শৈব দর্শন ও সম্প্রদায় : মূলরূপের অতিসংক্ষিপ্ত রূপরেখা

From enIKSwiki
Revision as of 12:12, 27 September 2024 by Sriram (talk | contribs) (Created page with " '''ভূমিকা :''' ভারতবর্ষ আধ্যাত্মিকতার দেশ। ধর্মাচরণ, আধ্যাত্মিকতা, অতিলৌকিকতার চর্চা এখানে চিরকালীন। মহাবিশ্ব, অস্তিত্ব ও চেতনার রহস্য জানার আগ্রহ দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তার...")
(diff) ← Older revision | Latest revision (diff) | Newer revision → (diff)
Jump to navigation Jump to search

ভূমিকা :

ভারতবর্ষ আধ্যাত্মিকতার দেশ। ধর্মাচরণ, আধ্যাত্মিকতা, অতিলৌকিকতার চর্চা এখানে চিরকালীন। মহাবিশ্ব, অস্তিত্ব ও চেতনার রহস্য জানার আগ্রহ দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তার ধারায় বিজ্ঞান ও ধর্ম – দুটিই সমান্তরালভাবে অগ্রসর হয়েছে। বলা বাহুল্য, সামাজিক সংহতি-মূল্যবোধ, শিল্প-বিজ্ঞান-কারিগরীবিদ্যার চরম উৎকর্ষ যে সুপ্রাচীন কাল থেকেই এদেশের সভ্যতায় বর্তমান ছিল, সেসবের ভিত্তিই ছিল ধর্ম-অধর্মের ধারণা।

মানবের চতুর্বিধ পুরুষার্থের জন্য ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ বিধায়ক শাস্ত্র বর্তমান। মোক্ষশাস্ত্র হল দর্শনগুলি। বৈদিক ও তান্ত্রিক শ্রুতিসমূহের উপর ভিত্তি করেই প্রধান ধর্মসম্প্রদায়গুলি এবং তাদের দর্শন বিকশিত হয়েছে। বৈদিক ষড়দর্শন, যথা – সাংখ্য, যোগ, ন্যায়, বৈশেষিক, পূর্বমীমাংসা ও বেদান্ত- প্রত্যেকটির প্রস্থান, সূত্রগ্রন্থ, প্রকরণগ্রন্থ ইত্যাদির ভিন্ন দৃষ্টিতে ব্যাখ্যারীতির ফলে যেমন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়েছে, তেমনই তান্ত্রিক ষড়দর্শন গড়ে উঠেছে যথা – শৈব, শাক্ত, গাণপত্য, স্কান্দ, সৌর ও বৈষ্ণব। বৈদিক দর্শনগুলি মূলত যুক্তি-তর্ক ও তত্ত্ববিচারপ্রধান, অপরদিকে তান্ত্রিক দর্শনগুলিতে তত্ত্ব-বাদাদি থাকলেও এগুলি সাধনা ও অপরোক্ষানুভূতির উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করে। বেদ ও আগম ভিত্তিক দর্শনশাস্ত্রকে শিথিলভাবে যথাক্রমে তত্ত্বীয় ও প্রায়োগিক শাস্ত্র বলা যেতে পারে। প্রাগ্বৈদিক-বৈদিক-অবৈদিক প্রভৃতি ধর্মগোষ্ঠীর বিকাশ ও বিবর্তন দিয়ে মূল আলোচনায় প্রবেশ করার বা বিস্তৃত আলোচনার পরিসর এখানে নেই, তাই অতিসংক্ষেপে বিষয়ের প্রাথমিক পরিচয় নেব আমরা।

শৈবধর্ম :

হরপ্পা সভ্যতার প্রত্নক্ষেত্রে প্রাপ্ত লিঙ্গ বা পশুপতি সিল যেমন প্রাগ্বৈদিক সমাজে শিবোপাসনার সাক্ষ্য দেয়, যজুর্বেদীয় মহানারায়ণ উপনিষদ, রুদ্র-চমকপ্রশ্ন, ঋগ্বেদ খিল অংশের শিবসংকল্প সূক্ত আদি তেমন বজ্র-ধনু-শূলপাণি বৈদিক রুদ্রের উপাসনার সাক্ষী, তেমনই আবার তামিল সঙ্গমসাহিত্যে শিবের পর্যায়বাচক শব্দের অগণিত উল্লেখ দ্রাবিড়ভূমিতে শৈব ধারার প্রতিপত্তির পরিচয় দেয়। অতএব এটা নিঃসন্দেহ যে শৈবধর্ম ভারতবর্ষের প্রাচীনতম ধর্মগুলির মধ্যে পরিগণিত। কিন্তু শুধু দেবমহিমা দ্বারা সংগঠিত সম্প্রদায় চলতে পারেনা। তার জন্য প্রয়োজন সুসংহত সৃষ্টিতত্ত্ব, অধিবিদ্যা ও জ্ঞানতত্ত্ব সমৃদ্ধ দর্শন এবং আদর্শ, চর্য্যা ও ধার্মিক ক্রিয়া দ্বারা শৃঙ্খলিত জীবন।

ক্রমে পরমেশ্বর শিবের উপাসকগণ পৃথক পৃথক সম্প্রদায় গঠন করে ও সাথে সাথে তাদের দর্শনও বিকশিত হতে থাকে। মহাভাষ্যকার পতঞ্জলি তাঁর গ্রন্থে ভস্মধারী ব্রাহ্মণ ও শিবভাগবত গোষ্ঠীর উল্লেখ করেছেন। কালের ধারায় সম্প্রদায়গুলির অনেকে অবলুপ্ত হয়েছে, কেউ বা অন্য সম্প্রদায়ে মিশে গেছে, আবার কেউ বিবর্তিত হয়েছে, জন্ম নিয়েছে নতুন অনেকে। আমরা এখানে সেসব ইতিহাস এবং মিশ্র (দশনামী, স্মার্ত, পৌরাণিক, কাপালিক-সোম-বাম, নাথ, যোগী, অবধূত প্রভৃতি) ও উপসম্প্রদায়ের সূক্ষ্ম বিচার বর্জন করে প্রধান কয়েকটি শৈবগোষ্ঠীর সংক্ষিপ্ত পরিচয় গ্রহণ করব।

