বাংলা ভাষা ও তার সাহিত্য ঐতিহ্য

From enIKSwiki
Revision as of 15:56, 30 September 2024 by Sriram (talk | contribs) (Created page with " '''ভূমিকা:''' অপরাপর নব্য ভারতীয় আর্য ভাষার (New Indo-Aryan) মত বাংলা ভাষাও প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষা (Old Indo-Aryan) থেকে প্রাকৃত তথা মধ্য ভারতীয় আর্য ভাষার (Middle Indo-Aryan) স্তর অতিক্রম করে উদ্ভূত হয়েছে। আ...")
(diff) ← Older revision | Latest revision (diff) | Newer revision → (diff)
Jump to navigation Jump to search

ভূমিকা:

অপরাপর নব্য ভারতীয় আর্য ভাষার (New Indo-Aryan) মত বাংলা ভাষাও প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষা (Old Indo-Aryan) থেকে প্রাকৃত তথা মধ্য ভারতীয় আর্য ভাষার (Middle Indo-Aryan) স্তর অতিক্রম করে উদ্ভূত হয়েছে। আর্য ভাষার উক্ত তিনটি স্তরেই সৃজিত হয়েছে অসংখ্য সাহিত্যিক নিদর্শন। প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষা বা বৈদিক ভাষায় লিখিত হয়েছে বেদ; মধ্য ভারতীয় আর্য ভাষা বা প্রাকৃত ভাষায় লিখিত হয়েছে মহাকাব্য, নাটক, জৈন ও বৌদ্ধ ধর্ম গ্রন্থ আর নব্য ভারতীয় আর্য ভাষাগুলিতে বর্তমান কাল পর্যন্ত সাহিত্য সৃষ্টির প্রবহমানতা ব্যাপকভাবে বজায় আছে। মধ্য ভারতীয় আর্য ভাষার অন্তর্ভুক্ত মাগধী প্রাকৃতের পূর্বী অংশ থেকে তিনটি নব্য ভারতীয় আর্য ভাষা যথা: বাংলা, অসমীয়া ও ওড়িয়ার জন্ম হয়েছে। একই উৎস থেকে বিকশিত হওয়ার দরুন তিনটি ভাষার মধ্যেই ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের নিরিখে ভীষণ সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। এ কারণেই বাংলা ভাষার সর্বপ্রথম নিদর্শন ‘চর্যাগীতি’র উপর তিনটি ভাষারই দাবি একসময় জোরালো হয়ে উঠেছিল। তবে পরবর্তীকালে ভাষাতাত্ত্বিকরা, বিশেষভাবে ভাষাচার্য সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় প্রমাণ করেছেন চর্যাগানের ভাষা হল বাংলা।

বিভাগ/উপশিরোনাম:

ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ মূলত ভাষার ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য (Phonological features) ও রূপতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের (Morphological features) উপর নির্ভর করে। সূচনাকাল থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত বাংলা ভাষার যুগবিভাগকে (Periodisation) তিনটি শ্রেণিতে বিন্যস্ত করা হয়েছে:

ক। প্রাচীন বাংলা (Old Bengali)

খ। মধ্য বাংলা (Middle Bengali) ও

গ। আধুনিক বাংলা (Modern Bengali)

এর মধ্যে মধ্য বাংলাকে আবার দুটি ভাগে ভাগ করা হয়: আদি মধ্য বাংলা (Early Middle Bengali) ও অন্ত মধ্য বাংলা (Late Middle Bengali)। ভাষাতাত্ত্বিক পার্থক্যের উপর নির্ভর করে বাংলা ভাষার এই যুগবিভাজন নির্মিত হলেও যুগভেদে সাহিত্যের আঙ্গিক ও বিষয়বস্তুর মধ্যেও যথোচিত পার্থক্য লক্ষ করা যায়। তাই সহস্র বছরের প্রাচীন বাংলা ভাষার সাহিত্যিক ঐতিহ্য নিরূপণের জন্য উক্ত যুগবিভাগের আশ্রয় অবলম্বন করতে হবে। সে ক্ষেত্রে বিষয়টির উপশিরোনামগুলি হতে পারে এরূপ:

ক। প্রাচীন বাংলা ও তার সাহিত্যিক ঐতিহ্য

খ। আদি মধ্য বাংলা ও তার সাহিত্যিক ঐতিহ্য

গ। অন্ত মধ্য বাংলা ও তার সাহিত্যিক ঐতিহ্য

ঘ। আধুনিক বাংলা ও তার সাহিত্যিক ঐতিহ্য

সংক্ষিপ্ত বিবরণ:

ক। প্রাচীন বাংলা ও তার সাহিত্যিক ঐতিহ্য:

চর্যাগীতি প্রাচীন বাংলার মুখ্য সাহিত্যিক নিদর্শন। অন্যান্য নগণ্য নিদর্শনগুলির মধ্যে বন্দ্যঘটীয় সর্বানন্দ রচিত সংস্কৃত অভিধান অমরকোষের চারশ’ বাংলা শব্দ সমন্বিত টীকা, সেকশুভোদয়ায় সংকলিত কিছু বাংলা গান, বৌদ্ধকবি ধর্মদাস রচিত বিদগ্ধ মুখমণ্ডনে উল্লিখিত কিছু বাংলা ছড়া ও কবিতা উল্লেখযোগ্য।

