রাধানাথ শিকদার – পাদপ্রদীপের অন্ধকারে উপেক্ষিত এক বাঙালি মানচিত্রবিদ
সারসংক্ষেপ :
ইংরেজ শাসিত ভারতবর্ষে প্রথম ভারতীয় বিজ্ঞানী রাধানাথ শিকদার। অথচ ভারতের বিজ্ঞান-ইতিহাসে অবহেলিত, উপেক্ষিত ও বিস্মৃত। বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী রাধানাথ শিকদার ছিলেন ওঁর যুগে ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ গণিতবিদ। সেইসঙ্গে ছিলেন জরিপবিদ্, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও আবহাওয়াবিদ। তাঁর নির্ভুল গণনায় নির্ধারিত হয়েছিল হিমালয়ের সুউচ্চ বিন্দু ‘এভারেস্ট’। যদিও তাঁর এই অবদানের সঠিক স্বীকৃতি আজও মেলেনি এবং এ নিয়ে পণ্ডিতসমাজে বিতর্ক বহুল মাত্রায় বিদ্যমান। প্রকৃতপক্ষে আলোচ্য এই প্রবন্ধটিতে রাধানাথ শিকদারের পাণ্ডিত্যের বিভিন্ন দিক তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।
মূল শব্দ : রাধানাথ শিকদার, মানচিত্র নির্মাণবিদ্যা, জরিপবিদ্যা, মাউণ্ট এভারেস্ট, আবহাওয়াবিদ্যা
দিনের পথিক মনে রেখো
আমি চলেছিলেম রাতে
সন্ধ্যা প্রদীপ নিয়ে হাতে।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলাকে কেন্দ্র করে যে নবজাগরণের ঢেউ উঠেছিল, তার সঙ্গে ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বাঙালির বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও অভূতপূর্ব সাফল্য দেখা দিয়েছিল। ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে প্রথম ত্রিকোণমিতিক জরিপের (Trigonometrical Survey) কাজ শুরু হয়েছিল ১৮০২ খ্রিস্টাব্দে। প্রকৃতপক্ষে ইংরেজদের হাত ধরেই ভারতবর্ষে আধুনিক জরিপের কাজ শুরু হয়েছিল। উল্লেখ্য, এই বিশাল কর্মকাণ্ডে এমন কিছু মানুষ অসামান্য অবদান রেখেছিলেন, যাঁদের কথা না বললে ভুল হবে। এঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন রাধানাথ শিকদার (১৮১৩-১৮৭০)। ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের হাত ধরেই আধুনিক মানচিত্রায়নের কাজ আরম্ভ হয়েছিল। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভ করার পর ইংরেজরা উপলব্ধি করেছিল যে, ভৌগোলিক বৈচিত্র্যপূর্ণ ভারতবর্ষে যদি দীর্ঘদিন ধরে শাসন করতে হয়, তাহলে প্রথমেই দরকার ভারতবর্ষের ভূগোলকে সঠিকভাবে জানতে হবে। আর এরই ফলস্বরূপ শুরু হয়েছিল জরিপের কাজ। রাধানাথ শিকদার-ই হলেন প্রথম ভারতীয়, যিনি জরিপ বিভাগে যোগদান করেছিলেন।১ ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দের ১লা জুলাই জর্জ এভারেস্ট বড়লাট বেণ্টিঙ্কের কাছে চিঠি লিখে জরিপ ক্ষেত্রের এক নতুন পদ্ধতি কোলবি বার (Colby bar) বা কম্পেন্সেটিং বার সিস্টেম চালু করার অনুমতি চেয়েছিলেন।২ আর এই নতুন পদ্ধতিতে শিক্ষানবিশির জন্য ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দের ১৯শে ডিসেম্বর রাধানাথ শিকদার সার্ভে অফ ইণ্ডিয়া-তে (Survey of India) যোগদান করেন। এ প্রসঙ্গে রাধানাথ শিকদার তার ডায়েরিতে লিখেছেন :
১৮৩২ সালে আমি Great Trigonometrical Survey of India অফিসে কমপিউটর পদে নিযুক্ত হইয়া আরও গণিত সম্বন্ধীয় গ্রন্থ অভ্যাস করি। এক্ষণে (৭ই অক্টোবর ১৮৩২) আমি Surveyor নিযুক্ত হইয়া Serunge Base Line-এ কার্য্য করিবার নিমিত্ত কলিকাতা হইতে ১৫ই অক্টোবর যাত্রা করিব। সেই প্রথম একজন ‘উচ্চবংশীয় নেটিব’ ঐ কাজের যোগ্য বলে বিবেচিত হল। উত্তর কলকাতার ব্যারাকপুর ট্রাঙ্ক রোডের দুই প্রান্তে পাঁচ এবং এগার মাইল স্টোনে নির্মিত দুটি টাওয়ার থেকে উভয় গম্বুজের বেসলাইন পরিমাপ করে রাধানাথ শিকদারের হাতেখড়ি হল।৩
গ্রেট আর্ক নিয়ে কাজ করার সময় ওয়া (Waugh) ও রেনি (Renny) যখন উইলিয়াম রোজেনরোড-এর সঙ্গে একত্রে কাজে যোগ দিতে গিয়েছিলেন তখন তাঁরা রাধানাথ শিকদার ও মার্টিনকে সঙ্গে নিয়েছিলেন। এঁরা রাধানাথ শিকদার সম্পর্কে যা বলেছিলেন তা হল :