পাশুপত ও লকুলীশ-পাশুপত দর্শন :

প্রাগ্বৈদিক পাশুপতাগমনির্ভর দ্বৈতবাদী পাশুপত দর্শন খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম থেকে খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতকে পশ্চিম ভারতে বিকশিত হয়ে সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে পরে। পরম্পরাগত মান্যতা অনুযায়ী পশুপতি শিব এই মতের আদি প্রবক্তা এবং লকুলীশ কলিযুগের প্রথম গুরু। কথিত আছে, শিব অষ্টবিংশ যুগে শ্বেতাদি অষ্টবিংশ যোগাচার্য্যের অবতার গ্রহণ করে চার শিষ্যকে পাশুপতযোগ শিক্ষা দেন। বিক্ষিপ্ত পাশুপত মতকে প্রথম সংগঠিত করেন আচার্য্য লকুলীশ (নকুলীশ) এবং তাঁর দ্বারা পাশুপতমতের শাস্ত্রভিত্তির পরিবর্তন ও আচারগত কিছু অপরিহার্য্য সংস্কার সাধিত হয় যা এই মতে দ্বৈতাদ্বৈতবাদের স্পর্শ দেয়। বর্তমানে লকুলীশপূর্ব পাশুপত দর্শনের কিছুমাত্র অবশিষ্ট না থাকায় লকুলীশ-পাশুপত মতকেই পাশুপত বলা হয়। পাশুপত দর্শন পঞ্চার্থ দর্শন নামেও পরিচিত।

এই মতে আলোচ্য পদার্থ পাঁচটি – কারণ, কার্য্য, যোগ, বিধি এবং দুঃখান্ত। কারণপদার্থ হলেন পতি, অর্থাৎ শিব। তিনি স্বশক্তির মধ্যে বিদ্যা-কলা-পশু নামক কার্য্য অর্থাৎ বিশ্বের উৎপাদক-অনুগ্রাহক-তিরোভাবক এবং স্বশক্তি দ্বারাই এর মধ্যে অবস্থানকারী। সিদ্ধেশ্বর অর্থাৎ জীবন্মুক্ত পুরুষ বাদে সকল চেতন জীব পশু আর পশুর চেতনা বা সম্বিৎ-এর উৎস হল বিদ্যা। পঞ্চভূত, পঞ্চতন্মাত্র, দশেন্দ্রিয় ও অন্তঃকরণচতুষ্টয় কলা নামে পরিচিত। চিত্তবৃত্তি প্রত্যাহার করে মহেশ্বরের ধারণার মাধ্যমে আত্মা ও ঈশ্বরের সংযোগকেই যোগ বলা হয়। চর্য্যা বা বিধি দু’প্রকার – ব্রত ও দ্বার। ভস্মধারণ, ভস্মশয্যায় শয়ন ও হসিত-নৃত্য-গীত-হুডুক্কার-প্রণাম-জপাত্মক উপহার, এই তিন হল ব্রত আর ক্রাথন-স্পন্দন-মন্দন-শৃঙ্গারণ-অবিতৎকরণ-অবিতদ্ভাষণ, এইগুলি হল দ্বার। সমাজনিন্দিত আচরণ করে পাশুপত সাধক সম্মানাদি বন্ধন ত্যাগ করবেন এবং অনন্যচিত্ত হয়ে যোগ ও চর্য্যা অভ্যাস করলে মুক্তিলাভ করবেন। মুক্তি দুই প্রকার – রুদ্রসাযুজ্যে দুঃখের ঐকান্তিক ও আত্যন্তিক নিবৃত্তিরূপ দুঃখান্ত, এবং পঞ্চবিধ দৃকশক্তি ও ত্রিবিধ ক্রিয়াশক্তির অধিকাররূপ পারমৈশ্বর্য্য লাভ।

পাশুপতদের অল্প গ্রন্থই উপলব্ধ হয় যার মধ্যে প্রধানগুলি হল লকুলীশকৃত পাশুপতসুত্রম্‌, তার উপর কৌণ্ডিণ্যকৃত পঞ্চার্থভাষ্য, ভাসর্বজ্ঞকৃত গণকারিকা রত্নটীকা, শিবপুরাণ বায়বীয় সংহিতা ইত্যাদি। সর্বদর্শনসংগ্রহ, শঙ্করদিগ্বিজয় প্রভৃতি গ্রন্থ থেকে পাশুপতদের বিষয়ে জানা যায়।

শৈবসিদ্ধান্ত :

এই আগমনির্ভর দ্বৈত শৈবদর্শন প্রধানত দুটি উৎসজাত— সংস্কৃত ও তামিল। পণ্ডিতদের মতে এই দুই ধারা যথাক্রমে কাশ্মীর ও তামিলনাড়ুতে উদ্ভূত হয়ে সমান্তরালভাবে সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে পড়ে ও কালবিপর্যয়ে শুধু তামিলপ্রদেশে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। সংস্কৃত ধারায় অমরদক, মত্তময়ুর ও মধুমতেয় নামক তিনটি সম্প্রদায় বর্তমান ছিল, তামিল ধারায় নন্দীনাথ, শিবসমবাদ, মূলবর্গ, বালবর্গ ইত্যাদি অবান্তর ভেদ ছিল, এগুলি পরে একীভূত হয়।

