত হয়েছে এমন রাগরাগিণীর উল্লেখ করা হয়নি-

ভৈরবী-৪৭

বেহাগ-৪২

বাহার-২৪

মিশ্র বাহার-৪

কাফি-১৮

ইমন কল্যাণ-১৮

মিশ্র ইমন কল্যাণ-৩

ঝিঁঝিট-১৭

মিশ্র ঝিঁঝিট-১

খাম্বাজ-১৬

টোড়ি-১৫

মিশ্র টোড়ি-১১

সিন্ধু-১৪

মিশ্র সিন্ধু-১১

ভৈরোঁ-১৪

মিশ্র ভৈরোঁ-২

হাম্বীর-১৪

কানাড়া-১৩

মিশ্র কানাড়া-৪

রামকেলি-১৩

মিশ্র রামকেলি-৩

পিলু-১২

মিশ্র পিলু-২

ভূপালী-১২

মিশ্র ভূপালী-২

বিভাস-১২

মিশ্র বিভাস-২

দেশ-১১

মিশ্র দেশ-৩

ছায়ানট-১০

মিশ্র ছায়ানট-৩

আলাইয়া-১০

পূরবী-১০

মিশ্র পূরবী-২

আশাবরী-১০

বাল্যকাল থেকেই রবীন্দ্রনাথ গীতিনাট্য রচনায় চেষ্টিত হয়েছিলেন, যে প্রচেষ্টার উৎসাহ এসেছিল পারিবারিক আবহাওয়ার মধ্য থেকে। ১৮৮১ ও ১৮৮২ সালে রবীন্দ্রনাথ রচনা করলেন 'বাল্মীকি-প্রতিভা' ও 'কাল-মৃগয়া' গীতিনাট্য, 'বাল্মীকি-প্রতিভা' ও 'কাল-মৃগয়া' রচনা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন- "বাল্মীকি-প্রতিভা ও কাল-মৃগয়া যে উৎসাহে লিখিয়াছিলাম সে উৎসাহে আর কিছু রচনা করি নাই। ওই দুটি গ্রন্থে আমাদের সেই সময়কার একটা সঙ্গীতের উত্তেজনা প্রকাশ পাইয়াছে।” 'বাল্মীকি-প্রতিভা' ও 'কাল-মৃগয়া' এই দুইটি নাটকের পরিবেশন পদ্ধতির মধ্যে পাশ্চাত্য প্রভাব বেশ খানিকটা রয়েছে। পরিবেশন-পদ্ধতির কথা উল্লেখ এই জন্য যে এই দুটি নাটকের অধিকাংশ গানই দেশীয় রাগ-রাগিণীতে রচিত, কিন্তু গাইবার পদ্ধতিতে একটা পাশ্চাত্য নীতি অনুসরণ করা হয়েছিল। কয়েক বছর পরে ১৮৮৮ সালে "মায়ার-খেলা" গীতিনাট্যে আমরা এই পরিবেশনে কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করি। এই তিনটি গীতিনাটাই "অপেরা" শ্রেণীর এবং পাশ্চাত্য "অপেরা" গুলির সঙ্গে এদের একটা মূলগত সাদৃশ্যই রয়েছে, অথচ এগুলির অধিকাংশ গানই ভারতীয় রাগ-রাগিণী অবলম্বনে রচিত। 'বাল্মীকি প্রতিভা' নাটকটিকে কবি বলেছেন "ইহা সুরে নাটিকা", 'মায়ার খেলা' নাটকটির প্রসঙ্গে আবার তিনি বলেছেন- "বাল্মীকি প্রতিভা যেমন গানের সূত্রে নাট্যের, মায়ার খেলা তেমনই নাট্যের সূত্রে গানের মালা। ঘটনাস্রোতের পরে তাহার নির্ভর নহে, হৃদয়াবেগই তাহার প্রধান উপকরণ।"

'শাপমোচন', 'চিত্রাঙ্গদা', 'চণ্ডালিকা' ও 'শ্যামা' এই চারটি নৃত্যনাট্যই রবীন্দ্রনাথের শেষ বয়সের রচনা, তাই এগুলির মধ্যে গীতিনাট্যের গানের সুরের মতো পাশ্চাত্য প্রভাব পাওয়া যায় না। এই চারটি নাটককে নৃত্যনাট্য বলা হয়ে থাকে, তার প্রধান কারণ হোলো যে এই কয়টি নাটকের সঙ্গীতাংশ নৃত্যের বাঁধাধরা ছন্দের ভিত্তিতে রচিত। 'শাপমোচন' দিয়েই নৃত্যনাট্যের সূচনা হয়, যদিও 'শাপমোচন' পূর্ব রচিত বিভিন্ন গানের সংকলনের মধ্য দিয়ে একটি নাট্যরূপের প্রচেষ্টা-'চিত্রাঙ্গদা', 'চণ্ডালিকা' ও 'শ্যামা'র ন্যায় এটি একেবারে নূতন রচনা নয়। দেখা যায় যে, রবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্যগুলি রবীন্দ্রনাথের-হয় একেবারে প্রথম জীবনে, নয়ত একেবারে শেষের দিকে রচনা, এর ফলে এই সব নাটকে গানগুলির মধ্যে আমরা দুইটি যুগের গায়ন পদ্ধতি ও সুরযোজনার আদর্শের পরিচয় পাই। অন্যান্য ধারার মতো গীতিনাট্যের গানেও আমরা সে যুগের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী বহু হিন্দী-ভাঙ্গা ও পাশ্চাত্য সুরের গানের সমাবেশ দেখতে পাই, যার সাদৃশ্য একেবারেই নেই নৃত্যনাট্যের গানগুলিতে, যেগুলি সমসাময়িক অন্যান্য ধারার মতো অধিকাংশই মিশ্র- রাগের ছন্দপ্রধান রচনা।

