ছান্দোগ্যোপনিষদের অন্তর্গত নারদ-সনত্কুমার-সংবাদের মাহাত্ম্য বর্ণনা ও সামাজিক প্রয়োজনীয়তা
প্রবন্ধের সারসংক্ষেপ
ছান্দোগ্যোপনিষদের অন্তর্গত এই নারদ-সনৎকুমার-সংবাদে মূলত পরব্রহ্মের স্বরূপ বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। এই উপাখ্যানে বর্ণিত আছে যে, ঋষিপুঙ্গব নারদমহর্ষি সমস্ত বিদ্যায় পারদর্শী হওয়া সত্ত্বেও শোকসাগর থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ব্রহ্মজ্ঞানী মহর্ষি সনৎকুমারের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। মহর্ষি সনৎকুমার শিষ্যরূপে আগত নারদমুনির সমস্ত বৃত্তান্ত শ্রবণের পর নামাদি উপাসনার মাধ্যমে ভূমা-স্বরূপ ব্যাখ্যা করেছিলেন নারদমুনির সমীপে। ভূমা-স্বরূপের বর্ণনা শ্রবণ করেও নারদমুনির ব্রহ্মবিষয়ক জ্ঞানপিপাসার অবসান ঘটেনি। অবশেষে নারদমুনিকে শ্রদ্ধা-বিনয়শীল যোগ্য শিষ্য মনে করে মহর্ষি সনৎকুমার প্রকৃত তত্ত্বোপদেশের মাধ্যমে পরব্রহ্মের স্বরূপ সম্পর্কে অবগত করালেন। ব্রহ্মের স্বরূপ অবগত হওয়ার পর নারদমুনি প্রকৃতপক্ষে শোকসাগর থেকে মুক্তি পেলেন গুরুর কৃপায়।
এই প্রবন্ধে নারদ-সনৎকুমার-সংবাদের ব্রহ্মতত্ত্ব প্রতিপাদনের মাধ্যমে বর্তমানকালিক সামাজিক প্রয়োজনীয়তা বর্ণনা করা হয়েছে।
সূচক শব্দাবলী
অজ্ঞাতবিষয়ে জিজ্ঞাসা, প্রকৃত গুরুর লক্ষণ, যোগ্য শিষ্যের লক্ষণ, অজ্ঞান-স্বরূপ, নামাদি ব্রহ্মোপাসনা, ভূমা-স্বরূপ, পরব্রহ্মের স্বরূপ ইত্যাদি।
গবেষণা পত্রের উদ্দেশ্য
বর্তমান সমাজে ভারতীয় সংস্কৃতি বিলুপ্তপ্রায়। উচিৎ-অনুচিৎ, হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে মানুষ আজ অরাজকতার রাজ্যে বসবাস করছে। ঋষি পরম্পরা অনুসারে প্রাপ্ত আচার-ব্যবহারের ঊর্দ্ধে উঠে গিয়ে ভাইয়ে ভাইয়ে দ্বন্দ্ব করছে, দেবতাতুল্য মাতা-পিতাকে অবজ্ঞার চোখে দেখছে, দেবতাতুল্য আচার্যগুরুর সম্মান হানি হচ্ছে, অসাধু ব্যক্তি মিথ্যা মায়ার জালে সাধারণ মানুষকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে, একে অপরের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ বেড়েই চলেছে। মানুষকে সৎ-বুদ্ধি দেওয়ার পরিবর্তে কু-পরামর্শ দিয়ে অন্ধকারের পথে ঠেলে দিচ্ছে মানুষই। তাই আবারও প্রয়োজন সেই আদর্শ ঋষি পরম্পরা, যার মাধ্যমে বর্তমান সমাজের মেরুদণ্ড সুদৃঢ় হয়ে উঠবে। সেইজন্য এই গবেষণা-পত্রের মাধ্যমে সমস্ত অরাজকতার অবসান ঘটিয়ে এক সমুজ্জ্বল আদর্শের পথে বর্তমান সমাজকে ত্বরান্বিত করা এবং কল্যাণ সাধন করাই হল একমাত্র উদ্দেশ্য।
১. প্রস্তাবনা
সামবেদীয় ছান্দোগ্যোপনিষদে সর্বমোট আটটি অধ্যায় উপলব্ধ। সেই আটটি অধ্যায়ের মধ্যে সপ্তম-অধ্যায়ে “নারদ-সনৎকুমার-সংবাদ”-নামক উপাখ্যানটি পাওয়া যায়। ‘ভূমাবিদ্যা’, ‘সনৎকুমারবিদ্যা’ ইত্যাদি নামেও সুপ্রসিদ্ধ এই সপ্তম অধ্যায়টি। এই অধ্যায়টি মোট ছাব্বিশটি খণ্ডে বিভক্ত। যথাক্রমে, প্রথম খণ্ডে পাঁচটি মন্ত্র, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় খণ্ডে দুটি করে মন্ত্র, চতুর্থ এবং পঞ্চম খণ্ডে একটি করে মন্ত্র, ষষ্ঠ খণ্ড থেকে চতুর্দশ খণ্ড পর্যন্ত দুটি করে মন্ত্র, পঞ্চদশ খণ্ডে চারটি মন্ত্র, ষোড়শ খণ্ড থেকে ত্রয়োবিংশতি খণ্ড পর্যন্ত একটি করে মন্ত্র এবং চতুর্বিংশতি থেকে ষড্বিংশতি খণ্ড পর্যন্ত দুটি করে মন্ত্র আছে।