পরম্পরাগত মান্যতা অনুযায়ী ভগবান সদাশিব এই মতের আদি প্রবর্তক ও অগস্ত্য কলিযুগের প্রথম প্রচারক। ষষ্ঠ থেকে ষোড়শ শতকের মধ্যে সংস্কৃত ধারায় সদ্যোজ্যোতি, রামকণ্ঠ, নারায়ণকন্ঠ, অমরদক, সোমশম্ভু, ঈশানশিব, ত্রিলোচনশিব, ভোজদেব, শ্রীকুমার, অঘোরশিব, নিগমজ্ঞানদেশিক প্রমুখ আগমবিদ্ আচার্য্য আবির্ভূত হন। তামিল ধারায় মেয়ক্কণ্ড, অরুলনন্দী শিবাচার্য, মর‌ৈজ্ঞানসম্বন্ধ ও উমাপতি শিবাচার্য – এই চার শাস্ত্রজ্ঞ আচার্য্য একত্রে সন্তানাচার্য্য হিসেবে এবং তিরুজ্ঞানসম্বন্ধ, তিরুনবুক্করসর, সুন্দরমূর্তি ও মাণিক্যবাচক – এই চার ভক্ত আচার্য্য সময়াচার্য্য বা নালবার হিসেবে খ্যাত। চার সময়াচার্য্য সহ ৬৩ জন শৈবসন্তকে নয়নার বলা হয়। নয়নারদের রচিত ভক্তিমূলক পদগুলি নম্বি-অণ্ডর-নম্বি তিরুমুরৈ নামে বারোটি গ্রন্থে সংকলিত করেন এবং সেক্কিলার তাঁদের জীবনী তিরুত্তোণ্ডর (পেরিয়) পুরাণ নামে লিপিবদ্ধ করেন। এনারা ছাড়াও বহু তামিলদেশীয় শৈবসন্ত ও সিদ্ধগণ এই সম্প্রদায়ে বিশেষভাবে মান্য।

শৈবসিদ্ধান্ত মতে পতি-পশু-পাশ এই তিন অনাদী তত্ত্ব স্বীকৃত। পতি অর্থাৎ ঈশ্বর সর্বজ্ঞ-সর্বকর্তা-সর্বব্যাপী ও স্বতন্ত্র‌; পশু অর্থাৎ পাশবদ্ধ জীব অল্পজ্ঞ-সামান্যকর্তা-সীমিত ও পরতন্ত্র। অষ্টপাশে বদ্ধ হয়ে মায়ীয়-কার্ম-‌আণব – এই তিনপ্রকার মলযুক্ত জীবাত্মা জন্মমৃত্যূর চক্রে ভ্রমণ করে। মলগুলি পরস্পর দুরীভূত হলে জীব সকল থেকে প্রলয়াকল ও বিজ্ঞানাকল হয় এবং ফলশ্রুতিতে শিব প্রদত্ত মন্ত্রেশ্বর-মন্ত্রমহেশ্বর প্রভৃতি পদ লাভ করে। এছাড়া ঐকান্তিক মুক্তির চারটি পথ বিবৃত হয়েছে, যথা – দাস্যভাবে চর্য্যা, সন্তানভাবে ক্রিয়া, সখ্যভাবে যোগ ও আত্মভাবে জ্ঞান; এবং এগুলি যথাক্রমে সালোক্য, সামীপ্য, সারূপ্য ও সাযুজ্য নামক ক্রমমুক্তি প্রদান করে। শিবের অনুগ্রহেই পশুর অন্তরে মুক্তিবাসনা জাগে; এখানে শিবের সগুণ দিকটি বিশেষ আদৃত – তিনি সাধকহিতার্থে বিভিন্ন মূর্তি পরিগ্রহ করেন। সৈদ্ধান্তিক মতে মুক্তিতে জীব ‌অখণ্ড শিবানন্দ প্রাপ্ত করে থাকে, যদিও তার আত্মানুভূতি বিনষ্ট হয়না। প্রথমদিকে শৈবসিদ্ধান্তে কিছু অদ্বৈতপর ব্যাখ্যা থাকলেও অঘোরশিব সেসব বর্জন করে তীব্র দ্বৈতবাদী মত প্রতিষ্ঠা করেন ও সংস্কৃত-তামিল মার্গের মিলন ঘটান।

দশ শিবভেদ আগম সহ অষ্টবিংশতি শৈবাগম ও তাদের উপাগমগুলি, কতিপয় আগমের ভাষ্য, তত্ত্বপ্রকাশাদি অষ্টপ্রকরণ ও তট্টীকাসমূহ, ক্রিয়াকর্মদ্যোতিনী আদি আগমভিত্তিক পদ্ধতিগ্রন্থাবলী, পেরিয়-কন্দ-তিরুবিলয়দল পুরাণত্রয়, বহু স্থলপুরাণ, তেবারম্-তিরুবসগম্-তিরুমন্তিরম্ সহ দ্বাদশ তিরুমুরৈ, শিবজ্ঞানবোধ আদি চতুর্দশ সিদ্ধান্তশাস্ত্র এবং তামিল ও সংস্কৃতে রচিত অসংখ্য ধর্মগ্রন্থ শৈবসিদ্ধান্তের শাস্ত্রীয় ভিত্তি।

বীরশৈব দর্শন :

বেদ ও বীরশৈব আগমভিত্তিক এই দ্বৈতাদ্বৈত শৈবদর্শন খ্রিষ্টীয় একাদশ শতক থেকে প্রধানত উত্তর কর্ণাটক ও সংলগ্ন তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রের কিছু অঞ্চলে ব্যাপ্তি লাভ করে। কিছুজনের মতে পূর্বতন কালামুখ গোষ্ঠীর ধারাতেই বীরশৈবদের মূল উদ্ভব হয়েছিল।