Baboo Radhanath Sicdar … obedient and sober … but, while he possesses excellent principles and an active mind … he is so young and informed in character that the constant stimuli of praise and success are required to ensure attention to the details of his duty. He is readily daunted by difficulties … we, however, conceive that with good and strict management his character will gradually form … as to his intelligence, readiness, and general capacity, … he is very intelligent, quick, and zealous, and when successful or excited by praise – regardless of personal labour and inconvenience …৪
১৮৫১ সালে প্রকাশিত হয়েছিল R. Smyth ও H.L. Thuillier সংকলিত Manual of Surveying for India নামক গ্রন্থটি। এই গ্রন্থটি ছিল ভারতবর্ষের জরিপ সম্পর্কিত প্রথম গ্রন্থ। এই গ্রন্থটির তৃতীয় ও পঞ্চম অংশটি লেখার জন্য রাধানাথ শিকদারের সাহায্য নেওয়া হয়েছিল। বলা ভালো, পঞ্চম অংশটি লিখেছিলেন রাধানাথ শিকদার। সেহেতু গ্রন্থটির ভূমিকা অংশে রাধানাথ শিকদারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলা হয়েছে:
In Part III and V the compilers have been very largely assisted by Babu Radhanath Sickdhar, the distinguished head of the computing Department of the Great Trigonometrical Survey of India, a gentleman whose intimate acquaintance with the rigorous forms and mode of procedure adopted on the great Trigonometrical Survey of India, and great acquirements and knowledge of scientific subjects generally, render his aid particularly valuable. The chapters 15 and 17 up to 21, inclusive, and 26 of Part-III and the whole of Part-V are entirely his own, and it would be difficult for the compilers to expirers with sufficient force, the obligations they thus feel under to him, not only for the portion of the work which they desire thus publicly to acknowledge, but for the advice so generally afforded on all subjects connected with his own department.৫
শুধু তাই নয়, রাধানাথ শিকদার-ই জর্জ'এভারেস্ট উদ্ভাবিত Ray Trace Method-কে সংশোধন ও সংযোজিত করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে নিজের তৈরি করা সেই সংযোজিত পদ্ধতির সাহায্যে রাধানাথ শিকদার ভারতের বেশ কিছু জায়গায় সার্ভে করেছিলেন। ১৮৪০ সালে সম্পন্ন করা সেরকমই একটি সার্ভের নাম ছিল, Tracing of Ray Dahera to Najhili by minor Triangulation executed by Babu Radhanath Sickdhar, Sub-Assistant Great Trigonometrical Survey, with a 12 inch Theodolite of the East India Company’s pattern, in the year 1840।৬
কর্মজীবনের শুরু থেকেই স্যার জর্জ এভারেস্ট রাধানাথের গুণমুগ্ধ ছিলেন। সেইজন্য জর্জ এভারেস্ট রাধানাথ শিকদার সম্পর্কে মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করে নেন :
রাধানাথের যোগাতা সম্পর্কে আমি খুব বাড়িয়ে কিছু বলছি না; গণিত শাস্ত্রে তাঁর যা বুৎপত্তি তাতে আমি বলব এরকম লোক ভারতবর্শে খুব কমই আছেন, তা ইউরোপীয়ানই হন কিংবা এখানকার অধিবাসী যে তার সঙ্গে এব্যাপারে প্রতিযোগিতা করতে পারে, এবং এটা আমার বিশ্বাস যে, এমনকী ইউরোপেও তাঁর (রাধানাথের) এই গণিতশাস্ত্রের পারদর্শিতা খুবই উচ্চাসনে থাকবে।৭
১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি আবহাওয়া দফতরে যোগ দেওয়ার দ্বিতীয় বছরে সমুদ্র থেকে বন্দরের দিকে আগত জাহাজগুলির জন্যে সময় সিগন্যালের ব্যবস্থাও করেছিলেন। কেননা, সমুদ্রে যাতায়াতকারী জাহাজগুলির জন্যে সঠিক সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এর ফলে জাহাজগুলির যাতায়াতের ভীষণ সুবিধা হয়েছিল।৮