লৌকিক প্রয়োজন (আধুনিক প্রাসঙ্গিকতা)

রবীন্দ্রনাথ কেবল গীতিকার বা সুরকার নন, তিনি সঙ্গীতস্রষ্টা। রবীন্দ্রসঙ্গীত কাব্য ও সুরের মধুর মিলনের অনন্য দৃষ্টান্ত। "স্থায়ী", "অন্তরা", "সঞ্চারী" এবং "আভোগ" - এই চারটি রূপবন্ধের ক্রমিক সমন্বয়ে যে একটি গান সম্পূর্ণ হয়ে উঠে তা তিনি সম্যক উপলব্ধি করেছিলেন। তার এই উপলব্ধি সর্বভারতীয় সঙ্গীত ঐতিহ্যেরই প্রতিফলন। সাহিত্য ও সঙ্গীতে রবীন্দ্রনাথ আমাদের যে সম্পদ দিয়ে গেছেন তার বিনিময়ে আমরা কতটুক কর্তব্য সম্পাদক করেছি-একথা ভেবে দেখবার সময় হয়েছে। রবীন্দ্র-সঙ্গীতের বর্তমান বহুলপ্রসারের মধ্যে সঙ্গীত পরিবেশনে যে সব অসঙ্গতি লক্ষ্য করা যায়, অজ্ঞতাই হলো তার প্রধান কারণ। সমালোচনা বা নিন্দাবাদ করে কর্তব্য সম্পাদনের চেষ্টা না করে এই সমস্যার সমাধানের কথা ভাবাই শ্রেয়। সঙ্গীত-শিলী ও শ্রোতা উভয়েরই নিজ নিজ দায়িত্ব আছে। শিল্পীদের রবীন্দ্রনাথের গানকে অধিকতর শ্রদ্ধা নিয়ে গ্রহণ করতে হবে, বৈশিষ্ট্যসম্মত সঙ্গীত-পরিবেশনের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের অন্তর্নিহিত মাধুর্য্য প্রচার করতে হবে, আর যথাযথ জ্ঞানসঞ্চয়ন করে সঙ্গীত-রসিকদের এই মাধুর্য্য সম্পর্কে সজাগ হতে হবে।

রবীন্দ্র জীবৎকালে ১৯০৫ থেকে ১৯০৮ সালের মধ্যে হেমেন্দ্রমোহন বসু বা এইচ বসুর সিলিন্ডার রেকর্ডে রবীন্দ্রনাথের স্বকণ্ঠে ১৪ টি গান রেকর্ড করা হয়েছিল। পরে হেমেন্দ্রমোহন বসু ফ্রান্সের প্যাথে কোম্পানির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ডিস্ক রেকর্ডের প্রচলন করেন। ১৯০৮ থেকে ১৯১২ সালের মধ্যে প্যাথে-এইচ বোসেজ রেকর্ড থেকে প্রকাশিত হয় ৪ জন শিল্পীর কণ্ঠে ৬ টি রেকর্ড। ১৯১৫ সালের মধ্যে এক পিঠের নিকোল রেকর্ড, বেকা-গ্রান্ড রেকর্ড, অডিওন রেকর্ড ও গ্রামাফোন কোম্পানি থেকে বলাইদাস শীল, পূর্ণকুমারী, অমলা দাশ, কৃষ্ণভামিনী, ব্রজেন্দ্রলাল গাঙ্গুলী, সরলা বাই প্রমুখ প্রায় ২০জন শিল্পীর গাওয়া রবীন্দ্রসংগীত রেকর্ড করা হয়েছিল। ১৯১৬ থেকে ১৯২৫ সালের মধ্যে গ্রামোফোন ও ভিয়েলোফোন রেকর্ড থেকে বিভিন্ন শিল্পীর গাওয়া অসংখ্য রেকর্ড প্রকাশিত হয়। সবচেয়ে বেশি রেকর্ড করেছেন হরেন্দ্রনাথ দত্ত (১৬ টি)।

