বৃহদারণ্যকোপনিষদের অন্তর্গত অজাতশত্রু-সংবাদের মাহাত্ম্য বর্ণনা ও সামাজিক প্রয়োজনীয়তা
প্রবন্ধের সারসংক্ষেপ
বৃহদারণ্যকোপনিষদের অন্তর্গত এই অজাতশত্রু-সংবাদে মূলত পরব্রহ্মের উপাসনা বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। এই উপাখ্যানে কাশীনরেশ অজাতশত্রুকে নিজের জ্ঞান প্রদর্শনের আকাঙ্ক্ষায় বালাকি নামের কোন একজন বাক্-চাতুর্য সম্পন্ন অল্পজ্ঞ ব্রাহ্মণ ধৃষ্টতাপূর্বক মূর্খতা প্রদর্শন করেছেন। অজাতশত্রুর দ্বারা উক্ত ব্রাহ্মণের যথোচিত সম্মানের মাধ্যমে অতিথিসত্কার প্রদর্শিত হয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে বালাকি ব্রাহ্মণের দ্বারা যে সমস্ত পরব্রহ্মবিষয়ক উপাসনা ব্যক্ত হয়েছে সেগুলি অজাতশত্রু কর্তৃক যুক্তিসঙ্গত ভাবে খণ্ডিত হয়েছে। অন্তিমে নিজের অজ্ঞতা স্বীকার করে বালাকি ব্রাহ্মণ অজাতশত্রুর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে এবং অজাতশত্রুর কাছ থেকেই বন্ধুত্বপূর্ণ ভাবে প্রকৃত তত্ত্বোপদেশ গ্রহণ করে সমৃদ্ধ হয়েছেন।
এই প্রবন্ধে এই অজাতশত্রু-সংবাদের উপাসনা-প্রতিপাদকত্ব নিরূপণের মাধ্যমে বর্তমানকালিক সামাজিক প্রয়োজনীয়তা বর্ণনা করা হয়েছে।
সূচক শব্দাবলী
অহংকার প্রদর্শন, অতিথি-সত্কার, বিনম্রতা প্রদর্শন, পরব্রহ্মের উপাসনা, প্রকৃত তত্ত্বের অনুসন্ধান, অজ্ঞানের নাশ, প্রকৃত ক্ষত্রিয়ের স্বধর্ম পালন, বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ, পরব্রহ্মের স্বরূপ ইত্যাদি।
গবেষণা পত্রের উদ্দেশ্য
বর্তমান সমাজে ভারতীয় সংস্কৃতি বিলুপ্তপ্রায়। উচিৎ-অনুচিৎ, হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে মানুষ আজ অরাজকতার রাজ্যে বসবাস করছে। ঋষি পরম্পরা অনুসারে প্রাপ্ত আচার-ব্যবহারের ঊর্দ্ধে উঠে গিয়ে ভাইয়ে ভাইয়ে দ্বন্দ্ব করছে, দেবতাতুল্য মাতা-পিতাকে অবজ্ঞার চোখে দেখছে, দেবতাতুল্য আচার্যগুরুর সম্মান হানি হচ্ছে, অসাধু ব্যক্তি মিথ্যা মায়ার জালে সাধারণ মানুষকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে, একে অপরের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ বেড়েই চলেছে। মানুষকে সৎ-বুদ্ধি দেওয়ার পরিবর্তে কু-পরামর্শ দিয়ে অন্ধকারের পথে ঠেলে দিচ্ছে মানুষই। তাই আবারও প্রয়োজন সেই আদর্শ ঋষি পরম্পরা, যার মাধ্যমে বর্তমান সমাজের মেরুদণ্ড সুদৃঢ় হয়ে উঠবে। সেইজন্য এই গবেষণা পত্রের মাধ্যমে সমস্ত অরাজকতার অবসান ঘটিয়ে এক সমুজ্জ্বল আদর্শের পথে বর্তমান সমাজকে ত্বরান্বিত করা এবং কল্যাণ সাধন করাই হল একমাত্র উদ্দেশ্য।
১. প্রস্তাবনা