এই সম্প্রদায়ে প্রধান তিনটি উপসম্প্রদায়ের অস্তিত্ব আছে – বীরশৈব, আরাধ্য ও লিঙ্গায়ৎ। এদের প্রত্যেকেই মস্তক, কণ্ঠ অথবা বাহুতে লিঙ্গধারণ করেন যাকে আত্মলিঙ্গ বলা হয়।এছাড়া এদের প্রত্যেকের উপাস্য ক্ষুদ্রাকৃতি লিঙ্গ থাকে, যা ইষ্টলিঙ্গ নামে পরিচিত।

বীরশৈবগণ পঞ্চাচার্য্য পরম্পরার অনুসারী। পরম্পরাগত মান্যতা অনুযায়ী পঞ্চবক্ত্র শিব এর আদি প্রবক্তা এবং পঞ্চমুখোদ্ভব পঞ্চাচার্য্য এই সম্প্রদায়ের প্রাথমিক গুরু। রেবণসিদ্ধ-মরুলসিদ্ধ-একোরাম-পণ্ডিতারাধ্য-বিশ্বারাধ্য, অযোনিসম্ভব এই পঞ্চাচার্য্য সোমেশ্বরাদি পাঁচটি স্বয়ম্ভূ লিঙ্গ থেকে চারযুগে পৃথক নাম ধারণপূর্বক আবির্ভূত হয়ে বীরশৈবধর্ম প্রচার করেন। বলা হয় ত্রেতাযুগে রেণুকাচার্য্য অগস্ত্যমুনিকে ষট্স্থল, একোত্তরশতস্থল, অষ্টাবরণ ও পঞ্চাচার দর্শনের জ্ঞান দান করেন, যা সিদ্ধান্তশিখামণি নামে গ্রথিত হয়। গুরু-লিঙ্গ-জঙ্গম বীরশৈব ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। এরা বৈদিক বর্ণভেদ না মানলেও এদের নিজস্ব ষট্‌বর্ণব্যবস্থা বিদ্যমান। সিদ্ধান্তশিখামণি, বেদ, শৈববেদান্ত, শ্রীকরভাষ্য, বীরশৈবাগম (সিদ্ধান্তাগম হতে অনেকাংশে ভিন্ন), লিঙ্গধারণচন্দ্রিকা, অনুভবসূত্রম্ প্রভৃতি গ্রন্থ বীরশৈব সম্প্রদায়ের ভিত্তি।

আরাধ্য সম্প্রদায় একটি তেলুগু ব্রাহ্মণ গোষ্ঠী, যারা বীরশৈব দর্শন-‌আচার মান্য করেন, কিন্তু বেদ-‌আগমকে সমান জ্ঞান করেন ও কর্মকাণ্ডের উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করেন। এই ধারায় ‘দ্বাদ‌শ আরাধ্য’ নামে পরিচিত বারোজন আচার্য্য প্রধান মান্য। পালকুরিকি সোমনাথ রচিত বসব পুরাণ, মহাকবি ধূর্জ্জটির কালহস্তী শতকম্ ইত্যাদি গ্রন্থ এদের কাছে আদৃত।

একাদশ শতকে বসবন্না কর্তৃক সংগঠিত ধর্মসম্প্রদায় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা লিঙ্গায়ৎরা বেদমূলকত্ব, বর্ণাশ্রম, বহুদেববাদ প্রভৃতি হিন্দু প্রথার ঘোর বিরোধী এবং তারা কণ্ঠধৃত আত্মলিঙ্গ ভিন্ন কারোর পুজা করেননা। লিঙ্গায়ৎ দর্শনে পুনর্জন্মবাদ, প্রারব্ধভোগ ইত্যাদি অস্বীকৃত। তাদের মতে লিঙ্গের মধ্যেই চরাচর অবস্থিত ও তা লিঙ্গেই লীন হয়, লিঙ্গ প্রাণস্বরূপ। লিঙ্গাঙ্গ ঐক্য‍ই মুক্তি। লিঙ্গায়ৎরা বেদাগম বর্জন করে বসবন্না, চেন্নবসবন্না, অক্কা মহাদেবী, অল্লম্মপ্রভু প্রমুখ ‘শরণ’ বা ভক্ত সন্তদের দ্বারা কন্নড় ভাষায় মৌখিকভাবে রচিত ‘বচন’শাস্ত্র অনুসরণ করেন।

শৈববিশিষ্টাদ্বৈতবাদ :

বেদান্ত ও আগমনির্ভর এই বিশিষ্টাদ্বৈত শৈবদর্শন একাদশ শতকে আচার্য্য শ্রীকণ্ঠ কর্তৃক প্রচারিত হয়। পরম্পরাগত মান্যতা অনুযায়ী নীললোহিত শিব এই মতের আদি প্রবক্তা। পরবর্তীকালে হরদত্তাচার্য্য, সর্বতন্ত্রস্বতন্ত্র্য অপ্পয় দীক্ষিত প্রমুখ এই মতের পরিপোষণ করেন।