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ সালে নেপালে গিয়ে চর্যাচর্যবিনিশ্চয়, সরোহপাদের দোহাকোষ ও কৃষ্ণাচার্যের দোহাকোষ, এই তিনখানা পুঁথি আবিষ্কার করেন। এই তিনটি পুঁথির সঙ্গে ডাকার্ণবের পুঁথিটি গ্রহণ করে ১৯১৬ সালে তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রকাশ করেন ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোহা’ শীর্ষক গ্রন্থটি। পরবর্তীকালে লক্ষ করা যায় তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের শুধু প্রথম পুঁথিটির ভাষাই বাংলা; অন্য তিনটি পশ্চিমা অপভ্রংশে রচিত।

চর্যাগীতির বিষয়বস্তু বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকদের অধ্যাত্মতত্ত্ব। ধর্মতত্ত্ব ও সাধনতত্ত্ব বিষয়ে নির্দেশ দেওয়ার জন্যই গানগুলি রচিত। এ কারণেই গানগুলি সর্বজনবোধ্য ভাষায় না লিখে রূপকের আশ্রয়ে লিখিত। চর্যাচর্যবিনিশ্চয়ের যে খণ্ডিত পুঁথিটি হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রকাশ করেছিলেন সেখানে ৪৬টি সম্পূর্ণ গান ও একটি গানের ভগ্নাংশ ছিল। মূল গানে ও টীকায় পদকর্তার নাম যেভাবে উল্লিখিত আছে সেখানে মোট ২৩জন কবির সন্ধান পাওয়া যায়। লুইপাদ, কাহ্নপাদ, ভুসুকুপাদ, কুক্কুরীপাদ, সরহপাদ, শবরপাদ পদকারদের মধ্যে অন্যতম। বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের সাধনতত্ত্ব প্রকাশের মাধ্যম হলেও চর্যাগানে সমকালীন সমাজব্যবস্থা ও মানবজীবনের বিভিন্ন বিষয়ের চিত্র পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে।

খ। আদি মধ্য বাংলা ও তার সাহিত্যিক ঐতিহ্য:

আদি মধ্যযুগের বাংলা ভাষার একমাত্র প্রামাণ্য নিদর্শন বড়ু চণ্ডীদাসের লেখা শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বল্লভ ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের পুঁথিটি আবিষ্কার করেন। বসন্তরঞ্জনের আবিষ্কৃত পুঁথিটি খণ্ডিত থাকায় তাতে কোন নাম ছিল না। চণ্ডীদাস কৃষ্ণকীর্তন লিখেছিলেন, এই প্রবাদ মেনে নিয়ে এবং কাব্যের মধ্যে কৃষ্ণের লীলাকীর্তন দেখে তিনি নিজেই এর নাম দিয়েছিলেন ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’। ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে তিনি পুঁথিটি শ্রীকৃষ্ণকীর্তন নামে সম্পাদনা করেন।

শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে তিনটি নামের ভণিতা পাওয়া যায়: চণ্ডীদাস, বড়ু চণ্ডীদাস ও অনন্ত বড়ু চণ্ডীদাস। তবে অধিকাংশ স্থানেই ভণিতা পাওয়া গেছে বড়ু চণ্ডীদাসের নামে। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে কৃষ্ণের ঐশ্বর্য সত্তা প্রকাশ পেয়েছে। এখানে লৌকিক ও স্থুল দেহশক্তি প্রাধান্য পেয়েছে। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের মোট তেরটি খণ্ড; যথা: জন্মখণ্ড, তাম্বুলখণ্ড, দানখণ্ড, নৌকাখণ্ড, ভারখণ্ড, ছত্রখণ্ড, বৃন্দাবনখণ্ড, কালীয়দমনখণ্ড, বস্ত্রহরণখণ্ড, হারখণ্ড, বাণখণ্ড, বংশীখণ্ড ও রাধাবিরহ। এই ১৩টি খণ্ডের কাহিনিসূত্র লক্ষ করলে দেখা যায় বড়ু চন্ডীদাস মূলত লৌকিক কৃষ্ণকথার কাহিনি অবলম্বনে কাব্য রচনা করেছেন।

চর্যাগানের মত শ্রীকৃষ্ণকীর্তনেও সমকালীন সমাজের চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে; বিশেষভাবে সে আমলের রাষ্ট্রব্যবস্থা, বৃত্তি, খাদ্যাভ্যাস, ধর্মকর্ম, লোকক্রীড়া ইত্যাদি বিষয়ের উল্লেখ কাব্য মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম আখ্যানকাব্য হিসেবেও অভিহিত করা হয়ে থাকে। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে ভাগবতপুরাণ, বিষ্ণুপুরাণ ও পদ্মপুরাণের প্রভাব লক্ষ করা যায়।

গ। অন্ত মধ্য বাংলা ও তার সাহিত্যিক ঐতিহ্য:

ওড়িয়ার সঙ্গে বাংলার অন্যতম ধ্বনিগত পার্থক্য সূচিত হয় এই পর্বে; এই পর্বেই বাংলায় পদান্তে অবস্থিত একক ব্যঞ্জনের পরে অবস্থিত ‘অ’-কারের বিলুপ্তি ঘটে যা ওড়িয়ায় রক্ষিত হয়। এই পর্বেই প্রথম বাংলা ভাষার পর্যাপ্ত সাহিত্যিক নিদর্শন পাওয়া যায়। এ সময় বিভিন্ন ধারায় সাহিত্য রচিত হয়; যথা: বৈষ্ণব সাহিত্য, অনুবাদ সাহিত্য, মঙ্গলকাব্য, ইসলামি প্রণয় আখ্যান ইত্যাদি।