বৃহদারণ্যকোপনিষদের দ্বিতীয় অধ্যায়ে ছয়টি ব্রাহ্মণ আছে, তাদের মধ্যে প্রথম থেকে তৃতীয় ব্রাহ্মণ পর্যন্ত “অজাতশত্রু-সংবাদ” নামক এই উপাখ্যানটি বর্ণিত আছে। দ্বিতীয়োঽধ্যায়ের প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ব্রাহ্মণে যথাক্রমে কুড়িটি, চারটি এবং ছয়টি করে মন্ত্র উপলব্ধ আছে। যথাক্রমে প্রথম ব্রাহ্মণটি ‘প্রথমমজাতশত্রুব্রাহ্মণম্’, দ্বিতীয় ব্রাহ্মণটি ‘শিশুব্রাহ্মণম্’ এবং তৃতীয় ব্রাহ্মণটি ‘মূর্তামূর্তব্রাহ্মণম্’ এই নামে প্রসিদ্ধ।
বস্তুতঃ আত্মা বিদ্যমান তাই তার উপাসনা করা উচিৎ “আত্মেত্যেবোপাসীত”[1] এই শ্রুতিবাক্যের দ্বারা স্পষ্টভাবে জানা যায়। আত্মতত্ত্ব সবকিছু অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতম সেইজন্য তার অন্বেষণ করা উচিৎ। আত্মা ভিন্ন এই জগতে যা কিছু বিদ্যমান সেগুলি সবই অনিত্য। এই উপাখ্যানে আত্মতত্ত্বোপদেশের জন্য বক্তা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে বাক্-চাতুর্য সম্পন্ন গার্গ্য ব্রাহ্মণকে এবং শ্রোতা হিসাবে নির্বাচন করা হয়েছে অজাতশত্রুকে। আত্মতত্ত্ব অতীব দুর্বিজ্ঞেয় ও সূক্ষ্মস্বরূপ, সেইহেতু এইরূপ পূর্বপক্ষ এবং সিদ্ধান্তপক্ষের যুক্তিতর্কের মাধ্যমে আত্মোপাসনার গূঢ় তত্ত্ব প্রতিস্থাপিত করা হয়েছে। ব্রহ্মজ্ঞানে শ্রদ্ধাই হল এই আখ্যায়িকার পরম সাধনের বিষয়। এই আখ্যায়িকাতে ব্রাহ্মণ ও অজাতশত্রুর আত্মতত্ত্ববিষয়ে অতীব শ্রদ্ধা পরিলক্ষিত হয়েছে।
২. উপাখ্যানের সারাংশ
ভারতবর্ষে কোন এক সময় বালাকি নামের একজন ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ছিলেন। তিনি গর্গ-বংশে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন বলে গার্গ্য-বালাকি অথবা গার্গ্য নামে প্রসিদ্ধ ছিলেন। বালাকি বিবিধ উপাসনা পরায়ণ ছিলেন। এই অবিদ্বান্ অব্রহ্মবিদ্ বালাকি অহংকারের প্রতিমূর্তি এবং অত্যন্ত বাগ্মী ছিলেন।
কোন একদিন ঐ অহংকারী ব্রাহ্মণ নিজের জ্ঞান প্রদর্শনের জন্য কাশীনরেশ অজাতশত্রুর কাছে উপস্থিত হলেন। রাজা অজাতশত্রু প্রকৃত ব্রহ্মজ্ঞানী হওয়া সত্ত্বেও বাহ্যিকভাবে নিজেকে অজ্ঞানী হিসেবে প্রকাশ করতেন। প্রজাপালনে কোনরকম কার্পণ্য প্রদর্শন করতেন না। এই অজাতশত্রু সম্পর্কে বিস্তারিত না জেনেই তাঁকে তত্ত্বোপদেশ প্রদানে উদ্যত হলেন বালাকি ব্রাহ্মণ এবং বললেন—‘আমি তোমাকে ব্রহ্মের উপদেশ প্রদান করব।’ ব্রাহ্মণের মুখ থেকে ব্রহ্মতত্ত্বের উপদেশ প্রাপ্তির কথা শুনে রাজা অজাতশত্রু অত্যন্ত প্রসন্ন হলেন এবং আগত ব্রাহ্মণের বিধিপূর্বক অতিথি-সৎকার করে সম্মান প্রদর্শন করলেন। রাজা ভাবলেন যে এটাই উত্তম সুযোগ রাজা জনকের থেকেও নিজেকে অধিক ব্রহ্মজ্ঞানে সমৃদ্ধ করার। কেননা প্রায় সকলেই সেই জনক রাজাকেই উত্তম ব্রহ্মজ্ঞ হিসেবে সম্মান করে তাঁর কাছে গমন করে।
তারপর রাজা অজাতশত্রু এবং পণ্ডিত বালাকি উভয়ে আসন গ্রহণ করে আলোচনা-পর্ব শুরু করলেেন। গার্গ্য বালাকি বললেন—‘যে পুরুষ এই আদিত্যে বিদ্যমান আমি তাঁকে ব্রহ্মরূপে উপাসনা করি, অতএব তুমিও তাঁরই উপাসনা করো।’ কিন্তু অজাতশত্রু এই উপদেশের মধ্যে নূতনত্ব কিছু খুঁজে না পেয়ে বিনয়ের সাথে বললেন—‘এইরকম বলা উচিৎ নয়, কারণ আমিও আদিত্যে উপাসনা করি। কিন্তু আপনি যেভাবে করেন সেভাবে নয়। কেননা সূর্য কেবল একটি সাপেক্ষরূপ এবং আপনি এই সাপেক্ষরূপকেই নিরপেক্ষ মনে করছেন। এইরকম ধ্যান করা কখনই উচিৎ নয়। এই আদিত্য সর্বশ্রেষ্ঠ, সর্বভূতের মূর্দ্ধা এবং দীপ্তিমান। এইরূপে আমি তার উপাসনা করি। যিনি এই প্রকারে উপাসনা করেন তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ, সর্বভূতের মূর্দ্ধা ও দীপ্তিমান হন।’
এইভাবে আদিত্য বিষয়ে প্রত্যাখ্যানের পর চন্দ্র-বিষয়ে গার্গ্য বললেন—‘চন্দ্রে যে পুরুষ বিদ্যমান তাকেই আমি ব্রহ্মরূপে উপাসনা করি।’ পূর্ববৎ রাজা অসম্মতি প্রকাশ করে বললেন—‘না, এই পুরুষ বিষয়ে উপদেশ দেবেন না। “ইনি মহান্, শ্বেতবাস, সোমরাজা”—এইভাবেই আমি চন্দ্রের উপাসনা করি। যিনি এইরূপ উপাসনা করেন তার গৃহে অহরহ সুত ও প্রসূত সম্পন্ন হয় এবং তাঁর কখনও অন্নের ক্ষয় হয় না।’
তারপর গার্গ্য বললেন—‘বিদ্যুতে যে পুরুষ বিদ্যমান আমি তাঁকেই ব্রহ্মরূপে উপাসনা করি।’ অজাতশত্রু বললেন—‘না, এই পুরুষ বিষয়ে উপদেশ দেবেন না। “ইনি তেজস্বী”—এইভাবেই আমি উপাসনা করি। যিনি এইরূপ উপাসনা করেন তিনি তেজস্বী হন এবং তাঁর সন্ততিও তেজস্বী হয়’।
গার্গ্য বললেন—‘আকাশে বিদ্যমান পুরুষকে আমি ব্রহ্মরূপে উপাসনা করি’। রাজা বললেন—‘না, এই বিষয়েও উপদেশ দেবেন না। “ইনি পূর্ণ ও অচঞ্চল”—এইভাবে আমি বিদ্যুতের উপাসনা করি। যিনি এইরূপ উপাসনা করেন তিনি সন্ততি ও পশু সমূহে পূর্ণ হন এবং এ জগতে তাঁর সন্ততির কখনও উচ্ছেদ হয় না’।
এইভাবে প্রত্যেকবারই রাজা অজাতশত্রু সেই ব্রাহ্মণের দ্বারা উত্থাপিত উপাসনা সকলের নিরাকরণের মাধ্যমে সেই সেই উপাসনার লৌকিক ফল গুলিকেই প্রকাশ করলেন। যথা—
বায়ুতে বিদ্যমান পুরুষকে যিনি ব্রহ্মরূপে উপাসনা করেন তিনি জয়শীল, অজেয় এবং শত্রুঞ্জয় হবেন।
অগ্নিতে বিদ্যমান পুরুষকে যিনি ব্রহ্মরূপে উপাসনা করেন তিনি বিষাসহি হন এবং তার সন্তানও বিষাসহি হয়।
জলে বিদ্যমান পুরুষকে যিনি ব্রহ্মরূপে উপাসনা করেন তাঁর নিকট অনুকূল বিষয়ই গমন করে, প্রতিকূল বিষয় গমন করে না। আর এর থেকে প্রতিরূপ সন্তান উৎপন্ন হয়।
দর্পণে বিদ্যমান পুরুষকে যিনি ব্রহ্মরূপে উপাসনা করেন তিনি রোচিষ্ণু হন, তাঁর সন্তানও রোচিষ্ণু হয় এবং তিনি যাদের সহিত সম্মিলিত হন তিনি তাদের সকলের অপেক্ষা অধিকতর দীপ্তিশীল হন।
প্রাণে বিদ্যমান পুরুষকে যিনি ব্রহ্মরূপে উপাসনা করেন তিনি ইহলোকে পূর্ণায়ু প্রাপ্ত হন এবং সময়ের পূর্বে প্রাণ তাঁকে ত্যাগ করে না।