শ্রীকণ্ঠাচার্য্য ব্রহ্মসূত্রের উপর তাঁর রচিত নীললোহিত ভাষ্য বা ব্রহ্মমীমাংসা ভাষ্যে শৈববিশিষ্টাদ্বৈতবাদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শ্রীকণ্ঠাচার্য্যের মতে জীব-শিবের সম্পর্ক অঙ্গ-অঙ্গীর ন্যায় এবং শক্তি-শিবের সম্পর্ক ধর্ম-ধর্মীর ন্যায়। তাঁর মতে অদ্বিতীয় শিবতত্ত্ব কদাপি নির্বিশেষ নন, তিনি সবিশেষ ও জ্ঞানবৈরাগ্যাদি দশটি গুণ সর্বদাই তাঁতে বর্তমান। তিনি চিৎশক্তি দ্বারা সাক্ষাদ্ভাবে ভবাদি অষ্টমূর্তি ধারণকরতঃ জগৎরূপে পরিণত হলেও স্বতঃ প্রপঞ্চাতীত। শিব জগতের অভিন্ননিমিত্তোপাদানকারণ। পঞ্চব্রহ্ম ও দেবাদিশরীরে বর্তমান থাকলেও তিনি নামরূপাদি দোষ দ্বারা অস্পৃষ্ট। যেরূপ সমুদ্র ও জলকণা, পরমেশ্বর ও জীবের সম্বন্ধ‌ও তদ্রূপ; ঈশ্বরের অপরিসীম গুণ জীবে কিঞ্চিৎ পরিমাণে উপস্থিত থাকে। জীব ও শিবাখ্য পরব্রহ্ম ভিন্ন হলেও ‘শিবোঽহম্’রূপ শিবাভেদভাবনা দ্বারা পশুভাব নিবৃত্ত হলে সগুণব্রহ্মরূপ শিবত্বপ্রাপ্তি হয়, এটিই মুক্তি। এই মতে ক্রমমুক্তি ও দেবলোকাদি স্বীকৃত। জ্ঞানকর্মসমুচ্চয় মুক্তির পথ। নিষিদ্ধ ও কাম্য বর্জিত শ্রুতিস্মৃতিবিহিত স্বাশ্রমকর্মানুষ্ঠান, বেদাগম সিদ্ধান্তের অধ্যয়ন ও তাৎপর্য্যনির্ণয়, এবং শম-দম-‌অষ্টাঙ্গযোগ-শ্রবণ-মনন-নিত্যানিত্যবস্তুবিবেক আদি সাধনসকল মোক্ষলাভের সহায়ক। গৃহস্থ ও সন্ন্যাসী —উভয়ের পক্ষেই পাশুপতব্রত ও শিবধর্মপালন একান্ত প্রয়োজনীয়।

বেদের রূদ্রপর অংশ, প্রধান একাদশ উপনিষদ, শৈব উপনিষদসমূহ, শৈব আগমশাস্ত্র, ব্রহ্মসূত্রের শ্রীকণ্ঠভাষ্য, তার উপর সপ্তদশ শতকে অপ্পয় দীক্ষিতকৃত ‘শিবার্কমণিদীপিকা’ ও ঊনবিংশ শতকে নাগলিঙ্গ শাস্ত্রীকৃত ‘শিবচিন্তামণিপ্রভা’ নাম্নী টীকাদ্বয়, নীলকণ্ঠ শিবাচার্য্যের ক্রিয়াসার, অপ্পয় দীক্ষিত ও হরদত্তাচার্য্য রচিত বহু শিবপরত্ব স্থাপনাকারী প্রকরণ ও বাদগ্রন্থ ইত্যাদি শৈববিশিষ্টাদ্বৈত মতানুসারীদের নিকট মান্য।

রসেশ্বর দর্শন :

রসায়নশাস্ত্রভিত্তিক এই অদ্বৈত শৈবদর্শনের প্রবর্তকের নাম জানা যায়না, পরম্পরাগত মান্যতা অনুযায়ী আদিনাথ শিব এই মার্গের আদিগুরু।

মাধবাচার্য্যের ‘সর্বদর্শনসংগ্রহ’-এ এই শিবোপাসকদের কথা আছে যারা পরমেশ্বর-তাদাত্ম্যবাদী, অর্থাৎ জীবে-শিবে অভেদ মান্যকারী। এই মতে বিদেহমুক্তি স্বীকৃত নয়, প্রত্যক্ষলব্ধ জীবন্মুক্তিই একমাত্র অভীষ্ট। জীবন্মুক্তির জন্য দেহস্থৈর্য্য অপরিহার্য এবং দেহস্থৈর্য্য-বিধানের ‌উপায় হলো পারদাদি নামে পরিচিত রস। রস ও শিব অভিন্ন, রস শিবস্বরূপ। জীব এই রসস্বরূপকে লাভ করে আনন্দিত হয়। পারদ সংসার পার করায় বলে একে পারদ বলে। দেহ অনিত্য, কিন্তু মুক্তি হয় জ্ঞানে আর জ্ঞানসাধনের সহায় হলো স্থির দেহ বা দিব্যদেহ। ষট্‌কৌশিক দেহ বিনশ্বর তাই অসুরক্ষিত, তাই হরগৌরীসৃষ্টিজাতদেহ অর্থাৎ পারদ ও অভ্রের সংযোগ দ্বারা শোধিত দেহ, যা দিব্যদেহ বলে পরিচিত, তা সুরক্ষিত হয়। পারদকে বলা হয় শিববীর্য্য বা শিববীজ এবং অভ্র হল দেবীবীজ। দিব্যদেহ লক্ষ্য নয়, উপলক্ষ্য; যা লাভের পর‌ও শাস্ত্রনির্দিষ্ট উপায়ে যোগাভ্যাস করতে হয় যাতে ভ্রূমধ্যে চিন্ময় পরতত্ত্বের দর্শন হয়, সাধক মুক্তিলাভ করেন। কাজেই এ হল মুখ্যত যোগসাধনা। এছাড়া এতে ভেষজ উদ্ভিদ বিষয়ক জ্ঞান, গন্ধক-কর্পূরাদি দ্রব্যজ্ঞান, লৌহ-স্বর্ণ-রৌপ্য-বর্ণক-রূপকাদি বিষয়ক ধাতুবিজ্ঞান প্রভৃতিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

বৌদ্ধ ও শাক্তদের মধ্যেও রসসাধনের প্রমাণ পাওয়া যায়। মান্যতা আছে— সিদ্ধ নাগার্জুন, শঙ্করাচার্য্যের পরমগুরু গৌড়পাদ প্রমুখ রসায়নবিদ্ সাধক ছিলেন। এই সম্প্রদায়ের রসসঙ্কেত কলিকা, বাগভট্ট সংহিতা, আনন্দকাণ্ড, রসহৃদয়, কক্ষপুট, রসার্ণব ইত্যাদি গ্রন্থ উপলব্ধ হয় এবং রসরত্নাকর, রসেন্দ্রমঙ্গল আদি বহু গ্রন্থের নাম পাওয়া যায়।