ছান্দোগ্যোপনিষদের ষষ্ঠ-অধ্যায়টি বিশেষ করে পরমার্থতত্ত্বের উপদেশ ও সৎস্বরূপ আত্মার একত্ব নির্ণয় করবার উদ্দেশ্যেই বিরচিত হয়েছে, কিন্তু সৎপদার্থের অধস্তন বিকার-স্বরূপ তত্ত্বসমূহ তাতে নির্দিষ্ট হয়নি। এই জন্য সৎপদার্থের অধস্তন ‘নাম’ থেকে আরম্ভ করে ‘প্রাণ’ পর্যন্ত তত্ত্বসমূহ নির্দেশ করে, সেটির দ্বারা শাখা-চন্দ্রদর্শনের ন্যায় ভূমা-নামক নিরতিশয় অর্থাৎ সর্বশ্রেষ্ঠ তত্ত্ব নির্দেশ করার উদ্দেশ্যে এই সপ্তম-অধ্যায় রচিত হয়েছে। পরাবিদ্যা অর্থাৎ পারমার্থিক জ্ঞানের প্রশংসার নিমিত্তই এই “নারদ-সনৎকুমার” আখ্যায়িকার অবতারণা করা হয়েছে।
এই আখ্যায়িকার মাধ্যমে আমরা মূল্যবান কিছু শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি—কিভাবে বর্তমান সমাজকে উন্নতির পথে চালনা করা যায়। কিভাবে ভারতীয় পরম্পরায় অনুপ্রাণিত হয়ে বর্তমান প্রজন্ম সুন্দর জীবন গঠনে সক্ষম হতে পারে, সে বিষয়েই এখন আলোচনা করবো।
২. উপাখ্যানের সারাংশ
ঋষিপুঙ্গব নারদমহর্ষি স্বয়ং দেবর্ষি, সর্বব্যাপারে কৃতকৃত্য এবং সর্বশাস্ত্রজ্ঞ হয়েও আত্মজ্ঞানের অভাবে যখন শোকসাগরে নিমগ্ন ছিলেন, তখন শ্রেয়ঃসাধন-প্রাপ্তি অর্থাৎ মুক্তি লাভের উপায় জানবার জন্য বিধিপূর্বক সমিধাদি সহ মহর্ষি সনৎকুমারের নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন—হে ভগবন্ ! আমাকে অধ্যয়ন করান। সনৎকুমার তাঁকে বললেন—তুমি যা কিছু জান তা আমার নিকট প্রকাশ কর এবং তারপর আমি তোমাকে যথাবিধি উপদেশ প্রদান করব। যথারীতি এতদিন যাবৎ অধীতবিদ্যা সম্পর্কে নারদমুনি বললেন—ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ, চতুর্থ অথর্বদবেদ, পঞ্চমবেদ ইতিহাস ও পুরাণ, বেদসমূহের বেদ ব্যাকরণ শাস্ত্র, পিতৃলোকের শ্রাদ্ধবিষয়ক শাস্ত্র, গণিতশাস্ত্র, নিধিশাস্ত্র, তর্কশাস্ত্র, নীতিশাস্ত্রে, দেববিদ্যা, ব্রহ্মবিদ্যা, ভূতবিদ্যা ক্ষত্রবিদ্যা, নক্ষত্রবিদ্যা, সর্পবিদ্যা, দেবজনবিদ্যা ও নৃত্যগীতাদি বিজ্ঞান—এই সমস্ত বিদ্যা আমি অধ্যয়ন করেছি। কিন্তু সমস্ত বিদ্যায় পারদর্শী হয়েও দুঃখভোগ করছি, অতএব আপনি আমাকে শোকের পরপারে উত্তীর্ণ করুন। তখন সনৎকুমার তাঁকে বললেন যে, তুমি যা কিছু অধ্যয়ন করেছ তা কেবল নাম-মাত্রই অর্থাৎ বিকারাত্মক নামমাত্র।
অনন্তর নারদমুনিকে নামের উপাসনা অর্থাৎ নামকেই ব্রহ্মজ্ঞান করে উপাসনা করার জন্য উপদেশ দিলেন। কেননা যে পর্যন্ত নামের গতি থাকে সেই পর্যন্ত সেই উপাসকের যথেচ্ছ অধিকার থাকে। নারদ পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন—হে ভগবন্ ! নামের থেকে অধিক কিছু আছে কি ? সনৎকুমার বললেন—নামের থেকে অধিক আছে। বাগিন্দ্রিয়ই নাম অপেক্ষাও অধিক বা শ্রেষ্ঠ বলে জানবে, কারণ ঋগ্বেদাদি চতুর্বেদ, ইতিহাস ও পূরাণ, দেববিদ্যা, ব্রহ্মবিদ্যা, ধর্ম, অধর্ম, সাধু, অসাধু ইত্যাদিকে বিজ্ঞাপিত করে। বাগিন্দ্রিয়ের যে পর্যন্ত গতি বিদ্যমান ততদূর পর্যন্ত বাগিন্দ্রিয়-উপাসকের যথেচ্ছ অধিকার থাকে।