দিক্-সমূহে বিদ্যমান পুরুষকে যিনি ব্রহ্মরূপে উপাসনা করেন তিনি দ্বিতীয়রূপ অর্থাৎ সহায়যুক্ত হন এবং তা থেকে স্বজন ছিন্ন হয় না।
ছায়াময় পুরুষকে যিনি ব্রহ্মরূপে উপাসনা করেন তিনি ইহকালে পূর্ণায়ু প্রাপ্ত হন এবং সময়ের পূর্বে মৃত্যু তাঁর নিকটে আগমন করে না।
আত্মাতে বিদ্যমান পুরুষকে যিনি ব্রহ্মরূপে উপাসনা করেন তিনি আত্মবান হন এবং তাঁর সন্তানও আত্মবান হয়।
এইরূপ বাক্-বিতণ্ডার পর বালাকি ব্রাহ্মণ মৌনভাব অবলম্বন করলেন। অজাতশত্রু তাকে স্পষ্টভাবে জানালেন যে, কেবলমাত্র এই স্বল্প পরিমাণ জ্ঞানের দ্বারা পরব্রহ্ম বিষয়ে পূর্ণরূপে জানা অসম্ভব। সেইহেতু অধিক জ্ঞানের প্রয়োজন। তখন বাহ্মণের পাহাড়-প্রমাণ অহংকার হিমখণ্ডের ন্যায় চূর্ণিত হল তার নিজেরই অজ্ঞতার পরিচয়ের মাধ্যমে। তারপর অধিক জ্ঞান-প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষায় অজাতশত্রুর কাছে শিষ্যত্ব গ্রহণ করে তত্ত্বোপদেশ প্রদানের জন্য করুণ আর্তি জানালেন সেই ব্রাহ্মণ।
গার্গ্য বালাকি একজন ব্রাহ্মণ ছিলেন এবং অজাতশত্রু একজন রাজা। একজন ক্ষত্রিয় কোন ব্রাহ্মণের গুরু হতে পারে না। তাই অজাতশত্রু নিজের সীমা লঙ্ঘন করে বালাকি ব্রাহ্মণের গুরু হতে সংকোচ অনুভব করলেন। কিন্তু রাজা সেই ব্রাহ্মণকে অজ্ঞানের অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলোতে ফিরিয়ে আনার জন্য তত্ত্বোপদেশ দিতে রাজি হলেন। সুতরাং, অজাতশত্রু একজন বন্ধুর মতো সেই বালাকি ব্রাহ্মণের হাত ধরে নির্জনে গিয়ে জাগ্রত-স্বপ্ন-সুষুপ্তি—এই অবস্থাত্রয় বর্ণনার মাধ্যমে বালাকি ব্রাহ্মণকে ব্রহ্মোপদেশ প্রদান করলেন। ব্রাহ্মণ বালাকিও সেই তত্ত্বোপদেশ বিনম্রতা পূর্বক গ্রহণ করে সমৃদ্ধ হলেন।
৩. উপাখ্যানের বৈশিষ্ট্য
চতুর্বেদের মধ্যে যজুর্বেদ অন্যতম। যজুর্বেদের সহস্রশাখা বিদ্যমান আছে। তাদের মধ্যে শুক্লযজুর্বেদীয় বাজসনেয়ি-শাখার অন্তর্গত বৃহদারণ্যকোপনিষদের দ্বিতীয়োঽধ্যায়ে ছয়টি ব্রাহ্মণের মধ্যে প্রথম থেকে তৃতীয় ব্রাহ্মণ জুড়ে এই অজাতশত্রুসংবাদের বিস্তার রয়েছে। উপাখ্যানটির মহদ্বৈশিষ্ট্য হল—এই উপাখ্যানটি উপাসনা বিষয়ক। এই উপাখ্যানের প্রথমদিকে উপাসনাতত্ত্ব প্রতিপাদন করার পর ব্রহ্মস্বরূপাদি বিষয়ে বিশদে বর্ণনা করা হয়েছে। বস্তুতঃ অব্রহ্মবিদ্ বালাকির অজ্ঞানবশতঃ যে অহংকার প্রদর্শিত হয়েছে তা অজাতশত্রু দ্বারা দূরীভূত হয়েছে এবং অজাতশত্রু ব্রাহ্মণের নিম্নবর্গীয় হওয়া সত্ত্বেও একজন ক্ষত্রিয় হিসাবে জ্ঞানপিপাসু ব্রাহ্মণের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের সহিত তত্ত্বোপদেশ প্রদান করেন। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এখানে এটাই প্রতীত হয় যে সকল জীবই সমান, সকলের মধ্যেই ঈশ্বর বিরাজমান।