নন্দিকেশ্বর শৈবদর্শন :

এই বৈয়াকরণ অদ্বৈত শৈবদর্শন নন্দীকেশ্বর কর্তৃক প্রবর্তিত হয়েছিল। পরম্পরাগত মান্যতা অনুযায়ী নটরাজ শিব এই মতের আদিগুরু।

কথিত আছে— পাণিনি, পতঞ্জলি, ব্যাঘ্রপাদ প্রমুখ শিবভক্ত ঋষিগণ কৈলাসে মহাদেবের সৃষ্টিতাণ্ডব দর্শনের আকাঙ্খা প্রকাশ করলে শিব নটেশ্বরমূর্তিতে সেই আকাঙ্খা পূর্ণ করেন। নৃত্যান্তে তাঁর ডমরুনিনাদ হতে সংস্কৃত ব্যাকরণের মূল চতুর্দশ মাহেশ্বরসূত্র নির্গত হয়। তাঁরা এই সূত্রগুলির তাৎপর্য্য উপলব্ধি করতে অপারগ হয়ে নন্দিকেশ্বরের শরণ নেন। নন্দীকেশ্বর ২৬ টি শ্লোকে মাহেশ্বর সূত্রজালের দার্শনিক বিশ্লেষণ করেন যা ‘নন্দিকেশ্বর কাশিকা’ নামে পরিচিত হয়। পাণিনি এই সূত্র অবলম্বন করে সংস্কৃত ব্যাকরণের ভিত্তিস্থাপন করেন যার উপরে পরবর্তীতে কাত্যায়ণ ও পতঞ্জলি যথাক্রমে বার্ত্তিক ও মহাভাষ্য প্রণয়ন করে বেদোত্তর সংস্কৃত ভাষাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। নাগেশ ভট্ট, কৌণ্ড ভট্ট, ভট্টোজী দীক্ষিত প্রমুখ ব্যাকরণবিদ্ এই দর্শনের অনুসারী ছিলেন।

তবে নন্দিকেশ্বর কাশিকা ব্যাকরণগ্রন্থ নয়, বরং বৈয়াকরণ দর্শন। এতে মাহেশ্বর সূত্রের আলোকে ব্রহ্মবিদ্যা, বিশ্বতত্ত্ব, শিব-শক্তির স্বরূপ, জীব-শিব অভেদত্ব প্রভৃতি ব্যাখ্যাত হয়েছে। এই মতে অ-রূপ প্রনবাত্মক শিব ও ই-রূপ মায়া বা চিৎকলার মিলনে উ-রূপ জগৎ প্রকাশিত হয়। আবার প্রণব সর্বধ্বন্যাত্মক হ‌ওয়ায় জগৎ ও শক্তি প্রকৃতপক্ষে শিবেই সমাবিষ্ট। নন্দিকেশ্বরের অঙ্গীকৃত ষট্ত্রিংশৎ তত্ত্ব বাকি দর্শনগুলি থেকে কিয়দংশে ভিন্ন। কাশিকার উপর উপমন্যু মুনির ‘তত্ত্ববিমর্শিনী’ নামক টীকা উপলব্ধ হয়। এছাড়া এই সম্প্রদায়ের অন্য গ্রন্থ পাওয়া যায়না। কিন্তু অনেক পণ্ডিতের মতে মীমাংসা দর্শনে প্রসিদ্ধ স্ফোটবাদ এবং মহাবৈয়াকরণ ভর্ত্তৃহরির ‘বাক্যপদীয়’ গ্রন্থে প্রচারিত শব্দব্রহ্মবাদের প্রেরণা নন্দিকেশ্বর দর্শন। আবার কাশ্মীর শৈবদর্শনে মাতৃকাবর্ণ ও মন্ত্রতত্ত্বের আলোচনা বিশেষ স্থানলাভ করার কারণে অনেকে এই দর্শনের পূর্বপথিকৃৎ হিসেবেও নন্দিকেশ্বরের অবদান স্বীকার করেন।

কাশ্মীর শৈবদর্শন :

কাশ্মীর উপত্যকায় বিকশিত ও বলা যায় সেখানেই সীমাবদ্ধ এই তন্ত্রভিত্তিক অদ্বৈত শৈবদর্শন খ্রিস্টীয় নবম-দ্বাদশ শতকে উৎকর্ষের শিখরে উঠেছিল। পরম্পরাগত মান্যতা অনুযায়ী শ্রীকন্ঠ শিব এই মতের আদি প্রবক্তা এবং ঋষি দুর্বাসা কলিযুগের প্রথম আচার্য্য। অষ্টম থেকে একাদশ শতকে বসুগুপ্ত, ভট্ট কল্লাট, সোমানন্দ, উৎপলদেব, লক্ষণগুপ্ত, ভুতিরাজ, মহামাহেশ্বর অভিনবগুপ্ত, ক্ষেমরাজ, ক্ষেমেন্দ্র, রাজানক জয়রথ, মহেশ্বরানন্দ প্রমুখ অনেকানেক দিক্‌পাল আচার্য্যগণ এই সম্প্রদায়ের পুষ্টিসাধন করেন।

কাশ্মীর শৈবদর্শন ত্রিক বা ষড়র্ধ দর্শন, অখণ্ডাদ্বৈত বা ঈশ্বরাদ্বয় বা প্রতিবিম্ববাদ – ইত্যাদি নামে সমধিক প্রসিদ্ধ এবং প্রধানত পাঁচটি উপবিভাগে বিভক্ত— আগম, প্রত্যভিজ্ঞা, স্পন্দ, ক্রম ও কৌল।