মূলত চৈতন্যদেবের আবির্ভাব অন্ত মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে ব্যাপক প্রভাব স্থাপনে সমর্থ হয়। চৈতন্য প্রভাবে বাংলা সাহিত্যে ভক্তিরসের প্রাচুর্য লক্ষ করা যায়; যা পদাবলী সাহিত্যে বিষয়গতভাবেও কিছু নতুন সংযোজন ঘটাতে সমর্থ হয়: ক। বাৎসল্যের পদ ও খ। গৌরাঙ্গ বিষয়ক পদ। জীবনী সাহিত্যের আবির্ভাব ঘটে এসময়। অনুবাদ কাব্যগুলিতেও ভক্তিরসের প্লাবন লক্ষ করা যায়। মঙ্গলকাব্যগুলি মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের মৌলিক আখ্যান; বাঙালির জীবননিষ্ঠ জীবনযাত্রার তথ্যনিষ্ঠ ছবি পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে এখানে।

মঙ্গলকাব্যের প্রধান কবিরা হলেন বিজয় গুপ্ত, নারায়ণ দেব, বিপ্রদাস পিপলাই, কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ, মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, দ্বিজমাধব, মানিক দত্ত, রূপরাম চক্রবর্তী, ঘনরাম চক্রবর্তী, খেলারাম, মানিকরাম, সীতারাম, ময়ূরভট্ট, রামকৃষ্ণ রায়, শঙ্কর কবিচন্দ্র, রামেশ্বর ভট্টাচার্য প্রমুখ। বৈষ্ণব পদকর্তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস, বাসুদেব ঘোষ, নরহরি সরকার, মুরারি গুপ্ত, বলরাম দাস প্রমুখ। অনুবাদ কাব্যের প্রধান কবিরা হলেন কৃত্তিবাস ওঝা, চন্দ্রাবতী, রামানন্দ ঘোষ, কাশীরাম দাস, কবীন্দ্র পরমেশ্বর, শ্রীকর নন্দী, মালাধর বসু প্রমুখ। চৈতন্য জীবনীকাব্যের প্রধান রচয়িতারা হলেন বৃন্দাবন দাস, কৃষ্ণদাস কবিরাজ, জয়ানন্দ, লোচন দাস। আরাকান রাজসভার আনুকূল্যে যে সকল কবিরা কাব্য রচনা করেছিলেন তাঁরা হলেন দৌলত কাজী, সৈয়দ আলাওল, সৈয়দ সুলতান, মোহাম্মদ খান প্রমূখ। শাক্তপদ রচনা করেছেন রামপ্রসাদ সেন, কমলাকান্ত চক্রবর্তী প্রমুখ।

ঘ। আধুনিক বাংলা ও তার সাহিত্যিক ঐতিহ্য:

মধ্যযুগ পর্যন্ত লিখিত সকল সাহিত্যই ছিল ভীষণভাবে সুরাশ্রিত, গেয় সাহিত্য। আখ্যান, তত্ত্বালোচনা, জীবনী সবই ছিল শ্রোতানির্ভর। এ কারণে তা রচিত হত পদ্যে। কিন্তু আধুনিক বাংলায় শ্রব্য সাহিত্য পরিবর্তিত হয়ে গেল লিখিত সাহিত্যে। ছাপাখানা আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্যে সুর ও সঙ্গীতির অবসান ঘটল। সূচনা হল গদ্য সাহিত্যের। গদ্য সাহিত্যের সূত্র ধরে আবির্ভাব ঘটল বিবিধ আঙ্গিকের; যথা: উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, নাটক, প্রহসন, আত্মজীবনী ইত্যাদি।

গদ্য সাহিত্যের সূচনাই আধুনিক বাংলার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। সাহিত্যে ব্যবহৃত গদ্যের আবার দুটি রীতি গড়ে উঠে: সাধু ও চলিত। কালক্রমে সাধু গদ্য বিলুপ্ত হয়ে চলিত গদ্যই বাংলা সাহিত্যের একমাত্র অবলম্বন হয়ে উঠে।

পরম্পরা:

ইংরেজদের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে এ দেশে ইংরেজি শিক্ষার প্রচলন ঘটে। ইংরেজি শিক্ষার সূত্র ধরে ব্যক্তিস্বার্থ ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধের বিকাশ ঘটে। সেই সঙ্গে মুদ্রাযন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মুদ্রা যন্ত্রের হাত ধরে সংবাদপত্রের যুগ শুরু হয়। সামন্ততান্ত্রিক সমাজে বাবু শ্রেণির পাশাপাশি একটি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব ঘটে; বাঙালির মনোজগতে পরিবর্তন এলেও তার সামাজিক ক্ষেত্র আবদ্ধ থাকে সামন্ততান্ত্রিক গতানুগতিকতায়। সে কারণেই বাংলা উপন্যাসের সূচনালগ্নে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে শহুরে বাবুদের ব্যঙ্গচিত্র; যার মাধ্যমে বাস্তব জীবন প্রদর্শনের একটি রীতি গড়ে ওঠে; অথবা বাস্তব থেকে দূরে সরে গিয়ে লিখিত হয় রোমান্স; যার একটি জনপ্রিয় অংশ ঐতিহাসিক রোমান্স। জেমস্‌ টডের ‘Annals and Antiquities of Rajasthan’ গ্রন্থটি এই ধারার ভিত্তি রচনা করে। ১৮২১ সালে ভবানীচরণ বন্দোপাধ্যায় বেনামে লেখেন ‘বাবুর উপাখ্যান’। ‘আলালের ঘরের দুলাল’, ‘কলিকাতা কমলালয়’ প্রভৃতি নকশা জাতীয় রচনা ক্রমান্বয়ে প্রকাশ পেতে থাকে। এগুলি ছিল বিদ্রুপাত্মক রচনা। সমকালীন বাঙালির সমাজ জীবনের ছবি ফুটিয়ে তুলেছিল এই জাতীয় নকশা।