৪. উপাখ্যানের উপাসনা-প্রতিপাদকত্ব নিরূপণ
এই উপাখ্যানটি কেন উপাসনা প্রতিপাদনকারী সে বিষয়ে বলা হচ্ছে—অল্পজ্ঞ বালাকি এবং অজাতশত্রুর মধ্যে ব্রহ্মজ্ঞান নিমিত্ত আদিত্য-চন্দ্র-বিদ্যুৎ-আকাশাদি প্রভৃতি উপাসনা বিষয়ক আলোচনা উপাখ্যানের প্রথমদিকেই দৃষ্ট হয়েছে। যথা—“য এবাসাবাদিত্যে পুরুষ এতমেবাহং ব্রহ্মোপাস ইতি...”[2], “য এবাসৌ চন্দ্রে পুরুষ...”[3], “য এবাসৌ বিদ্যুতি পুরুষ...”[4], “য এবায়মাকাশে পুরুষ...”[5] ইত্যাদি বৃহদারণ্যক শ্রুতিবাক্যগুলির দ্বারা স্পষ্ট বোঝা যায়। আরও দৃষ্টান্ত যেমন—কোন ব্যক্তি উক্ত উপাসনাগুলির দ্বারা যদি উপাসনা করে তাহলে তার মোক্ষ প্রাপ্তি ও ব্রহ্মলোকপ্রাপ্তি হবে। কখনই সেই পুরুষের ইহ-জগতে পুনরাগমন সম্ভব হবে না। এই সমস্ত দৃষ্টান্ত থেকে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে এই উপাখ্যানটি উপাসনাবিষয়ক তত্ত্বকে প্রতিপাদন করছে।
৫. অদ্বৈতবেদান্তের মূলতত্ত্ব প্রতিপাদনে যোগদান এবং সামাজিক প্রয়োজনীয়তা
অদ্বৈতবেদান্তের মূলতত্ত্ব প্রতিপাদনে এই উপাখ্যানের যোগদান ও সামাজিক প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে যথাসাধ্য প্রতিপাদন করছি—
৫.১. অদ্বৈতবেদান্তের মূলতত্ত্ব প্রতিপাদনে যোগদান
অদ্বৈতবেদান্তের মূলতত্ত্ব প্রতিপাদনে এই উপাখ্যানের যোগদান অনস্বীকার্য। এই উপাখ্যানে ব্রহ্মজ্ঞান নিমিত্ত আদিত্য-চন্দ্র-বিদ্যুৎ-আকাশাদি প্রভৃতি উপাসনা বিষয়ক আলোচনা দৃষ্ট হয়েছে। অদ্বৈতবেদান্তশাস্ত্রেও এই সমস্ত বিষয়ে বিবিধ বিচারের উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন—“অয়মাদিত্য সর্বেষাং ভূতানাং মধ্বস্যাদিত্যস্য...”[6], “অথাধিদৈবতং য এবাসৌ তপতি তমুগদ্গীথমুপাসীতোদ্যন্বা...”[7], “অয়মাকাশঃ সর্বেষাং ভূতানাং মধ্বস্যাকাশস্য...”[8], “সর্বাস্বপ্সু পঞ্চবিধংসামোপাসীত...”[9], “স্বর্গে লোকে ন ভয়ং কিঞ্চনাস্তি...”[10] ইত্যাদি। এই উপাখ্যানে জাগ্রৎ-স্বপ্ন-সুষুপ্তি অবস্থাত্রয় বিষয়ে এবং হৃদয়পুরুষ বিষয়ে সবিস্তারে বর্ণনা করা হয়েছে। অন্তিমে ব্রহ্মস্বরূপ বিষয়েও বলা হয়েছে যে, পরমাত্মা থেকেই সমস্ত জীব-জগতের উৎপত্তি ঘটেছে এবং প্রলয়কালে সেই পরমাত্মাতেই বিলীন হয়ে যাবে সমস্ত কিছু। এই সকল বিষয়ই অদ্বৈতবেদান্ত-শাস্ত্রের বহু স্থানে বিচারিত হয়েছে। যেমন বিদ্যারণ্যমুনি বিরচিত পঞ্চদশীগ্রন্থে উল্লেখ পাওয়া যায়—“শব্দস্পর্শাদয়ো বেদ্যা বৈচিত্র্যাজ্জাগরে পৃথক্”[11], “তথা স্বপ্নেঽত্র বেদ্যং তু ন স্থিরং জাগরে স্থিরম্।”[12], “সুপ্তোত্থিতস্য সৌষুপ্ততমোবোধো ভবেৎ স্মৃতিঃ”[13] ইত্যাদি। অতএব নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, অদ্বৈতবেদান্তের মূলতত্ত্ব প্রতিপাদনে এই উপাখ্যানের মহৎ যোগদান আছে।