উল্লেখ্য, রাধানাথ শিকদারের পাণ্ডিত্য বিদেশের পণ্ডিত সমাজকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছিল। A.K. Chakravarty এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন :
Radhanath is not yet honoured as a great mathematician as tronomer of 19th century Bengal even though his name is associated with Mt. Everest. ৯
১৮২৯ সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল Government Meteorological Observatory. ১৮৫২ সাল থেকে তিনি ছিলেন Calcutta Observatory-র প্রথম ভারতীয় Superintendent.১০ কলকাতার Meteorologial Observatory-তে তিনি কয়েকটি ফর্মুলা তৈরি করেছিলেন।
রাধানাথ শিকদারের ফর্মুলা :১১
C = Sum of two corrections
B = Observed height of barometer
t = Observed temperature
m = 0.000100 (প্রতি oF এ পারদসূত্রের প্রসারণ)
b = 0.0000106 (প্রতি oF এ পিতল স্কেল-এর দৈর্ঘ্য প্রসারণ)
১৮৪৩ সালে জর্জ এভারেস্টের অবসর গ্রহণের পর Surveyor General হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন ক্যাপ্টেন আ্যানড্রু ওয়া (Andrew Waugh)। ১৮৪৫ থেকে ১৮৫০ খ্রি. পর্যন্ত হিমালয় পর্বতমালার ৭৯টি শৃঙ্গের উচ্চতাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল। এরকমই পরবর্তীকালের মাউন্ট এভারেস্ট শৃঙ্গটি চিহ্নিত ছিল ১৫তম সংখ্যা দ্বারা। এর পরবর্তীকালে ১৮৫২ সালে যখন প্রধান কমপিউটর পদে অধিষ্ঠিত; কথিত আছে, একদিন রাধানাথ শিকদার ছুটতে ছুটতে ওয়া সাহেবের কাছে চিৎকার করে বলেছিলেন—
স্যার, আমি পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু শৃঙ্গটি আবিষ্কার করে ফেলেছি।১২
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, রাধানাথ শিকদার মাউন্ট এভারেস্টের আবিষ্কারক হলেও তিনি এই কৃতিত্বের অধিকারী হতে পারেনি, পরিবর্তে সেই কৃতিত্বের অধিকারী হন এভারেস্ট। যা নিয়ে বিতর্ক বহুমাত্রায় বিদ্যমান। প্রকৃতপক্ষে ইংরেজ শাসনকালে ব্রিটিশদের কুকীর্তির ইতিহাস কারো অজানা নয়। তাই মনে হয়, পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্টের আবিষ্কারক হিসেবে রাধানাথ শিকদারের নামকে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলার সবচেয়ে বড় কুকীর্তি।
সূত্রনির্দেশ
১. যোগেশচন্দ্র বাগল, ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা, বিবেকানন্দ বুক সেন্টার, কলকাতা, সেপ্টেম্বর ১৯৪৯ (প্রথম প্রকাশ), পৃ. ২০৪।
২. আশীষ লাহিড়ী, দ্বি-শতবর্ষে বাঙালি বিজ্ঞানী রাধানাথ শিকদার, ভূগোল ও পরিবেশ, প্রথম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৩, মুর্শিদাবাদ, পৃ. ১২।
৩. তদেব, পৃ. ১২।
8. R.H. Phillimore, Historical Records of the Survey of India, Survey of India, Dehradun, Vol. 4, 1958, P. 373.
৫. R. Smyth and H.L. Thuillier, A Manual of Surveying for India, W. Thacker and Co., Calcutta, 1851, P. VIII.
৬. তদেব, পৃ. ৪৪৫।
৭. শিশির চ্যাটার্জী (সম্পাদনা), এক বাঙালির এভারেস্ট : রাধানাথ শিকদার-এর জন্ম দ্বি-শতবর্ষে আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য, ভূগোল স্বদেশচর্চা, সপ্তম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা, ২০১২, পৃ. ৩।
৮. শিশির চ্যাটার্জী (সম্পাদনা), পূর্বোক্ত, পূ. ১২।
৯. A.K. Chakravarty, Three 19th Century Calcutta Astronomers, Indian Journal of History of Science, 30 (2-4), 1995.
১০. সিদ্ধার্থ শঙ্কর মুখোপাধ্যায়, রাধানাথ শিকদার - পাদ প্রদীপের অন্ধকারে কাব্যে উপেক্ষিত, ভূগোল ও পরিবেশ, প্রথম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৩, মুর্শিদাবাদ, পৃ. ২৮।
১১. তদেব, পৃ. ২৯।
১২. শঙ্করকুমার নাথ, রাধানাথ শিকদার : তথ্যের আলোয়, চিরায়ত প্রকাশন, কলকাতা, অক্টোবর ২০১২ (প্রথম প্রকাশ), পৃ. ১৯।
Authored by অর্ণব বেরা, Ph.D( ইতিহাস বিভাগ), রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়.
Published by,