এইরূপ বার বার নারদ শ্রেষ্ঠ থেকেও শ্রেষ্ঠতম উপাসনার বিষয় সম্পর্কে জানতে চাইলেন এবং প্রত্যুত্তরে সনৎকুমার সেই সেই উপাসনার উৎকর্ষ বিচার করতে লাগলেন। যথা—
বাগিন্দ্রিয় অপেক্ষা মন শ্রেষ্ঠ। মন অপেক্ষা সঙ্কল্প শ্রেষ্ঠ। সঙ্কল্প অপেক্ষা চিত্ত শ্রেষ্ঠ। চিত্ত অপেক্ষা ধ্যান শ্রেষ্ঠ। ধ্যান অপেক্ষা বিজ্ঞান অর্থাৎ শাস্ত্রবিষয়ক জ্ঞান শ্রেষ্ঠ। বিজ্ঞান অপেক্ষা বল অর্থাৎ মানসিক শক্তি শ্রেষ্ঠ। বল অপেক্ষা অন্ন শ্রেষ্ঠ। অন্ন অপেক্ষা জল শ্রেষ্ঠ। জল অপেক্ষা তেজ শ্রেষ্ঠ। তেজ অপেক্ষা আকাশ শ্রেষ্ঠ। আকাশ অপেক্ষা স্মর অর্থাৎ অন্তঃকরণের ধর্মবিশেষ স্মরণ শ্রেষ্ঠ। স্মর বা স্মরণ অপেক্ষা আশা শ্রেষ্ঠ। আশা অপেক্ষা প্রাণ শ্রেষ্ঠ।
আশা অপেক্ষা প্রাণ কেন শ্রেষ্ঠ সে বিষয়ে বলা হচ্ছে—নাভিদেশে অর্থাৎ শকটচক্রের মধ্যস্থ ছিদ্রে যেমন চক্রের শলাকাসমূহ সন্নিবিষ্ট থাকে, এইরূপ এই প্রাণে নামাদি সমস্তই প্রতিষ্ঠিত আছে। প্রাণের সাহায্যেই প্রাণ গমন করে, প্রাণই প্রাণকে দান করে এবং প্রাণের উদ্দেশ্যেই দান করে। প্রাণই পিতা, প্রাণই মাতা, প্রাণই ভ্রাতা, প্রাণই ভগিনী, প্রাণই আচার্য্য, প্রাণই ব্রাহ্মণ এবং সমস্ত কিছুই প্রাণস্বরূপ অর্থাৎ প্রাণ ব্যতীত কিছুই নাই। কোন ব্যক্তি যদি মাতা, পিতা, ভাই, ভগিনী প্রভৃতিকে রূঢ় বাক্য বলে তাহলে অন্য ব্যক্তিরা তাকে বলে ‘তোমাকে ধিক্, তুমি পিতৃহন্তা, তুমি মাতৃহন্তা’ ইত্যাদি। আর যদি কেই উৎক্রান্তপ্রাণ অর্থাৎ বিগতপ্রাণ পিতা, মাতা প্রভৃতিকে শূলে বিদ্ধ ও অস্ত্র দ্বারা ছিন্ন-ভিন্ন করে দগ্ধ করে তাহলে তাকে কেউই ঐরূপ ধিক্কার জানায় না। এই নামাদি সমস্ত পদার্থ প্রাণই, সেই উপাসক এইরূপ যুক্তিপূর্বক চিন্তা করে ও নিশ্চিত করে অতিবাদী হন অর্থাৎ নাম থেকে আরম্ভ করে আশা পর্যন্ত সমস্ত তত্ত্বের অতিরিক্ত তত্ত্বসমূহও বুঝতে সমর্থ হন। যদি কেউ তাকে বলে, “তুমি অতিবাদী হয়েছ” তাহলে সে বলবে, “হ্যাঁ, আমি অতিবাদীই হয়েছি”, এইরূপ নিজের অতিবাদিত্ব কখনও অস্বীকার করবে না।
নারদমুনি প্রাণের স্বরূপ শ্রবণ করে তুষ্ণীভাব অবলম্বন করলেন। পূর্ববৎ আর জিজ্ঞাসা করলেন না যে, প্রাণের থেকেও শ্রেষ্ঠ কিছু আছে কি না ? যোগবাসিষ্ঠে উল্লেখ পাওয়া যায় ‘বোধয়ন্তি বলাদেব সানুকম্পা হি সাধবঃ’[1] অর্থাৎ সাধু ব্যক্তি কৃপালু হন, সেইজন্য যোগ্যশিষ্যকে বলপূর্বক যথার্থতত্ত্বের বোধ করান। অতএব ভগবান সনৎকুমার লক্ষ্য করলেন যে, নারদ একজন উত্তম সাধক তবুও প্রাণই আত্মা এইরূপ মনে করে সন্তুষ্ট হয়েছে। তখন সনৎকুমার সত্য-বিজ্ঞান-মতি-শ্রদ্ধা-নিষ্ঠা-কৃতি-সুখাদি প্রভৃতি তত্ত্ববিশ্লেষণের মাধ্যমে ভূমা-স্বরূপ বর্ণনা করে উপদেশ দিলেন। ভূমাস্বরূপ যথা—
যা ভূমা বা সর্বাপেক্ষা মহৎ, সেটাই সুখ, অল্পে অর্থাৎ ক্ষুদ্র বা সসীম বা পরিচ্ছিন্ন বস্তুতে সুখ নাই, ভূমাই সুখ অর্থাৎ সুখস্বরূপ। অতএব ভূমা বিষয়ে জ্ঞানলাভ করাই কর্তব্য। যেখানে অন্য কোন দৃশ্যই দর্শন করে না, অন্য কোন শ্রব্যই শ্রবণ করে না, অন্য কোন জ্ঞেয়ই জানিতে পারে না অর্থাৎ যে পদার্থের জ্ঞানে অন্য কিছুই দেখবার, শুনবার বা জানবার প্রয়োজন হয় না, সেটাই হল ভূমা। আর যেখানে অন্য বিষয় দর্শন করে, অন্য বিষয় শ্রবণ করে, অন্য জানতে পারে, সেটাই অল্প। যা ভূমা, সেটাই অমৃত। আর যা অল্প অর্থাৎ ভূমার বিপরীত, তা মর্ত্ত্য বা নশ্বর। এই ভূমা নিজের মহিমা অর্থাৎ ঐশ্বর্যে প্রতিষ্ঠিত আছে অথবা নিজের মহিমাতেও প্রতিষ্ঠিত নেই। ইহলোকে যেমন গো, অশ্ব, হস্তী, সুবর্ণ, ভৃত্য, ভার্যা প্রভৃতি এই সমস্ত বস্তুকে মহিমা বা ঐশ্বর্য বলা হয়, এখানে সেরূপ মহিমার বিষয় বলা হয়নি। কারণ অন্য পদার্থই অন্য পদার্থে প্রতিষ্ঠিত থাকে কিন্তু ভূমার যখন অন্য কিছুই নাই অর্থাৎ তিনি যখন সর্বময়, তখন তাঁর সেরূপ মহিমা প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয় না। অতএব বলাই বাহুল্য যে, সেই ভূমাই অধোদেশে, ঊর্দ্ধদেশে, পশ্চাদ্দেশে, সম্মুখদেশে, দক্ষিণভাগে, উত্তরভাগে বিরাজমান। অনন্তর সেই ভূমাই আত্মা, যিনি সর্বত্র বিরাজমান আছেন। যে ব্যক্তি আত্মা বা ভূমা সম্পর্কে এইরূপ জানেন তিনি আত্মরতি, আত্মক্রীড়, আত্মমিথুন, আত্মানন্দ ও স্বরাট্ হন্। স্বর্গাদি সমস্ত লোকেই তার যথেচ্ছ স্বাধীনতা থাকে এবং যারা এর বিপরীত তারা সমস্ত লোকেই পরাধীন হয়ে থাকে। পূর্বোক্তরূপ দর্শনকারী, মননকারী, বিজ্ঞানকারী ও স্বরাজ্যপ্রাপ্ত সেই এই ব্যক্তির আত্মা থেকেই প্রাণ, আশা, স্মর, আকাশ, তেজ, জল, জন্ম-মৃত্যু, অন্ন, বল, বিজ্ঞান, ধ্যান, চিত্ত, সঙ্কল্প, মন, বাক্, নাম, মন্ত্রসমূহ, কর্মসমূহ প্রাদুর্ভূত হয়েছে এবং এই সমস্ত জগৎই আত্মা থেকেই উৎপত্তি লাভ করেছে।
এইরূপ ব্রহ্মতত্ত্বোপদেশের মাধ্যমে ভগবান সনৎকুমার সেই বিষয়বিরক্ত ও শোকসাগরে নিমজ্জিত নারদমুনিকে মুক্তির সন্ধান দিয়েছিলেন।
৩. উপাখ্যানের বৈশিষ্ট্য
চতুর্বেদের মধ্যে সামবেদ অন্যতম। সামবেদীয় কৌথুমশাখার অন্তর্গত ছান্দোগ্যোপনিষদের সমগ্র সপ্তম অধ্যায় জুড়ে বিরাজ করছে এই “নারদ-সনৎকুমার-সংবাদ” নামক উপাখ্যানটি। এই উপাখ্যানটি গুরু-শিষ্য-সংবাদ স্বরূপ। এই সপ্তমোঽধ্যায়ের অপর নামও পাওয়া যায়, যথা—ভূমবিদ্যা এবং সনৎকুমারবিদ্যা। এই অধ্যায়ে ছাব্বিশটি খণ্ড উপলব্ধ আছে। বস্তুতঃ এই উপাখ্যানটি ব্রহ্মতত্ত্বের প্রতিপাদক বলে আমি মনে করি, কেননা উপাখ্যানের প্রথমে নামাদি সাধনবিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার পর অন্তিমে ব্রহ্মতত্ত্বের প্রতিপাদন করা হয়েছে। এই উপাখ্যানে ভূমাস্বরূপ প্রতিপাদনের মাধ্যমে এটাই বোঝানো হচ্ছে যে, ভূমার অর্থাৎ পরব্রহ্মের জ্ঞান যদি বিদ্যমান থাকে তাহলে শোকমোহাদির নিবৃত্তি অবশ্যই ঘটবে। এই উপাখ্যানে মহদ্বৈশিষ্ট্য হল—আত্মজ্ঞান ভিন্ন অন্য কোন নিরতিশয় শ্রেষ্ঠ সাধন নাই এইরূপ প্রতিপাদন করে। তাই এই উপাখ্যান ভূমাবিদ্যা নিরূপণের মাধ্যমে আনন্দস্বরূপ পরমাত্মার স্বরূপ প্রকাশ করেছে।
৪. উপাখ্যানের ব্রহ্মতত্ত্ব-প্রতিপাদকত্ব নিরূপণ
এই উপাখ্যানটি কেন ব্রহ্মতত্ত্ব প্রতিপাদনকারী সে বিষয়ে বলা হচ্ছে—এই উপাখ্যানে দেখা যাচ্ছে যে, সর্ববিদ্যা-গুণ-সম্পন্ন ঋষিনারদ ব্রহ্মতত্ত্বজ্ঞানেচ্ছু হয়ে তত্ত্বজ্ঞান লাভের আশায় সবিনয়ে সনৎকুমারের কাছে গিয়েছিলেন। নারদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে মহর্ষি সনৎকুমার নামাদি প্রাণ পর্যন্ত উপাসনাতত্ত্ব প্রতিপাদন করার পর ভূমা-স্বরূপ বর্ণনার মাধ্যমে পরব্রহ্মের স্বরূপ বিষয়ে গূঢ় উপদেশ প্রদান করেন। ভূমা সর্বাপেক্ষা মহৎ, ভূমাই সুখস্বরূপ ইত্যাদি পরব্রহ্মের স্বরূপ প্রতিপাদন করার পর অন্তিমে ব্রহ্মবিদ্যা উপাসনার ফল ও মাহাত্ম্য সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। যথা—“যো বৈ ভূমা তত্সুখং নাল্পে সুখমস্তি ভূমৈব সুখং...”