৫.২. উপাখ্যানের সামাজিক প্রয়োজনীয়তা
সম্প্রতি এই উপাখ্যানের সামাজিক প্রয়োজনীয়তা ঠিক কতটুকু, সে বিষয়ে সবিস্তরে আলোকপাত করার চেষ্টা করছি। এই জগৎ-সংসারে একটি সুপ্রসিদ্ধ নিয়ম সুবিদিত যে, যতক্ষণ পর্যন্ত কোন ব্যক্তির মধ্যে কোন বিষয়ে জিজ্ঞাসার উদ্রেক না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত তার উদ্দেশ্যে কোন উপদেশ দেওয়া ঠিক নয়। যদি এমন অবস্থায় উপদেশ দেওয়াও হয় তাহলে সেই উপদেশের কোনও মূল্য থাকবে না এবং যে ব্যক্তি উপদেশ দেবেন তিনিও অসম্মানিত হবেন সেই ব্যক্তির দ্বারা। যেমন এই অজাতশত্রু-উপাখ্যানে স্পষ্টভাবে দেখা গেছে যে, ব্রাহ্মণ বালাকি নিজের পাণ্ডিত্য প্রদর্শনের আকাঙ্ক্ষায় অজাতশত্রুকে তত্ত্বোপদেশ প্রদান করেছেন কিন্তু সেই উপদেশ রাজার কাছে গুরুত্বপূর্ণ না হওয়ায় তা নিরাকৃত হয়েছে। তাই এর থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিৎ যে, কখনই নিজে থেকে এগিয়ে গিয়ে কোন ব্যক্তিকে নিজের পাণ্ডিত্য প্রদর্শন করা উচিৎ নয়।
এই উপাখ্যান থেকে আরও একটি শিক্ষা নেওয়া উচিৎ, সেটি হল—কোন বিষয়ে যদি যথার্থ জ্ঞানের অভাব থাকে তাহলে সেই বিষয়ে কখনই অধিক ভাষণ দেওয়া শোভনীয় নয়। বাংলায় একটি প্রবাদবাক্য আছে—“অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করী” অর্থাৎ সম্পূর্ণ জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও পণ্ডিতের মতো আচরণ করলে তা ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে। এই অল্পজ্ঞ মূঢ়মতি ব্যক্তিরা সর্বদা অপর ব্যক্তিকে অজ্ঞানী, মূর্খ ইত্যাদি রূপে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করে। বস্তুতঃ এইরূপ আচরণের দ্বারা তার নিজেরই মূর্খতা প্রকাশ পায়। এই উপাখ্যানেও দেখতে পাচ্ছি আমরা যে, অল্পজ্ঞ, অব্রহ্মবিদ্, অহংকারী বালাকি নিজের পাণ্ডিত্য প্রদর্শনের আকাঙ্ক্ষায় কাশীনরেশ অজাতশত্রুকে তত্ত্বোপদেশ দিতে উদ্যত হয়েছিলেন কিন্তু শেষে অজাতশত্রু তার পাণ্ডিত্যের অহংকারকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিলেন যুক্তিতর্কের মাধ্যমে। অহংকারের সাথে সাথে সেই ব্রাহ্মণের সম্মানও কিছুটা হলেও রাজার চোখে খর্ব হল। তাই আমাদেরও উচিৎ আমরা যেন কখনই অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করীর রূপ না ধারণ করি, তাতে সমাজের পক্ষেও ক্ষতিকর এবং নিজের পক্ষেও ক্ষতিকর। অহংকার বিষয়ে চাণক্যসূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়—“নাস্তি অহংকার সমঃ শত্রু”[14] অর্থাৎ অহংকারের থেকে বড়ো শত্রু আর কেউ নেই। অতএব সর্বদা অহংকার বর্জন করাই শ্রেয়।