১৯২৬ থেকে ১৯৩৫ এবং ১৯৩৬ থেকে ১৯৪১ সালের মধ্যে গ্রামোফোন রেকর্ড (এইচ.এম.ভি ও কলম্বিয়া), হিন্দুস্থান রেকর্ড থেকে প্রকাশিত হয় নানা শিল্পীর গাওয়া অসংখ্য রবীন্দ্রসংগীত। ১৯৩৬ থেকে ১৯৪১ সাল পর্বে বিশেষ শিল্পীগোষ্ঠী হিসাবে রবীন্দ্রসংগীত-শিল্পীদের আত্মপ্রকাশ ঘটে রবীন্দ্রপরিমণ্ডল-ভুক্ত অমলা দাশ, অমিতা ঠাকুর, কণিকা মুখোপাধ্যায়, অমিয়া ঠাকুর, সাহানা দেবী, মালতী দেবী, শান্তিদেব ঘোষ, দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ শিল্পীদের মাধ্যমে। এইচ বসুর সিলিন্ডার রেকর্ডের ২০ বছর পরে ১৯২৬-১৯৩৫ সালে হিন্দুস্থান রেকর্ড এবং গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে রবীন্দ্রনাথের রেকর্ড করা ১৭টি গান প্রকাশিত হয়েছিল। এর ১২ টি গানই রেকর্ডে প্রথম গাওয়া।

বাংলা চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রয়োগ শুরু হয় ১৯৩৭ সালে। ওই বছর নিউ থিয়েটার্স প্রাইভেট লিমিটেড প্রযোজিত ও প্রমথেশ বড়ুয়া পরিচালিত মুক্তি চলচ্চিত্রে প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীত ব্যবহার করা হয়। এই ছবির সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী পঙ্কজ কুমার মল্লিক। এরপর সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, গৌতম ঘোষ,অপর্ণা সেন, ঋতুপর্ণ ঘোষ প্রমুখ আন্তর্জাতিক-খ্যাতিসম্পন্ন পরিচালকগণ তাদের ছবিতে সার্থকভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রয়োগ করেছেন। মূলধারার বহু জনপ্রিয় চলচ্চিত্রেও জনপ্রিয় রবীন্দ্রসঙ্গীতগুলি ব্যবহার করা হয়।

রবীন্দ্রনাথের গান যে নিঃসন্দেহে বাঙালি তথা সমগ্র ভারতবাসীর অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পদ তাতে কোনো দ্বিধা নেই। রবীন্দ্র সংগীতের অন্তর্নিহিত মাধুর্য ও নিজস্ব বৈশিষ্ট্য প্রচার করে একে প্রকৃত মর্যাদার আসনে সুপ্রতিষ্ঠা করাই হলো আমাদের কর্তব্য। নিজস্ব বৈশিষ্ট্য যদি রক্ষিত না হলো তাহলে এই সম্পদের স্থায়িত্বের স্থিরতা রক্ষা সম্ভব নয়, এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের উক্তি স্মরণ করে প্রবন্ধের সমাপন করি- 

“আমার গান যাতে আমার গান ব'লে মনে হয় এইটি তোমরা কোরো। আরো হাজারো গান হয়তো আছে-- তাদের মাটি করে দাও-না, আমার দুঃখ নেই। কিন্তু তোমাদের কাছে আমার মিনতি-- তোমাদের গান যেন আমার গানের কাছাকাছি হয়, যেন শুনে আমিও আমার গান বলে চিনতে পারি। এখন এমন হয় যে, আমার গান শুনে নিজের গান কিনা বুঝতে পারি না। মনে হয় কথাটা যেন আমার, সুরটা যেন নয়। নিজে রচনা করলুম, পরের মুখে নষ্ট হচ্ছে, এ যেন অসহ্য। মেয়েকে অপাত্রে দিলে যেমন সব-কিছু সইতে হয়, এও যেন আমার পক্ষে সেই রকম।

তোমার কাছে সানুনয় অনুরোধ-- এঁদের একটু দরদ দিয়ে, একটু রস দিয়ে গান শিখিয়ো-- এইটেই আমার গানের বিশেষত্ব। তার উপরে তোমরা যদি স্টিম রোলার চালিয়ে দাও, আমার গান চেপ্টা হয়ে যাবে। আমার গানে যাতে একটু রস থাকে, তান থাকে, দরদ থাকে ও মীড় থাকে, তার চেষ্টা তুমি কোরো।”

তথ্যসূত্র

গীতবিতান, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,বিশ্বভারতী

জীবনস্মৃতি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,বিশ্বভারতী

সংগীত চিন্তা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,বিশ্বভারতী

রবীন্দ্র সঙ্গীতের ধারা, শুভ গুহঠাকুরতা

গীতবিতান তথ্যভাণ্ডার, পূর্ণেন্দু বিকাশ সরকার, সিগনেট প্রেস


Authored by রাজনাথ দাস, রামকৃষ্ণ মিশন বিবেকানন্দ শতবার্ষিকী মহাবিদ্যালয়, রহড়া (প্রাক্তনী)

Published by,