ভূদেব মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘ঐতিহাসিক উপন্যাসে’ ‘উপন্যাস’ শব্দটি ব্যবহার করলেও পরবর্তীকালে তিনি বলেন ‘এটি ইংরেজি রীতির অনুকরণে একটি আখ্যায়িকা’। ১৮৬৫ সালে প্রকাশিত হয় বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম উপন্যাস ‘দুর্গেশনন্দিনী’। বইটি সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন ‘বইখানি ইতিবৃত্তমূলক উপন্যাস’, যা থেকে বোঝা যায় নভেল পরিভাষাটির বদলে ক্রমশ ‘উপন্যাস’ শব্দটি বাংলা সাহিত্য ক্ষেত্রে গৃহীত হচ্ছে। বঙ্কিমচন্দ্র স্বীকার করেছেন পর্দাপ্রথা, বাল্যবিবাহ, নারীজাতির স্বাতন্ত্র‍্যহীনতার জন্য বাঙালি সমাজে পূর্বরাগ অনুরাগের অবকাশ খুব একটা নেই। তাই একপ্রকার বাধ্য হয়েই ইতিহাসের স্মরণ নিতে হয়। কিছুটা এহেন কারণে ও কিছুটা রোমান্টিক কল্পনা, রোমান্স রসে আগ্রহের জন্য বঙ্কিমচন্দ্র ঐতিহাসিক রোমান্সের পথ অবলম্বন করেন। ‘দুর্গেশনন্দিনী’ প্রকাশিত হওয়ার পর সেই ছাঁদে উপন্যাস লেখার প্রয়াস শুরু হয়। রমেশচন্দ্র দত্তের ‘বঙ্গবিজেতা’, ‘মাধবীকঙ্কন’, প্রতাপচন্দ্র ঘোষের ‘বঙ্গাধিপ পরাজয়’, দামোদর মুখোপাধ্যায়ের ‘মৃন্ময়ী’ যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। উপন্যাসের বিষয় হিসেবে এই সময় ইতিহাস প্রাধান্য পেলেও সামাজিক সমস্যাও সমান গুরুত্ব পেয়েছে। তাই ১৮৭২ সালে বঙ্গদর্শনের পাতায় প্রকাশিত হয় ‘বিষবৃক্ষ’। এরপর সামাজিক বিষয় নিয়ে উপন্যাস লেখার একটি ধারাবাহিকতার সূচনা ঘটে। স্বর্ণকুমারী দেবীর ‘ছিন্নমুকুল’, শিবনাথ শাস্ত্রীর ‘মেজ বউ’, বঙ্কিমের ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’, তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘স্বর্ণলতা’ জনপ্রিয়তা লাভ করে। ‘বিষবৃক্ষ’ উপন্যাসে সমাজবিরুদ্ধ প্রেম সম্পর্কের সূত্রপাত ঘটে, ‘কৃষ্ণকান্তের উইলে’ চরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্ব প্রকাশিত হয় সুমতি ও কুমতির আধারে; চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা প্রাধান্য পায়। চরিত্রের আঁতের কথা হয়ে ওঠে প্রধান; যারই চূড়ান্ত রূপ লক্ষ করা যায় রবীন্দ্রনাথের ‘চোখের বালি’তে; যেখানে একাধিকবার বিষবৃক্ষের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়েছে অর্থাৎ উপন্যাস রচনার অভিমুখ ঘুরে যায় মনস্তত্ত্ব কেন্দ্রিকতায়।

রবীন্দ্রনাথ প্রাথমিকভাবে ঐতিহাসিক পটভূমিতে ‘বউ ঠাকুরানীর হাট’ ও ‘রাজর্ষি’ লিখলেও ১৯০২ সালে নবপর্যায় বঙ্গদর্শনের পাতায় প্রকাশিত ‘চোখের বালি’তে তাঁর স্বতন্ত্রতা পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। বাস্তব জীবনের প্রতি আগ্রহই যে উপন্যাসের একমাত্র প্রতিপাদ্য, কোন অসাধারণ অলৌকিক ঘটনার চমক যে উপন্যাসের প্রাণ হতে পারে না, ‘চোখের বালি’ থেকে তা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাই ‘চোখের বালি’র ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছেন ‘চোখের বালি’ উপন্যাসটি আকস্মিক, কেবল আমার মধ্যে নয়, সেদিনকার বাংলা সাহিত্যক্ষেত্রে’। এরপর ‘প্রবাসী’র পাতায় আড়াই বছর ধরে প্রকাশিত হয় মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘গোরা’ যা উপন্যাস রচনার শিল্পকুশলতায় এক নতুন পথের ইঙ্গিত দেয়। রবীন্দ্রনাথ পরবর্তী উপন্যাসের ক্ষেত্রে শরৎচন্দ্রের কলমে বাংলার গ্রামীণ সমাজ ও নারীর হৃদয়ের অন্তঃস্থল মূর্ত হয়ে ওঠে। পরবর্তী ক্ষেত্রে বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বিষয়বৈচিত্র্য ও শিল্পনীতির ক্ষেত্রে নিজস্বতার ছাপ রাখেন।