এই উপাখ্যানে আরও দেখতে পাওয়া যায় যে, বালাকি ব্রাহ্মণ যে সমস্ত উপদেশ প্রদান করেছিলেন সেগুলি যুক্তিযুক্ত কিনা তা বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে গ্রহণ করেছিলেন রাজা অজাতশত্রু। বর্তমান সমাজেও দেখা যায় যে, যে কেউ এসে আমাদেরকে যা কিছু উপদেশ দিয়ে চলে যায়, আর আমরা সেই উপদেশ গ্রহণ করে জীবনে অগ্রসর হই। একবারও সেই উপদেশ সম্পর্কে বিচার করি না যে, সেটি আমার পক্ষে ঠিক নাকি ভুল। এই বিচার করার ক্ষমতা নেই বলেই আমরা আজ সমাজে বিপন্ন। নিষ্ঠুর অসাধু ব্যক্তিরা সর্বদা তাদের মিথ্যা কথার জালে ফাঁসিয়ে চাকুরি বা কোন কাজ পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমাদের কাছ থেকে লক্ষাধিক টাকা আত্মসাৎ করে। সেই প্রলোভনে অন্ধের মতো পাদ সঞ্চালন করে অতল গভীরে তলিয়ে গিয়ে সমস্ত ধনসম্পত্তি, মান-সম্মান সেই নরকের কীটেদর হাতে সমর্পণ করে দিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাই। এইভাবে সহজ-সরল মানুষেরা প্রতারকদের দ্বারা সর্বস্ব লুণ্ঠিত হয়ে, অপমানিত হয়ে বেঁচে থাকার শেষ ইচ্ছাটুকু ত্যাগ করে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়। হাজার হাজার অসহায় মানুষ বাঁচার আশা হারিয়ে ফেলে। এর ফলে বর্তমান সমাজের উপর যে খারাপ প্রভাব পরে তা খুবই শোচনীয়। অতএব সর্বদা আমাদের উচিৎ, যে কোন বিষয়ে সর্বদা বিচার-বিশ্লেষণ করে তবেই অগ্রসর হওয়া উচিৎ, না হলে নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনব।
এই উপাখ্যান থেকে আরও একটি শিক্ষা নেওয়া উচিৎ, সেটি হল—জাতি-ধর্ম-বর্ণ ইত্যাদির নিরিখে কখনই একজন যথার্থ শিক্ষাগুরুর মান নির্ণয় করা উচিৎ নয়। আবার একজন অল্পবয়স্ক পণ্ডিতও বৃদ্ধব্যক্তিদের শিক্ষাগুরু হতে পারেন, যদি তার মধ্যে যথার্থ জ্ঞান থেকে থাকে। এই জগৎ-সংসারে আমারা যে কারুর কাছ থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করি না কেন তাঁরা সকলেই আমাদের কাছে পূজনীয় শিক্ষাগুরু। সেই সমস্ত শিক্ষাগুরুর প্রতি সর্বদা সম্মান প্রদর্শন করা উচিৎ। যেমন—শুক্রাচার্য, দ্রোণাচার্য প্রভৃতি যথার্থ শিক্ষাগুরুর প্রতি অর্জুনাদি প্রভৃতি শিষ্যগণের সম্মান প্রদর্শন সর্বজনবিদিত। সেইজন্য বলা হয়—
গুরুর্ব্রহ্মা গুরুর্বিষ্ণুঃ গুরুর্দেবো মহেশ্বরঃ।
গুরুঃ সাক্ষাৎ পরং ব্রহ্ম তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ॥
৬. উপসংহার
উপসংহারে উপনীত হয়ে এটাই বলতে চাই—এই জগৎ-সংসারে সমাজের কল্যাণের জন্য, তথা নিজের কল্যাণের জন্য সর্বদা জ্ঞানপিপাসু ব্যক্তিকেই তত্ত্বোপদেশ দেওয়া উচিৎ। কখনই অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করীর ন্যায় আচরণ করা উচিৎ নয়, কারণ অপরের মর্যাদার সাথে সাথে নিজের আত্মসম্মানও সর্বদা বজায় রাখা উচিৎ। যে কোন বিষয় বা বস্তু গ্রহণ করার আগে সেই বিষয়ে বিচার-বিশ্লেষণ অবশ্যই করা উচিৎ, নাহলে সমূহ বিপদের কবলে নিজেদেরকেই পড়তে হবে। সর্বদা শিক্ষাগুরুর সম্মান করা উচিৎ, কারণ শাস্ত্রে বলে—“আচার্যদেবো ভব”[15]।