এই মতে জীব, জগত ও শিব বস্তুতঃ অভেদ এবং ঈশ্বরের নির্গুণ-নিরাকার ও সগুণ-সাকার -দুটি দিক‌ই সমভাবে স্বীকৃত। বিশ্বোত্তীর্ণ প্রকাশবিমর্শাত্মক পরমশিব‌ই স্বীয় স্বাতন্ত্র‌্যশক্তি দ্বারা বিশ্বময় হিসাবে নিজেকে প্রকট করেন, একে শক্তির স্ফার বলা হয়। সচ্চিদানন্দ শিব সর্বদাই অসীম শক্তিযুত, তবে তার মধ্যে ছ’টি এবং ছ’টির মধ্যেও আবার তিনটি প্রধান— ‌ইচ্ছা, জ্ঞান ও ক্রিয়া। সৃষ্টির সূচনায় শিবাভিন্না শক্তি শিবাধীনা হয়ে স্পন্দমানা হন এবং অস্তিত্বের সমগ্রতা ব্যাপী এই স্পন্দন বজায় থাকে। পঞ্চকৃত্যপরায়ণ মায়াধীশ তিরোভাব দ্বারা স্বস্বরূপ বিস্মৃত হয়ে অশুদ্ধ অধ্বাসমূহের অধীনে আসেন ও জীবভাব ধারণ করেন। এতে কিন্তু তাঁর মূলরূপের কোনো হানি ঘটেনা। তাই জীবাত্মা প্রকৃতপক্ষে পরমাত্মার সম্বিদ্‌জাত প্রতিবিম্বস্বরূপ। জীবের চরম লক্ষ্য হল বিস্মৃত আত্মস্বরূপের পুনরুপলব্ধি ও তাতে নিরবচ্ছিন্ন অবস্থিতি, যাকে প্রত্যভিজ্ঞা বলা হয়ে থাকে। প্রত্যভিজ্ঞা লাভের চারটি উপায় বা পথ হলো— অনুপায়, শাম্ভবোপায়, শাক্তোপায় এবং আণবোপায়। এই উপায়গুলিতে সদ্গুরু কর্তৃক শিষ্যে শক্তিপাতের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।

আচার্য্য অভিনবগুপ্তপাদ প্রত্যভিজ্ঞা ও অন্যান্য উপধারাগুলি এবং তাদের সাধনমার্গগুলির বিষয়ে তাঁর তন্ত্রালোক শীর্ষক মহাগ্রন্থে বিশদে আলোচনা করেন এবং সমস্তটিকে একটি পরিপূর্ণ রূপদান করেন।

চতুঃষষ্ঠী ভৈরবাগম, রূদ্রযামল, মালিনীবিজয়োত্তর প্রভৃতি তন্ত্র, শিবদৃষ্টি, শিবসূত্র, ঈশ্বরপ্রত্যভিজ্ঞাকারিকা, বিজ্ঞানভৈরব, প্রত্যভিজ্ঞাহৃদয়ম্, স্পন্দকারিকা, পরাত্রিংশিকা, তন্ত্রালোক, তন্ত্রসার, মহার্থমঞ্জরী,পরমার্থসার ইত্যাদি বহু গ্রন্থ, এদের ভাষ্য-টীকা-বৃত্তি-বার্ত্তিকাদি এবং দার্শনিক তত্ত্বে সমৃদ্ধ শিবস্তোত্রাবলী, স্তবচিন্তামণি আদি বিশাল স্তোত্রসাহিত্য কাশ্মীর শৈবদর্শনের ভিত্তিস্বরূপ।

শৈবদর্শন বিষয়ে গবেষণার প্রাসঙ্গিকতা :

শিব সনাতন ধর্মের কেন্দ্রীয় দেবতা বললে অত্যুক্তি হয়না বোধহয়। বৈদিক-তান্ত্রিক, ব্রাহ্মণ্য-প্রতিবাদী, দ্বৈত-অদ্বৈত-বিশিষ্টাদ্বৈত-দ্বৈতাদ্বৈত — শিবকে কেন্দ্র করে সবরকম দর্শন বিকশিত হয়েছে। শৈব-শাক্ত ছাড়াও বহু বৈষ্ণব আগমের বক্তাও শিব। বিচার করলে বোঝা যায় শিবই ভারতভূমির প্রকৃত গণদেবতা।

ভারতীয় সমাজ ও সংস্কৃতির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ওপর সমাজের অন্তর্লীন ধর্মীয় প্রবাহের প্রভাব অনস্বীকার্য্য। শৈবধর্মও এক্ষেত্রে ব্যাতিক্রম নয়। মন্দিরভাস্কর্য্য, নৃত্যশিল্প, দর্শন, রাজনীতি থেকে আরম্ভ করে পর্যটন, উৎসব, এমনকি প্রাদেশিক খাদ্যাভ্যাস অবধি অগণিত ক্ষেত্রে শৈবরা অবদান রেখেছে এবং এখনও রেখে চলেছে। তামিলনাড়ুতে আদিশৈব গুরুক্কল, দীক্ষিতর, আইয়র প্রমুখ ব্রাহ্মণগোষ্ঠী এবং শৈব মঠ (অধীনম্‌)গুলির সক্রিয় ভূমিকায় শৈবসিদ্ধান্ত এখনো সমাজের একটি চালিকাশক্তি। কর্ণাটকে লিঙ্গায়ৎ ও বীরশৈবরা একটি রাজনৈতিক নির্ণায়কশক্তি। গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশার প্রাচীন মন্দিরশিল্পের বিকাশে পাশুপতরা অতি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছিল। সারা ভারতজুড়েই মন্দিরগাত্রে পৌরাণিক কাহিনীর চিত্রায়ণ দেখা যায়। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় তামিল চোল সাম্রাজ্যের বিস্তারের সাথে সেই অঞ্চলে শৈব-বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার ঘটে। বঙ্গদেশের সাথেও শৈবধর্মের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ বর্তমান। এদেশে একসময় শৈব সম্প্রদায়ের প্রবল প্রতিপত্তি ছিল। সম্রাট শশাঙ্ক নিজেকে ‘পরমশৈব’ বলেছেন, মহীপাল আদি পাল বংশের অনেক নৃপতি শৈবধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। বাংলার দিনাজপুর অঞ্চল একসময় এদের কেন্দ্র ছিল – মত্তময়ূর সম্প্রদায়ভুক্ত গোলাগী মঠের মতো শৈবমঠের বিদ্যাশিব প্রমুখ শৈবাচার্য্য রাজগুরু ছিলেন। ভারতবিদ্যার যেকোনো ক্ষেত্রে চর্চাতে শৈব প্রভাব উল্লেখযোগ্য আর এই কারণেই এই দর্শন চর্চিত হওয়ার দাবি রাখে, বিশেষ করে সে দর্শন জীবিত ও তা এই ভূমিকে এখনো প্রভাবিত করছে।