           বাংলায় ছোটগল্পেরও সূচনা ঘটে রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে। ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে ‘ভারতী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রনাথের ‘ভিখারিনী’। এরপর তিনি লেখেন ‘ঘাটের কথা’ ও ‘রাজপথের কথা’। তবে এই রচনাগুলিকে যথার্থ ছোটগল্প হিসেবে সমালোচকেরা স্বীকার করেননি। ১২৯৮ বঙ্গাব্দে ‘হিতবাদী’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘দেনাপাওনা’ গল্পটিকেই সমালোচকেরা আধুনিক ছোটগল্পের সূচনাবিন্দু হিসেবে নির্ণয় করেছেন। এরপর ১৯২৩ সালে ‘কল্লোল’ পত্রিকার মাধ্যমে রবীন্দ্র-বিরোধিতার একটি পরিসর গড়ে ওঠে। ‘দারিদ্র্যের অসংযম’ ও ‘লালসার আস্ফালন’ এই ছিল কল্লোল যুগের মন্ত্র। রবীন্দ্র প্রভাব মুক্ত হয়ে সাহিত্যকে চূড়ান্তভাবে বস্তুনিষ্ঠ ও নিম্নবর্গের মানুষের জীবনচর্চার অঙ্গীভূত করাই ছিল এই গোষ্ঠীর লক্ষ্য। প্রেমেন্দ্র মিত্র, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, মণীশ ঘটক এই যুগের অন্যতম গল্পকার। পরবর্তী সময়ে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ছোটগল্পে ফুটে উঠেছে রাঢ়বঙ্গের লোকজীবন, ক্ষয়িষ্ণু সামন্ততন্ত্রের পতন ও ধনতন্ত্রের বিকাশ। মনস্তত্ত্বের গভীরতর ক্ষেত্র, যৌন জটিলতা ও পরবর্তীকালে সমাজের ত্রুটিপূর্ণ অর্থনৈতিক কাঠামো তথা বৈষম্যমূলক বন্টন ব্যবস্থা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্পের বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্প প্রকৃতি সম্পৃক্ত; গ্রামবাংলার সাধারণত্ব, তুচ্ছতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর পরবর্তী সময়ে পরশুরাম, সুবোধ ঘোষ, সন্তোষ কুমার ঘোষ, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী প্রমুখ ছোটগল্পকার ছোটগল্পের জগৎকে সমৃদ্ধ করেছেন।