[2] “যত্র নান্যত্পশ্যতি নান্যচ্ছৃণোতি নান্যদ্বিজানাতি স ভূমাথ...”[3] “গো-অশ্বমিহ মহিমেত্যাচক্ষতে...”[4] “স এবাধস্তাত্স উপরিষ্টাত্স পশ্চাত্স...”[5] “অথাত আত্মাদেশ এব...”[6] “তস্য হ বা এতস্যৈবং পশ্যত...”[7] “তদেষ শ্লোকো ন পশ্যো মৃত্যুং পশ্যতি...”[8] ইত্যাদি ছান্দোগ্য শ্রুতিবাক্যের দ্বারা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে এই উপাখ্যানটি ব্রহ্মস্বরূপবিষয়ক তত্ত্বকে প্রতিপাদন করছে।
৫. অদ্বৈতবেদান্তের মূলতত্ত্ব প্রতিপাদনে যোগদান এবং সামাজিক প্রয়োজনীয়তা
অদ্বৈতবেদান্তের মূলতত্ত্ব প্রতিপাদনে এই উপাখ্যানের যোগদান ও সামাজিক প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে যথাসাধ্য প্রতিপাদন করছি—
৫.১. অদ্বৈতবেদান্তের মূলতত্ত্ব প্রতিপাদনে যোগদান
অদ্বৈতবেদান্তের মূলতত্ত্ব প্রতিপাদনে এই উপাখ্যানের যোগদান অনস্বীকার্য। যথা—সমগ্র অদ্বৈতবেদান্ত মতাবলম্বীদের তাৎপর্য সচ্চিদানন্দস্বরূপ পরব্রহ্মে বিদ্যমান। তাই, সম্পূর্ণ অদ্বৈতবেদান্তশাস্ত্রের সার বিষয়বস্তু হল “সর্বং খলু ইদং ব্রহ্ম”[9] এই শ্রুতিবাক্য। অদ্বৈবেদান্তের বহু স্থানে পরব্রহ্মবিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে—
ব্রহ্মৈবেদম্ অমৃতং পুরস্তাৎ ব্রহ্ম পশ্চাৎ ব্রহ্ম দক্ষিণতশ্চোত্তরেণ।
অধশ্চোর্ধ্বং চ প্রসৃতং ব্রহ্মৈবেদং বিশ্বমিদং বরিষ্ঠম্॥[10]
পরব্রহ্মের অদ্বিতীয়তা প্রতিপাদনের জন্য শ্রুতিতে বলা হয়েছে “একমেবাদ্বিতীয়মিতি” অর্থাৎ সজাতীয়, বিজাতীয় এবং স্বগত ভেদশূন্য-রূপ পরব্রহ্ম। আবার চতুর্বিধ মহাবাক্যের দ্বারা পরব্রহ্মের স্বরূপই প্রতিপাদিত হয়েছে অদ্বৈতবেদান্তশাস্ত্রে, যথা—ঋগ্বেদে “প্রজ্ঞানং ব্রহ্ম”[11], যজুর্বেদে “অহং ব্রহ্মাস্মি”[12], সামবেদে “তত্ত্বমসি”[13] এবং অথর্ববেদে “অয়মাত্মা ব্রহ্ম”[14]।
ব্রহ্মসূত্র গ্রন্থের জিজ্ঞাসাধিকরণে “অথাতো ব্রহ্মজিজ্ঞাসা”[15] এই সূত্রের দ্বারা ব্রহ্ম বিষয়ে অনেক চর্চা হয়েছে, সেখানে “আত্মা বৈ অরে দ্রষ্টব্যঃ শ্রোতব্যঃ...”[16] এই শ্রুতিবাক্যকে সিদ্ধান্ত হিসাবে অঙ্গীকার করা হয়েছে। যোগীন্দ্র সদানন্দ প্রণীত বেদান্তসার গ্রন্থেও উল্লেখ আছে যে, “ব্রহ্মৈব নিত্যং বস্তু ততোঽন্যদখিলম্ অনিত্যম্”।
অনুরূপভাবে এই নারদ-সনৎকুমার উপাখ্যানেও পরব্রহ্ম বিষয়ে সবিস্তারে আলোচনা করা হয়েছে, যথা—“যো বৈ ভূমা তত্সুখং নাল্পে সুখমস্তি ভূমৈব সুখং...”[17] “যত্র নান্যত্পশ্যতি নান্যচ্ছৃণোতি নান্যদ্বিজানাতি স ভূমাথ...”[18] “গো-অশ্বমিহ মহিমেত্যাচক্ষতে...”[19] “স এবাধস্তাত্স উপরিষ্টাত্স পশ্চাত্স...”[20] “অথাত আত্মাদেশ এব...”[21] “তস্য হ বা এতস্যৈবং পশ্যত...”[22] “তদেষ শ্লোকো ন পশ্যো মৃত্যুং পশ্যতি...”[23] ইত্যাদি। অতএব নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, অদ্বৈতবেদান্তের মূলতত্ত্ব প্রতিপাদনে এই উপাখ্যানের মহৎ যোগদান আছে।
৫.২. উপাখ্যানের সামাজিক প্রয়োজনীয়তা