উপসংহার :

পরিশেষে, এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য গবেষকরা নন, একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের গভীরে গিয়ে আলোচনা এর লক্ষ্য নয়; ভারতবিদ্যা, ভারতীয় দর্শন, সংস্কৃত ও পুঁথিবিদ্যার প্রাথমিক ছাত্র ও উৎসাহী সাধারণ পাঠকের জন্য লিখিত এই প্রবন্ধ কেবলমাত্র একটি দিগ্‌দর্শন স্বরূপ। সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলির ইতিহাস অধিকাংশই এখনো অস্পষ্ট, পুস্তক অধিকাংশই অপ্রকাশিত, অননুবাদিত, দর্শনগত সূক্ষ্মতা অনুন্মোচিত। এবিষয়ে গবেষণার প্রভূত অবকাশ রয়েছে। কিছু মূল অনুসন্ধানযোগ্য পরিভাষা ও পাঠযোগ্য গ্রন্থতালিকা সমন্বিত এই প্রবন্ধটি যদি কোনো পাঠককে শৈবদর্শনের একটি সামগ্রিক পরিচয় দান করে এই বিষয়ে আরও জানতে অথবা গবেষণার বিষয় হিসেবে নির্বাচন করতে উৎসাহী করতে সফল হয় তাতেই এর সার্থকতা।

গ্রন্থপঞ্জী :

১/ অভিনবগুপ্ত – G. T. Deshpande (অনুবাদ – রত্না বসু) – সাহিত্য অকাদেমি (২০১৫)

২/ কাশ্মীর শৈবদর্শন – ডঃ দেবব্রত সেন শর্মা - রামকৃষ্ণ মিশন ইন্সটিটিউট অব কালচার (২০২১)

৩/ তন্ত্র ও আগম শাস্ত্রের দিগ্‌দর্শন – শ্রীগোপীনাথ কবিরাজ – প্রাচী প্রকাশনী (২০১৩)

৪/ তান্ত্রিক সাধনা ও সিদ্ধান্ত – শ্রীগোপীনাথ কবিরাজ – বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় (২০০৯)

৫/ পঞ্চোপাসনা – শ্রীজিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় – কে. এল. মুখোপাধ্যায় (১৯৬০)

৬/ ভারতীয় ধর্মের ইতিহাস – নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য – জেনারেল (২০১৪)

৭/ বচন (বাংলা) – (সম্পাদক ও অনুবাদক – ডঃ মীরা চক্রবর্তী) – বসব সমিতি (২০১২)

৮/ বসবন্না – এম. চিদানন্দ মূর্তি (অনুবাদ – শান্তিকুমার মিত্র) – ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট, ইন্ডিয়া (১৯৯৮)

৯/ বেদান্তদর্শনম্‌ (১ম অধ্যায়) - স্বামী বিশ্বরূপানন্দ – উদ্বোধন কার্যালয় (২০১৯)

১০/ শাস্ত্রমূলক ভারতীয় শক্তিসাধনা (প্রথম খণ্ড) – উপেন্দ্রকুমার দাস – রামকৃষ্ণ মিশন ইন্সটিটিউট অফ কালচার (২০১০)

১১/ সর্ব্বদর্শনসংগ্রহঃ – মহেশ্চন্দ্র পাল (১৯৫০)

১২/ সর্ব্বদর্শনসংগ্রহঃ – শ্রীজয়নারায়ণ তর্কপঞ্চানন (১৯২১)

১৩/ A Handbook of Virasaivism – S. C. Nandimath – The Literary Committee, Lingayat Education Association (1942)

১৪/ An Outline of History of Saiva Philosophy – K. C. Pandey & R. C. Dwivedi – Motilal Banarsidass (1986)

১৫/ Aspects of Indian Thought - Gopinath Kaviraj - The Bharatiya Vidya Prakashan (2022)

১৬/ Kashmir Shaivism: The Secret Supreme – Swami Lakshmanjoo – Lakshmanjoo Academy (2016)

১৭/ Saiva Siddhantam (Vol. 1) – (Edited by – Sekkizhar Adi-podi T. N. Ramachandran) – Dharumai Adheenam (1984)

১৮/ Sivadvaita Nirnaya: An Inquiry into the System of Srikantha – Appayya Diksita (Trans. – S. S. Suryanarayana Sastri) – University of Madras (1929)

১৯/ SriNandikesaKasika – K. S. Balasubramanian & T. V. Vasudeva – The Kuppuswami Sastri Research Institute (2009)

২০/ Studies in Saiva Siddhanta – J. M. Nallasvami Pillai (1911)

২১/ The Sivadvaita of Srikantha – S. S. Suryanarayana Sastri – University of Madras (1930)

২২/ पाशुपत सूत्र पञ्चार्थ भाष्य – आलोक मणि त्रिपाठी – Pratibha Prakashan (1998)



Authored by লেখক – অম্লান চক্রবর্তী, প্রতিষ্ঠান – রামকৃষ্ণ মিশন বিবেকানন্দ সেন্টেনারী কলেজ

Published by,