সংস্কৃত নাট্যসাহিত্য, ইংরেজি নাট্যসাহিত্য ও দেশীয় যাত্রা, এই তিনটি আদর্শ বাংলা নাটকের উদ্ভবের পিছনে ক্রিয়াশীল ছিল। বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম নাটক ‘কাল্পনিক সংবদল’; তবে প্রথম মৌলিক নাটক যোগেশচন্দ্র গুপ্তের ‘কীর্তিবিলাস’ ও তারাচরণ শিকদারের ‘ভদ্রার্জুন’। ১৮৫৪ সালে প্রকাশিত হয় রামনারায়ণ তর্করত্নের মৌলিক নাটক ‘কুলীনকুলসর্বস্ব’। এছাড়াও তিনি চারটি নাটক সংস্কৃত থেকে অনুবাদ করেছিলেন। তাঁর লেখা ‘রত্নাবতী’ নাটকের অভিনয় দেখে মধুসূদন নাট্য রচনার সংকল্প গ্রহণ করেন ও তাঁর প্রথম প্রকাশিত নাটক ‘শর্মিষ্ঠা’ বাংলা নাটকের নব ইতিহাস রচনা করে। মধুসূদন তাঁর নাটক ‘শর্মিষ্ঠা’ ও ‘পদ্মাবতী’তে ইংরেজি নাটকের আদর্শ অনুসরণ করে সাফল্য লাভ করেন। যে বাংলা নাটক এই সময় পর্যন্ত পৌরাণিক ও সামাজিক বিষয়ের মধ্যে আবদ্ধ ছিল, সেই পরিসীমা অতিক্রম করে ঐতিহাসিক বিষয় অবলম্বনে নাটক লেখেন, যা হয়ে ওঠে ঘাত-প্রতিঘাতমূলক। তাঁর লেখা ‘বুড় শালিকের ঘাড়ে রো’ ও ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ প্রহসন হিসেবে সার্থকতা লাভ করে। দীনবন্ধু মিত্রের নাটকে বাংলার গণজীবন মূর্ত হয়ে ওঠে। তাঁর ‘নীলদর্পণ’ নাটকে রাজনৈতিক প্রশ্ন উদ্যত হয়ে উঠেছিল যা বাঙালির স্বাধীনতা স্পৃহাকে জাগ্রত করে তোলে। প্রহসন রচনায় দীনবন্ধু ছিলেন কৃতিত্বের দাবিদার। ‘বিয়ে পাগলা বুড়ো, ‘সধবার একাদশী’, ‘জামাই বারিক’, ‘লীলাবতী’ ইত্যাদি প্রহসনে তিনি বাস্তবকে ফুটিয়ে তোলেন। মনোমোহন বসুর নাটকে যাত্রার আদর্শ প্রতিস্থাপিত হয়েছিল। উপেন্দ্রনাথ দাসের নাটকে ইংরেজ বিরোধিতা ও স্বদেশপ্রেম প্রতিফলিত হয়ে ওঠে। ফলত ব্রিটিশ সরকার ড্রামাটিক পারফরম্যান্স অ্যাক্ট ১৮৭৬ লাগু করতে বাধ্য হয়। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটকে ফরাসি প্রভাব প্রতিষ্ঠা পায়। পরবর্তী সময়ে আবির্ভূত গিরিশচন্দ্র সেন ছিলেন বাংলা নাটকের প্রবাদপুরুষ। তিনি একাধারে ছিলেন নাট্য লেখক, পরিচালক, রঙ্গমঞ্চের অধ্যক্ষ, অভিনয় শিক্ষক ও অভিনেতা। পেশাদারি রঙ্গমঞ্চের চাহিদা মেটানোর জন্য তিনি অসংখ্য নাটক লেখেন। ইতিহাস প্রসিদ্ধ মহান চরিত্রের মধ্য দিয়ে বাঙালিকে স্বাধীনতার লড়াইয়ে উদ্দীপ্ত করে তোলার জন্য এই সময়ে লিখিত বেশ কিছু নাটকে স্বাদেশিকতার মন্ত্র প্রচারিত হয়েছিল। অমৃতলাল বসুও ছিলেন একাধারে অভিনেতা ও নাট্যপরিচালক। তিনি প্রহসন রচনায় খ্যাতি লাভ করেন। দ্বিজেন্দ্রলালের ঐতিহাসিক নাটকগুলির মধ্য দিয়েও জাতীয়তাবাদের প্রচার ঘটেছে। ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ এই সময়ের অন্যতম নাট্যকার ছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের প্রথম পর্বের নাটকগুলি ছিল রুদ্রচণ্ড, বাল্মিকী প্রতিভা, প্রকৃতির প্রতিশোধ তৎকালীন প্রথাগত নাটকের থেকে শিল্পগতভাবে সম্পূর্ণ পৃথক, পুরনো নাট্যরীতিকে রবীন্দ্রনাথ সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করেন। রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় পর্বে লিখিত নাটক ‘মায়ার খেলা’, ‘রাজা ও রানী’, ‘বিসর্জন’ প্রভৃতিতে প্রথাগত গীতিনাট্য রচনার আদর্শকে অনুসরণ করেছেন। জড়তা থেকে প্রাণময়তা, বন্ধন থেকে মুক্তির দর্শন প্রকাশিত হয়েছে এই নাটকগুলিতে। তৃতীয় পর্বের নাটকগুলি ‘চিত্রাঙ্গদা’ ‘মালিনী’, ‘বৈকুন্ঠের খাতা’ প্রভৃতি নাটকে নাটক সুলভ সংঘাতের বদলে কবিতা প্রতিম রহস্য সঞ্চারিত হয়েছে। চতুর্থ পর্বের নাটক ‘রাজা’, ‘অচলায়তন’, ‘ডাকঘর’ রবীন্দ্রনাথের দর্শনচিন্তা, তত্ত্ব প্রাধান্য পেয়েছে। পরবর্তী পর্বে লিখিত ‘মুক্তধারা’, ‘গৃহপ্রবেশ’, ‘রক্তকরবী’, ‘নটীর পূজা’, ‘রথযাত্রা’ যেখানে নাটকের বিষয় হয়ে উঠছে বিশ্ব রাজনীতি, যন্ত্র সভ্যতার বিনাশ ও সাম্রাজ্যবাদের ভয়াবহতা। রবীন্দ্র পরবর্তী সময়ে বিজন ভট্টাচার্যের হাত ধরে গঠিত হচ্ছে গণনাট্য আন্দোলন। বিশেষ রাজনৈতিক আদর্শকে মাথায় রেখে এই আন্দোলন দানা বাঁধছে। এরপর বাদল সরকার ‘থার্ড থিয়েটারে’র উদ্ভাবন ঘটান। মন্মথ রায়, তুলসী লাহিড়ী, বিধায়ক ভট্টাচার্য, উৎপল দত্ত, মনোজ মিত্র পরবর্তী সময়ের উল্লেখযোগ্য নাট্যকার।