সম্প্রতি এই উপাখ্যানের সামাজিক প্রয়োজনীয়তা ঠিক কতটুকু, সে বিষয়ে সবিস্তরে আলোকপাত করার চেষ্টা করছি—ঋষিপুঙ্গব নারদমহর্ষি ছিলেন সর্ববিদ্যা বিশারদ এবং সর্বলোকজ্ঞ। তবুও তিনি আত্মজ্ঞান বর্জিত এবং শোকগ্রস্ত ছিলেন। তাই তিনি ব্রহ্মজ্ঞানের জন্য ব্রহ্ম-জ্ঞানীদের মধ্যে অগ্রগণ্য সনৎকুমারের কাছে গিয়েছিলেন। এটাই প্রতীত হয় যে, সমস্ত বৈদিক এবং জাগতিক জ্ঞান আত্ম-জ্ঞান ছাড়া অপ্রয়োজনীয়। এমনকি মহাপণ্ডিতগণও ব্রহ্মবিদ্যার ক্ষেত্রে একটি নিয়ম প্রকাশ করেছেন, সেটি হল—“গুরুমেবাঽভিগচ্ছেৎ” অর্থাৎ তত্ত্বোপদেশের জন্য গুরুর সমীপেই যাওয়া উচিৎ। এই উপাখ্যান থেকে এটাই শিক্ষা নেওয়া উচিৎ যে, সকল বিষয়ে জ্ঞান থাকলেও সর্বদা আত্মতত্ত্ববিষয়ক উৎকৃষ্ট বিষয়ে কৌতূহল রাখা উচিৎ। যাতে আমরা আমাদের নিজের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে জানতে পারি। তদুপরি, ব্রহ্মস্বরূপ বিষয়ে জ্ঞান লাভ করলে আমরা সহজেই মোক্ষ লাভ করতে পারব।
এই উপাখ্যানে দেখা যায়—এই অনিত্য জগৎ-সংসারে সবকিছুই বিনাশশীল এবং মৃত্যুর পরে কেবল নামই অবশিষ্ট থাকে। আমরা সকলেই জানি যে, মানুষ মারা গেলে তার কর্ম অনুযায়ী অন্যান্য মানুষেরা তার নাম মনে রাখে। কোন ব্যক্তি সমাজকল্যাণের জন্য ভালো কাজ করলে, সেই ব্যক্তির মৃত্যুর পরও সবাই তার নাম বার বার স্মরণ করে। প্রতিদিন অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে কিন্তু তাদের কেউ মনে রাখে না, কারণ তারা সমাজের কল্যাণের জন্য কোন অবদান রাখেনি। অতএব, আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিৎ, সমাজের কল্যাণে সর্বদা নিজের জীবন উৎসর্গ করা একমাত্র কর্তব্য। এইরূপ চিন্তাধারার পরিবর্তন ঘটালে সমগ্র জগৎ-সংসারের কল্যাণ সাধন হতে পারে।
তদুপরি, সমস্ত কার্যক্ষেত্রে যদি সর্বদা কঠোর প্রচেষ্টা করা হয়, তাহলে সেই কাজ অবশ্যই সাফল্যমণ্ডিত হবে। যেমন, কোন শিক্ষার্থী যদি তার পাঠ্যবিষয়ে মনোযোগ সহকারে অধ্যয়ন করে তাহলে সে অবশ্যই পরীক্ষায় ভালো ফলাফল লাভ করবে। সেইরূপ শিল্প ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সকল প্রকার প্রচেষ্টা ও মনোযোগ সহকারে কাজ করলে কর্মক্ষেত্রে মর্যাদা ও পদোন্নতির বৃদ্ধি ঘটবে। উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছানোর একমাত্র উপায় হল নিজের কর্মঠ মনোভাব এবং প্রচেষ্টা। যেমন, এই উপাখ্যানে নারদমুনি নামাদি উপাসনা করে পরম প্রচেষ্টায় আত্মার রহস্যময় সার সম্পর্কে জ্ঞান লাভে সক্ষম হলেন।
এই উপাখ্যানের আরও একটি মহৎ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্যণীয়—পরম করুণাময় মহর্ষি সনৎকুমার পর্যবেক্ষণ করলেন যে, নারদ একজন উত্তম সাধক, অথচ ‘প্রাণই আত্মা’ এইরূপ অবগত হয়ে প্রকৃত আত্মস্বরূপ সম্পর্কে জানার ইচ্ছা প্রকাশ করছে না। তাই, নারদের প্রতি বাৎসল্যভাব রেখে কৃপা পূর্বক সত্য-বিজ্ঞানাদিতত্ত্ব নিরূপণের মাধ্যমে ভূমা-স্বরূপ ব্যাখ্যা করলেন। যোগবাসিষ্ঠে উল্লেখ পাওয়া যায় ‘বোধয়ন্তি বলাদেব সানুকম্পা হি সাধবঃ’[24] অর্থাৎ সাধু ব্যক্তি কৃপালু হন, সেইজন্য যোগ্যশিষ্যকে বলপূর্বক যথার্থতত্ত্বের বোধ করান। অতএব এখানে