আরও একটি বিষয় হল—যদি কেউ সত্যিই তত্ত্ব-জিজ্ঞাসু হয় তাহলে তার জ্ঞান-পিপাসা মেটানোর জন্য এবং সর্বদা সেই ব্যক্তিকে অন্ধকার-কূপ থেকে তুলে এনে জ্ঞানের সাগরে নিমজ্জিত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে। যেমন ভাবে উপাখ্যানে রাজা অজাতশত্রু বালাকির অজ্ঞান নাশ করে তাকে জ্ঞানের আলোকে প্রবেশ করালেন। আমরাও যদি সর্বদা এইভাবে প্রচেষ্টা করি তাহলে বর্তমান সমাজে চিরকালের জন্য অজ্ঞানের অন্ধকার দূরীভূত হয়ে জ্ঞানের সূর্য উদিত হবে এবং সমাজের কল্যাণ সাধনও ঘটবে এটা আমি মনে করি।
সহায়ক গ্রন্থাবলী
১. স্বামী, জুষ্ঠানন্দ। কঠোপনিষদ্। প্রথম প্রকাশ- ২০০২, কোলকাতা।
২. শাস্ত্রী, এস.সুব্রহ্মণ্য । উপনিষদ্ভাষ্য (খণ্ডঃ ১)। মহেশ অনুসন্ধান সংস্থান, বারাণসী।
৩. যোগিন্দ্র, শ্রীসদানন্দ। বেদান্তসার। কালীবরবেদান্তবাগীশ–সংস্কৃতপুস্তকভাণ্ডার, কলকাতা, ১৯৯৫
৪. ভট্টাচার্য, রঘুনন্দন । স্মৃতিতত্ত্বম্ । জীবানন্দবিদ্যাসাগর, কলিকতা, ১৮৯৫
৫. ব্যাসদেব। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা শাঙ্করভাষ্য । গীতাপ্রেস, গোরখপুর- ১৯৮২
৬. গোয়ন্দকা, হরিকৃষ্ণদাস । ঈশাদি নৌ উপনিষদ্ । গীতাপ্রেস, গোরখপুর, ২০১০
৭. দশোপনিষদ্ । শাঙ্করভাষ্য । মোতিলাল ব্যানার্জী-দাস, দিল্লী, ১৯৬৪
৮. ছান্দোগ্যোপনিষদ্। গীতাপ্রেস, গোরখপুর
৯. স্বামী, বিশ্বরূপানন্দ। বেদান্তদর্শন। উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা। দ্বিতীয় সংস্করণ-২০০৯
Website
https://upanishads.org.in/stories
https://en.wikipedia.org/wiki/Chandogya_Upanishad
https://advaitasharada.sringeri.net/display/moola/Chandogya
https://www.sanskritebooks.org/?s=Upanishad
https://www.advaita-vedanta.org/texts/shankara_works.html
https://sanskritdocuments.org/TextsElsewhere/
https://epustakalay.com/search_gcse/?q=upanishad#gsc.tab=0&gsc.q=upanishad&gsc.page=1
[1]বৃহদারণ্যকোপনিষদ্ ১.৪.৭
[2]বৃহদারণ্যকোপনিষদ্ ২.১.২
[3]বৃহদারণ্যকোপনিষদ্ ২.১.৩
[4]বৃহদারণ্যকোপনিষদ্ ২.১.৪
[5]বৃহদারণ্যকোপনিষদ্ ২.১.৫
[6]বৃহদারণ্যকোপনিষদ্ ২.৫.৫
[7]ছান্দোগ্যোপনিষদ্ ১.৩.১
[8]বৃহদারণ্যকোপনিষদ্ ২.৫.১০
[9]ছান্দোগ্যোপনিষদ্ ২.৪.১
[10]কঠোপনিষদ্ ১.১.১৩
[11]পঞ্চদশী তত্ববিবেকপ্রকরণ. ৩
[12]পঞ্চদশী তত্ববিবেকপ্রকরণ. ৪
[13]পঞ্চদশী তত্ববিবেকপ্রকরণ. ৫
[14]চাণক্যসূত্র ২৮৭
[15]তৈত্তিরীয়োপনিষদ্ ১.১১.২
Authored by সদানন্দ দাস, পি. এইচ. ডি শোধছাত্র, অদ্বৈতবেদান্ত বিভাগ, রাষ্ট্রিয়-সংস্কৃত-বিশ্ববিদ্যালয়, তিরুপতি- ৫১৭৫০৭
Published by,