ঈশ্বর গুপ্তকে বলা হয় যুগসন্ধিক্ষণের কবি। তাঁর লেখনীতে খণ্ড কবিতার আবির্ভাব ঘটা, তিনি কবিতাকে ধর্মভাবমুক্ত করেন ও ইহজীবনসর্বস্বতা, সমাজভাবনা তাঁর কবিতায় গুরুত্ব পায়। ঈশ্বর গুপ্তের পরবর্তী সময়ে রঙ্গলাল বন্দোপাধ্যায় ইতিহাসকে অবলম্বন করে স্বদেশপ্রেমকে কবিতার বিষয়বস্তু করেন। মধুসূদন দত্ত কাব্যজগতে বিষয় ও আঙ্গিক উভয়তই একপ্রকার বিপ্লব ঘটান। তিনি অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তন করেন; গীতিকবিতার বিশেষ রূপ সনেট লেখেন। এরপর আখ্যান কবিতার ক্ষেত্রে হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, নবীনচন্দ্র সেন খ্যাতিলাভ করেন। মধুসূদনের হাতে গীতিকবিতার প্রতিষ্ঠা ঘটলেও তা পূর্ণতা পায় বিহারীলাল চক্রবর্তীর রচনায়। এই সময়ে গোবিন্দচন্দ্র দাস, দেবেন্দ্রনাথ সেন, গিরীন্দ্রমোহিনী দাসী, অক্ষয় কুমার বড়াল, কামিনী রায় গীতিকবিতার ধারাকে পরিপুষ্ট করেন। রবীন্দ্র কাব্যের ভাবজগৎ বিরাট ও ব্যাপ্ত। তাঁর কবিপ্রতিভা বিবর্তনধর্মী। প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতি, সভ্যতা যেমন তাঁর কাব্যজগৎকে অধিকার করেছে তেমনই এক অসীম তত্ত্বলোক তাঁর কাব্যজগৎকে আন্দোলিত করেছে। রবীন্দ্র সমকালীন কবিরা রবীন্দ্রনাথের এই বিরাট প্রভাবকে অস্বীকার করতে পারেননি। তাঁদের লেখায় রবীন্দ্রনাথের অক্ষম অনুকরণ ঘটেছে। এই গোষ্ঠীকে রবীন্দ্রানুসারী কবিসমাজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়; যার মধ্যে রয়েছেন সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, যতীন্দ্রমোহন বাগচী, করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়, কালিদাস রায়, কুমুদরঞ্জন মল্লিক। রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশাতেই রবীন্দ্রনাথের প্রভাব মুক্ত কবিতা সৃষ্টির একটি আন্দোলন গড়ে ওঠে যাকে সামগ্রিকভাবে আধুনিক কবিতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। নগরকেন্দ্রিক যান্ত্রিক সভ্যতার অভিঘাত, বর্তমান জীবনের ক্লান্তি, নৈরাশ্যবোধ, আত্মবিরোধ অনিকেত মনোভাব, ফ্রয়েডিয় মনোবিজ্ঞান, মার্ক্সীয় দর্শন, প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধে অবিশ্বাস, দেহজ কামনা বাসনার শরীরী রূপকে প্রত্যক্ষ করা, ঈশ্বর ও নীতি ধর্মে অবিশ্বাস এবং সর্বোপরি রবীন্দ্র ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে সচেতন বিদ্রোহ এই কাব্য আন্দোলনের সাধারণ লক্ষণ ছিল।১ বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তী এই আধুনিক কাব্য আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন।

প্রবন্ধ সাহিত্যের সার্থক রূপকার ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র। তাঁর প্রবন্ধের বিষয়বস্তু ছিল বিবিধ। সংস্কৃত সাহিত্য সমালোচনা, সৌন্দর্যতত্ত্ব, বাংলার আর্থ-সামাজিক অবস্থা তাঁর প্রবন্ধে জীবন্তরূপে প্রতিফলিত। প্রবন্ধ সাহিত্যে তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি ‘কমলাকান্তের দপ্তর’। বঙ্কিমকে আদর্শ করে একটি প্রবন্ধ লেখক গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। যার মধ্যে ছিলেন শিবনাথ শাস্ত্রী, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, অক্ষয়চন্দ্র সরকার প্রমুখ। অন্যান্য ক্ষেত্রের মত প্রবন্ধ রচনাতেও রবীন্দ্রনাথ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। রবীন্দ্র পরবর্তী সময়ে প্রবন্ধকারদের মধ্যে প্রমথ চৌধুরী, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মোহিতলাল মজুমদার উল্লেখ্য।

দৃষ্টিভঙ্গি:

ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, সাহিত্যের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রেও তা সমধিক তাৎপর্যপূর্ণ। বঙ্কিমচন্দ্র বিষয়টি নিয়ে আলোকপাত করেছিলেন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের একটি আলোচিত ক্ষেত্র তুর্কি আক্রমণ ও তার ফলস্বরূপ সংঘটিত দীর্ঘ দেড়শ’ বছরের (১২০০-১৩৫০ খ্রি:) সাহিত্য রচনার অনুর্বর পর্ব যা সাহিত্যের ইতিহাসে ‘অন্ধকার যুগ’ নামে পরিচিত। বঙ্কিম যেমন তুর্কি আক্রমণের প্রচলিত ইতিহাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন; অসত্য, রাজনৈতিক মতাদর্শপুষ্ট, স্বকপোলকল্পিত ‘ইতিহাস’ প্রচার প্রকল্পের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন২; তেমনই ‘অন্ধকার যুগ’, এহেন নামকরণের পশ্চাতে আধুনিক সমালোচক খুঁজে পেয়েছেন উপনিবেশিক প্রভাব।৩ সাহিত্যের ইতিহাসকারের ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাসের উপর নির্ভর করেছে এই ঘটনার ব্যাখ্যা।৪

তুর্কি আক্রমণের মতই আরেকটি বিষয় ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের বঙ্গভঙ্গ, যেখানে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিকে দু’ভাগে ভাগ করার ব্রিটিশ সিদ্ধান্ত দুই বঙ্গে দু’রকম প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গে যেমন এক বাঙালি জাতীয়তাবোধের উন্মেষ ঘটে, যার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল সম্প্রীতি ভাবনা৫, যার ফলে স্বদেশি সঙ্গীত ও স্বদেশি নাটক লেখার ঝোঁক তৈরি হয়; অন্যদিকে পূর্ববঙ্গের সাহিত্য ও সংবাদপত্র বঙ্গভঙ্গের সমর্থনে ছিল অকুণ্ঠ।