সনৎকুমার মহর্ষিকে প্রকৃত গুরু হিসাবে চিহ্নিত করা যায়। সুতরাং, এই উপাখ্যান থেকে এটাই শিক্ষা নেওয়া উচিৎ যে, প্রকৃত গুরু সর্বদা দয়ালু হবেন। কেননা, গুরুর এই দয়ালু স্বভাবের কারণে অযোগ্য শিষ্যরাও অনায়াসে অজ্ঞতার সাগর পাড়ি দিতে পারবে। কিন্তু গুরু যদি সদয় ও করুণাময় না হন তবে শিষ্যেরা অন্ধকারাচ্ছন্নরূপ সমুদ্রে নিমজ্জিত হবে। সর্বোপরি, শিষ্যদেরও শ্রদ্ধাশীল হতে হবে নারদমুনির ন্যায়। কারণ একমাত্র শ্রদ্ধাশীল শিষ্যই গুরুর কৃপা লাভ করতে পারে। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাতে স্পষ্ট বলা হয়েছে—
শ্রদ্ধাবাঁল্লভতে জ্ঞানং তত্পরঃ সংযতেন্দ্রিয়ঃ।
জ্ঞানং লব্ধ্বা পরাং শান্তিমচিরেণাধিগচ্ছতি॥[25]
এই উপাখ্যান থেকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা লাভ করা যায়, তা হল—‘নাল্পে সুখমস্তি’ অর্থাৎ অল্পে সুখ নাই। এই শ্রুতিবাক্যের তাৎপর্য হল পরব্রহ্মতত্ত্বরূপ উৎকৃষ্ট বিষয়ের অল্প জ্ঞানে সন্তুষ্ট হওয়া উচিৎ নয়। এই জগৎ-সংসারে প্রায় সকলেই নিকৃষ্ট বিষয়ের প্রতি আগ্রহশীল। আত্মতত্ত্ববিষয়ক উৎকৃষ্ট বিষয়ে খুব অল্প সংখ্যক মানুষই কৌতূহল প্রদর্শন করেন। যে ব্যক্তিরা নিকৃষ্ট বিষয়কে শ্রেষ্ঠরূপে মনে করেন, তারা সেই সকল বিষয়বস্তু লাভ করতে সর্বাধিক ইচ্ছা প্রকাশ করে। যেমন, পাশা খেলা, জুয়া খেলা, মদ্যপান প্রভৃতি বিষয়ে যে ব্যক্তি অত্যধিক আসক্ত সেই ব্যক্তি স্ত্রী, সন্তান ও অন্যান্যদের কল্যাণ ত্যাগ করে ধ্বংস হয়ে যায়। সেই অসাধু ব্যক্তিরা মনে করে এটাই স্বর্গ-সুখ, কিন্তু তা নয়। কিন্তু নারদ প্রভৃতি মুমুক্ষুগণ সর্বদা উৎকৃষ্ট আত্মবিষয়ে ইচ্ছা প্রকাশ করেন। স্ত্রী, সন্তান প্রভৃতি বস্তুর এই ক্ষণস্থায়ী আনন্দভোগে তারা কখনই তৃপ্ত হয় না। সেই সমস্ত মুমুক্ষুগণ সর্বদা সচ্চিদানন্দস্বরূপ ব্রহ্মানন্দের রস গ্রহণে ইচ্ছুক। অতএব, প্রকৃত জ্ঞানী পুরুষেরা সর্বদা উৎকৃষ্ট পরব্রহ্মের প্রতি আগ্রহ দেখায় এবং নারদ প্রভৃতি তত্ত্বজ্ঞানীদের মতো মহাপুরুষেরা পরব্রহ্ম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে জীবনমুক্ত হয়ে যান। তাই আমাদেরও উচিৎ, অনন্ত সুখের জন্য সর্বদা ব্রহ্মের স্বরূপ অন্বেষণ করা উচিৎ এবং তার মাধ্যমে আমরাও জীবনমুক্ত হতে পারি।
৬. উপসংহার
উপসংহারে উপনীত হয়ে এটাই বলতে চাই—সর্বদা উৎকৃষ্ট বিষয়ে, উচ্চ বিষয়ে চিন্তা করলে উৎকৃষ্টবস্তুরই প্রাপ্তি ঘটবে। অনিত্য জগৎ-সংসারে স্ত্রী, পুত্র, ধনসম্পত্তি প্রভৃতি বৈষয়িক ভোগ ক্ষণিকের জন্য আনন্দ দায়ক হলেও তা কিন্তু অধোগতির দিকেই নিয়ে যায়। অপরদিকে, ব্রহ্মবিষয়ক সাধন পথ খুব সহজ নয়, কিন্তু ব্রহ্মজ্ঞান প্রাপ্তি হলে এই সংসারচক্রের বন্ধন থেকে সহজেই মুক্তি পাওয়া সম্ভব। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাতেও উক্ত আছে—
যত্তদগ্রে বিষমিব পরিণামেঽমৃতোপমম্।
তত্সুখং সাত্ত্বিকং প্রোক্তমাত্মবুদ্ধিপ্রসাদজম্॥[26]
বিষয়েন্দ্রিয়সংযোগাদ্যত্তদগ্রেঽমৃতোপমম্।
পরিণামে বিষমিব তত্সুখং রাজসং স্মৃতম্॥[27]