১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের দেশভাগ নিয়েও পশ্চিমবঙ্গে যে পরিমাণ সাহিত্য লিখিত হয়েছে, পূর্ববঙ্গে তা হয়নি। আবার পশ্চিমবঙ্গে লিখিত মূলধারার সাহিত্যে দেশভাগের প্রকৃত চিত্র উন্মোচিত হয়নি, কখনো বা ‘মিথ্যা’, ‘বানানো গল্প’ পরিবেশিত হয়েছে; যাকে এককথায় বলা যায় ‘অসৎ সাহিত্য’।৬ আসলে যে ‘সঙ্ঘে’র অন্তর্ভুক্ত ছিলেন তত্কালীন খ্যাতনামা সাহিত্যিকেরা, সেই ‘সঙ্ঘে’র ‘পার্টি লাইন’ই তাঁদের এহেন ‘অসৎ সাহিত্য’ রচনায় প্রণোদিত করেছিল। অর্থাৎ কেবল ‘দৃষ্টিভঙ্গি’র কারণেই উপমহাদেশের সবচেয়ে বৃহৎ ঘটনার সম্যক প্রতিফলন বাংলা সাহিত্যে পরিস্ফুট হল না।

আধুনিক প্রাসঙ্গিকতা:

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের পুনর্লিখন একান্ত প্রয়োজন। সাহিত্যের ইতিহাসকারের সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ, রাজনৈতিক আনুগত্য তাঁদের ইতিহাস রচনাকে প্রভাবিত করেছে। নির্দিষ্ট প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান, লিখিত বিবরণ ও নির্দিষ্ট গবেষণা পদ্ধতির উপর নির্ভর করে সাহিত্যের ইতিহাস রচিত হবে; সেখানে ব্যক্তির ভূমিকা হবে নগণ্য; একটি পেশাদারি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সাহিত্যের ইতিহাসের পুননির্মাণ প্রয়োজন।

মধ্যযুগে সাহিত্য লিখিত হত পুঁথিতে। অসংখ্য পুঁথি অযত্নে, অবহেলায় চিরতরে নষ্ট হয়ে গেছে। পুঁথি সংরক্ষণের তাগিদে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ একান্ত প্রয়োজন। পুঁথি ডিজিটাইজেশনের কাজ শুরু হয়েছে, সেই কাজকে আরও ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন। কেবল পুঁথিই নয়, পুঁথি পরবর্তী সময়ের মুদ্রিত বই, সংবাদপত্র, পত্রিকা ডিজিটাইজেশন করা আশু কর্তব্য। গবেষণার সুবিধার জন্য ডিজিটাইজড ফর্মে এই সকল সাহিত্যিক উপাদানের আন্তর্জালিক জগতে সহজ প্রাপ্তিও নিশ্চিত করা জরুরি।

লিখিত সাহিত্যের পাশাপাশি মৌখিক পরম্পরায় বাহিত সাহিত্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সেগুলি যদি অবিলম্বে সংরক্ষিত না হয়, তাহলে জাতির ইতিহাসের সুপ্রাচীন উপাদান চিরতরে হারিয়ে যাবে; উদাহরণ দেওয়া যাতে পারে অবনীন্দ্রনাথের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বাংলার ব্রত’র। অবনীন্দ্রনাথ অনুমান করতে পেরেছিলেন অদূর ভবিষ্যতে এই ব্রতগুলি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তাই তিনি লিখে ও ছবি এঁকে সংরক্ষণ করে গিয়েছিলেন কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন এই ব্রতগুলিকে। অবনীন্দ্রনাথের আশঙ্কা সত্য হয়েছে। আজকের পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ সমাজে এই ব্রতগুলির উদ্‌যাপন বিলুপ্তপ্রায়। তাই সংরক্ষণের গুরুত্বকে অগ্রাধিকার প্রদান করা প্রয়োজন।

তথ্যসূত্র:

১। ত্রিপাঠী দীপ্তি, ২০১১, আধুনিক বাংলা কাব্যপরিচয়, কলকাতা, দে’জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ৩

২। চট্টোপাধ্যায় বঙ্কিমচন্দ্র, প্রকাশসাল অনুল্লিখিত, বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্য গ্রন্থাবলী (২য় ভাগ), কলকাতা, বসুমতী কর্পোরেশন লিমিটেড, পৃষ্ঠা ৫১৪

৩। রশীদ মামুন অর, ২০১৪, মধ্যযুগের বিনির্মাণ, ঢাকা, ধ্রুবপদ, পৃষ্ঠা ১৯

৪। রশীদ মামুন অর, ২০১৪, পৃষ্ঠা ৪১

৫। রায় অলোক, ২০১০, বিশ শতক, কলকাতা, প্রমা, পৃষ্ঠা ২৫

৬। সিকদার অশ্রুকুমার, ২০১৯, গদ্যসংগ্রহ, কলকাতা, দীপ প্রকাশন, পৃষ্ঠা ১০০

সহায়ক গ্রন্থ, পত্রপত্রিকা:

১। সুকুমার সেন, ২০০৯, বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস (১-৫ খণ্ড), কলকাতা, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা: লি:

২। ক্ষেত্র গুপ্ত, ২০০৪, বাংলা সাহিত্যের সমগ্র ইতিহাস, কলকাতা, গ্রন্থনিলয়

৩। শম্পা চৌধুরী (সম্পা.), ২০১১, প্রসঙ্গ বাংলা ছোটগল্প, কলকাতা, রত্নাবলী

৪। ডঃ রামেশ্বর শ’, ১৯৯৬, সাধারণ ভাষাবিজ্ঞান ও বাংলা ভাষা, কলকাতা, পুস্তক বিপণি

৫। Suniti Kumar Chatterji, 2002, The Origin and Development of the Bengali Language, New Delhi, Rupa & Co.


Authored by কৌশিক কর্মকার, সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, মহারাজা নন্দকুমার মহাবিদ্যালয়, নন্দকুমার, পূর্ব মেদিনীপুর

Published by.