আরও একটি বিষয় হল, সর্বদা নিষ্কাম চিত্তে কর্ম করে যেতে হবে, তবেই নিজের মধ্যে চিত্তশুদ্ধির বিকাশ ঘটবে। চিত্তশুদ্ধির বিকাশ ঘটলে সহজেই পরব্রহ্মের নিকট, ঈশ্বরের নিকট অগ্রসর হতে পারব আমরা। মনুষ্য জীবনের উদ্দেশ্য হল ঈশ্বরলাভ। তাই সর্বদা জগৎ-কল্যাণে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে ঈশ্বর জ্ঞানে জীবসেবা করাই একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিৎ। তবেই কিন্তু এই সমাজ তথা বিশ্বের কল্যাণ সাধন হবে এবং মুক্তির পথ আরও সুগম হয়ে উঠবে।
সহায়ক গ্রন্থাবলী
১. স্বামী, জুষ্ঠানন্দ। কঠোপনিষদ্। প্রথম প্রকাশ- ২০০২, কোলকাতা।
২. শাস্ত্রী, এস.সুব্রহ্মণ্য । উপনিষদ্ভাষ্য (খণ্ডঃ ১)। মহেশ অনুসন্ধান সংস্থান, বারাণসী।
৩. যোগিন্দ্র, শ্রীসদানন্দ। বেদান্তসার। কালীবরবেদান্তবাগীশ–সংস্কৃতপুস্তকভাণ্ডার, কলকাতা, ১৯৯৫
৪. ভট্টাচার্য, রঘুনন্দন । স্মৃতিতত্ত্বম্ । জীবানন্দবিদ্যাসাগর, কলিকতা, ১৮৯৫
৫. ব্যাসদেব। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা শাঙ্করভাষ্য । গীতাপ্রেস, গোরখপুর- ১৯৮২
৬. গোয়ন্দকা, হরিকৃষ্ণদাস । ঈশাদি নৌ উপনিষদ্ । গীতাপ্রেস, গোরখপুর, ২০১০
৭. দশোপনিষদ্ । শাঙ্করভাষ্য । মোতিলাল ব্যানার্জী-দাস, দিল্লী, ১৯৬৪
৮. ছান্দোগ্যোপনিষদ্। গীতাপ্রেস, গোরখপুর
৯. স্বামী, বিশ্বরূপানন্দ। বেদান্তদর্শন। উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা। দ্বিতীয় সংস্করণ-২০০৯
১০. রায়, শ্রীনলিনীনাথ। ছান্দোগ্যোপনিষদ্। বসুমতী-সাহিত্য-মন্দির, কোলকাতা। দ্বিতীয় সংস্করণ
Website
https://upanishads.org.in/stories
https://en.wikipedia.org/wiki/Chandogya_Upanishad
https://advaitasharada.sringeri.net/display/moola/Chandogya
https://www.sanskritebooks.org/?s=Upanishad
https://www.advaita-vedanta.org/texts/shankara_works.html
https://sanskritdocuments.org/TextsElsewhere/
https://epustakalay.com/search_gcse/?q=upanishad#gsc.tab=0&gsc.q=upanishad&gsc.page=1
_________________________________________________________________________
[1]নির্বাণ.পূর্বা. ৬৬.৩
[2]ছান্দোগ্যোপনিষদ্ ৭.২৩.১
[3]ছান্দোগ্যোপনিষদ্ ৭.২৪.১
[4]ছান্দোগ্যোপনিষদ্ ৭.২৩.২
[5]ছান্দোগ্যোপনিষদ্ ৭.২৫.১
[6]ছান্দোগ্যোপনিষদ্ ৭.২৫.২
[7]ছান্দোগ্যোপনিষদ্ ৭.২৬.১
[8]ছান্দোগ্যোপনিষদ্ ৭.২৬.২
[9]ছান্দোগ্যোপনিষদ্ ৩.১৪.১
[10]মুণ্ডকোপনিষদ্ ২.১.১১
[11]ঐতরেয়োপনিষদ্ ৩.১.৩
[12]বৃহদারণ্যকোপনিষদ্ ১.৪.১০
[13]ছান্দোগ্যোপনিষদ্ ৬.৮.৭
[14]মাণ্ডূক্যোপনিষদ্ ২
[15]ব্রহ্মসূত্র ১.১.১
[16]বৃহদারণ্যকোপনিষদ্ ২.৪.৫
[17]ছান্দোগ্যোপনিষদ্ ৭.২৩.১
[18]ছান্দোগ্যোপনিষদ্ ৭.২৪.১
[19]ছান্দোগ্যোপনিষদ্ ৭.২৩.২
[20]ছান্দোগ্যোপনিষদ্ ৭.২৫.১
[21]ছান্দোগ্যোপনিষদ্ ৭.২৫.২
[22]ছান্দোগ্যোপনিষদ্ ৭.২৬.১
[23]ছান্দোগ্যোপনিষদ্ ৭.২৬.২
[24]নির্বাণ.পূর্বা. ৬৬.৩
[25]শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৪.৩৯
[26]শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১৮.৩৭
[27]শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১৮.৩৮
Authored by সদানন্দ দাস, পি. এইচ. ডি শোধছাত্র, অদ্বৈতবেদান্ত বিভাগ, রাষ্ট্রিয়-সংস্কৃত-বিশ্ববিদ্যালয়, তিরুপতি- ৫১৭৫০৭
Published by,